Published : 16 Jun 2026, 06:10 PM
যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষ মৃত্যুর মিছিল দেখছে, সেখানে গান আর নাচের দৃশ্য দেখতে পাওয়া অদ্ভুতই বটে। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি হাসপাতালে ঘটেছে এমন ঘটনাই।
সেখানে এক ইবোলা রোগীর সফল চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনাটি এখন বড় উদযাপনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দেখা গেছে স্বাস্থ্যকর্মীদের আনন্দ-উল্লাসের এক বিরল মুহূর্ত।
গত শুক্রবার ঠিক দুপুরের পর, সবুজ স্ক্রাব পরা প্রায় ডজনখানেক স্বাস্থ্যকর্মী প্রশংসা গীতি গাইতে শুরু করেন, “আমাদের ওপর কৃপা বর্ষিত হয়েছে; রোগীদের ওপর কৃপা বর্ষিত হয়েছে।”
এই গান গাইতে গাইতেই তারা রোগী দানিয়েল কিতাম্বালাকে ক্লিনিক থেকে বের করে নিয়ে আসেন। ওই চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় তিন সপ্তাহ কাটানোর পর টানা দুটি ইবোলা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসায় চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন যে, তিনি সম্পূর্ণ ভাইরাসমুক্ত।
মেডিকেল কর্মীরা যখন উল্লাস করছিলেন, তখন কিতাম্বালা নামের ওই ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে বলেন, “এই রোগটি অত্যন্ত ভয়াবহ। আমি যখন এখানে এসেছিলাম তখন খুবই অসুস্থ বোধ করছিলাম। কিন্তু ঈশ্বর মহান, আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ।”
৪৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একটি কালো টি-শার্ট ও প্যান্ট পরা ছিলেন। হাতে ছিল তার জীবাণুমুক্ত করা জিনিসপত্র ভর্তি একটি কালো পলিথিন ব্যাগ। চিকিৎসা কেন্দ্রের সীমানা নির্দেশক দুটি কমলারঙা জালের লাইনের মাঝখানের পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার চোখে-মুখে ছিল স্বস্তি আর আনন্দের ঝিলিক।
উপকেন্দ্রের পরিস্থিতি ও কুসংস্কারের থাবা:
ইতুরি প্রদেশে প্রায় এক মাস আগে ইবোলার বিরল 'বুন্দিবুগিও' প্রজাতির প্রাদুর্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়, যা বর্তমানে এই মহামারীর উপকেন্দ্র। সেখানে ইতোমধ্যে ১৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই ভাইরাসটি হয়ত কোনও লক্ষণ ছাড়াই গত কয়েক মাস ধরে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আপ্রাণ লড়াই চালাচ্ছে।
তবে এই লড়াইয়ের বড় অংশটি জুড়ে রয়েছে স্থানীয় কিছু কাল্পনিক বিশ্বাস ও মিথ কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ। এখানকার মানুষের মধ্যে একটি বড় কুসংস্কার রয়েছে যে, এই রোগটি মূলত এক ধরণের ‘কফিনের অভিশাপ’।
এমনকি তারা মনে করেন, চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো কোনো সমাধান নয়, বরং এগুলোই মূল সমস্যা। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরও যে সুস্থ হয়ে বেঁচে ফেরা সম্ভব, মংবওয়ালুর ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওই আনন্দ-উল্লাসই তা প্রমাণ করেছে।
পেশায় প্রান্তিক কৃষক দানিয়েল কিতাম্বালা আকাশের দিকে তিনবার হাত তুলে বিজয় উল্লাস প্রকাশ করেন এবং ঈশ্বরের প্রশংসা করে বলেন, “দেখুন... আমি সুস্থ হয়ে গেছি। মানুষ অসুস্থ হলে তাদের উচিত চিকিৎসা নেওয়া।”
এ সময় তিনি পেছনে তালি বাজাতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের দিকে ফিরে ধন্যবাদ জানান।
কীভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন তা মনে করে কিতাম্বালা জানান, তিনি তার এলাকার এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং তার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। এর কিছুদিন পরেই তিনি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সাধারণত ইবোলা ভাইরাস সংক্রামিত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থ, যেমন রক্ত বা বমির সংস্পর্শে আসলে অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। কঙ্গোর অন্য অনেক মানুষের মতো কিতাম্বালাও প্রথমে কবিরাজি বা সনাতন চিকিৎসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে তিনি হাসপাতালে ছোটেন।
