Published : 20 Jul 2026, 01:33 PM
অটোমোবাইল বা গাড়ি উৎপাদন শিল্পে দূরনিয়ন্ত্রিত ওভার-দ্য-এয়ার বা ওটিএ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দূর থেকে চলন্ত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া বা বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় নরওয়ে, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলো এরইমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে এবং এই খাতে কঠোর নীতিমালার দাবি উঠছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
ওভার-দ্য-এয়ার বা ওটিএ হচ্ছে ওয়্যারলেস বা তারবিহীন প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে ইন্টারনেট-সংযোগওয়ালা যে কোনো ডিভাইসে সরাসরি নতুন সফটওয়্যার, ফার্মওয়্যার, নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনী ও প্রয়োজনীয় ডেটা পাঠানো যায়।
২০১২ সালে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা তাদের ‘মডেল এস’ গাড়িতে প্রথম ওটিএ আপডেট দেওয়া শুরু করে।
‘অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট’-এর সাইবার, টেকনোলজি অ্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ফেলো জেসন ভ্যান ডার শিফ বলেছেন, টেসলার এ পদক্ষেপের পরই অটোমোবাইল খাতে প্রযুক্তিটি স্বাভাবিক ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা এখন প্রায় পুরো গাড়ি শিল্পেই ছড়িয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের ‘সোয়ানসি ইউনিভার্সিটি’র সিস্টেম সিকিউরিটির অধ্যাপক সিরাজ আহমেদ শেখ বলেছেন, “প্রচলিত পদ্ধতিতে গাড়ির কোনো ত্রুটি দূর করতে হলে তা শোরুম বা সার্ভিস সেন্টারে ফিরিয়ে আনতে বা রুটিন মেইনটেইন্যান্সের জন্য অপেক্ষা করতে হত। তবে এর চেয়ে ওটিএ প্রযুক্তি অনেক দ্রুত ও সাশ্রয়ী উপায়ে গাড়ির বিভিন্ন সিস্টেম পরিচালনা করতে পারে। এ কারণেই প্রযুক্তিটি দিন দিন সমাদৃত হচ্ছে।”
গাড়ি শিল্পে ওটিএ প্