মংবওয়ালু হাসপাতালের চিকিৎসা বিষয়ক পরিচালক ডা. রিচার্ড লুকোদু বলেন, “প্রথম রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকে স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে আমরা বিশাল পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। এখন আরও বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে এখানে আসছেন।”
এর এক সপ্তাহ আগে দেওগ্রাতিয়াস কাসেরেকা নামের ৫৫ বছর বয়সী এক যাজক প্রথম ইবোলা রোগী হিসেবে এই কেন্দ্র থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
ডা. লুকোদু আশাবাদী যে, রোগীদের এই সুস্থতা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে। কারণ, ভুল তথ্যের কারণে তার এই হাসপাতালটি এর আগে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। গত ২১ মে হাসপাতালের মাঠে ইবোলা রোগীদের চিকিৎসার জন্য খাটানো একটি তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত হওয়ার তিন মাস আগে, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারি থেকেই যখন অস্বাভাবিক এক রোগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মরতে শুরু করে, তখন থেকেই চিকিৎসকদের কাজ নিয়ে নানা গুজব ছড়াতে থাকে।
ডা. লুকোদু বলেন, “এখানকার মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে, আগে রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার কারণেই ইবোলা শেষ হয়ে গিয়েছিল।”
এর আগে ২০১৮-২০২০ সালে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময়ও পার্শ্ববর্তী উত্তর কিভু প্রদেশে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল।

‘কফিনের অভিশাপ’ এবং সংক্রমণের আসল গল্প:
মংবওয়ালুর মেয়র সেসেরেকী মান্দ্রো ইসরায়েল জানান, এই রোগে মানুষ মারা যেতে শুরু করার পর থেকে কমিউনিটিতে বিভিন্ন ধরণের গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
কাঁচা রাস্তার এই শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত নিজের নীল রঙের অফিসে বসে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর একটি ঘটনা বিপুল সংখ্যক মানুষকে সংক্রমিত করেছিল।
মেয়র বলেন, “সে সময় একটি পরিবার দাফনের জন্য বুনিয়া (প্রাদেশিক রাজধানী, যা সড়কপথে আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত) থেকে এখানে একটি মরদেহ নিয়ে আসছিল। কিন্তু আসার পথে কফিনটি ভেঙে যায়। পরে ওই ব্যক্তিকে দাফন করে ভাঙা কফিনটি পুড়িয়ে ফেলা হয়।”
এই ঘটনা থেকেই স্থানীয়দের মাঝে এটি ‘কফিনের অভিশাপ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। কফিন পোড়ানোর কারণেই সবার মৃত্যু হচ্ছে বলে দোষারোপ করা হতে থাকে। মেয়র বলেন, “পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছিল, দৈনিক ৭, ৮ এমনকি ১০ জন পর্যন্ত মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল।”
তবে এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে বলে তিনি জানান।
শুরুতে সন্দেহজনক রোগীদের প্রাথমিক পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসছিল, কারণ চিকিৎসকরা ইবোলার অন্য সাধারণ প্রজাতিগুলো খুঁজছিলেন, বিরল বুন্দিবুগিও প্রজাতি নয়।
মেয়র বলেন, “আমরা কমিউনিটি লিডারদের ডেকে লক্ষণগুলো বুঝিয়ে বলেছি এবং এই রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে রোগীদের চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করেছি।”
দুই সপ্তাহ আগে মংবওয়ালু হাসপাতাল একটি নিজস্ব ল্যাবরেটরি পেয়েছে, যার ফলে এখন এক দিনের মধ্যেই ইবোলা পরীক্ষার ফল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর আগে বুনিয়ার নিকটবর্তী পরীক্ষাগার থেকে ফল আসতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগে যেত।
প্রতিটি ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতোই এখানেও চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ডা. লুকোদু জানান, ইতিমধ্যে এখানে ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন এবং সংক্রমিত আরও বেশ কয়েকজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে প্রাদুর্ভাব ঘোষণার পর থেকে সংক্রমণ প্রতিরোধের উন্নত ব্যবস্থা নেওয়ায় এখন ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
রূয়াম্পারার চিত্র ও ভেতরের ব্যবস্থাপনা
মহামারী কবলিত দ্বিতীয় শহর রূয়াম্পারাতেও একই রকম পরিস্থিতি দেখা গেছে। মংবওয়ালুর ঘটনার ঠিক দুদিন পর এখানকার চিকিৎসা কেন্দ্রটিতেও আগুন দেওয়া হয়েছিল।
তবে সেটি আবার চালু করা হয়েছে এবং শেষ বিকেলে পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রিয়জনদের দেখতে ভিড় করছেন। একজন চিকিৎসক ভেতরে তার স্বামীকে পরীক্ষা করার সময় বাইরে এক স্ত্রী ও তার বোনকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়, তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।
ভেতরে সবকিছু খুব সাবধানে পরিচালনা করা হচ্ছে যাতে রোগীরা হাসপাতালের কর্মী এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা করতে না পারেন। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের আলাদা কিউবিকলে রাখা হয়েছে এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষামূলক পোশাক পরা মেডিকেল টিম ছাড়া কারও সেখানে ঢোকার অনুমতি নেই।
রোগীদের চলাচলের জন্য একটি খোলা জায়গা রয়েছে, তবে কোনো দর্শনার্থী তাদের দেখতে আসলে মাঝখানে প্রায় দুই মিটারের একটি দূরত্ব বা ব্যারিয়ার রাখা হয়। এছাড়া অন্যান্য জায়গায় বড় কাঁচের স্ক্রিন এবং পর্দা রয়েছে, যেখান থেকে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের নিরাপদে দেখা যায়।
কাঁচের ওপাশ থেকে কথা বলছিলেন মিরিল গাহিন্দো। দুই সপ্তাহ ধরে এখানে থাকা মিরিল বলেন, “আমি খুব খুশি। আমি বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছি।”
তার ১১ মাস বয়সী সন্তানের জ্বর ও ডায়রিয়া হলে তিনি তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান।
কিন্তু দুই সপ্তাহেও অবস্থার উন্নতি না হয়ে যখন বাচ্চার মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে, তখন তিনি তাকে এই চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। পরে মিরিলের নিজের ইবোলা পরীক্ষার ফলও পজিটিভ আসে। তবে বর্তমানে মা ও শিশু উভয়ের অবস্থারই উন্নতি হচ্ছে।
বাড়ি ফিরে নিজের ৫ বছর এবং আড়াই বছর বয়সী অপর দুই সন্তান ও স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন। তার চিকিৎসক জানান, “অন্য কোনো ইনফেকশন হলে আমি হয়ত তাকে এখনই ছুটি দিয়ে দিতাম।”
কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে প্রতিটি রোগীকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আগে অবশ্যই পরপর দুইবার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসতে হয়।
চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে এলি আসিমওয়ে বাওয়েরে জানান, তিনি তার বড় বোন, ভাই এবং সৎ মাকে দেখতে এসেছেন, যারা এখানে ভর্তি আছেন।
আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বিবিসি-কে বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে আমাদের মা এবং ভাবীকে হারিয়েছি। আমরা অনেক কেঁদেছি। আমরা আর শোক সইতে চাই না।”
ইতুরি প্রদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই এমন কাউকে চেনেন যিনি ইবোলায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে।
এই চরম হতাশা আর মৃত্যুর মাঝে ইবোলা থেকে প্রতিটি রোগীর সেরে ওঠাই স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মনে এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনা নিয়ে নতুন আশা জাগাচ্ছে। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি।
ভাইরাসের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা প্রতিটি মানুষকে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, এখনও অনেকের খোঁজ মিলছে না এবং তাদের সবাইকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এই আপাত স্বস্তি বা আশা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে।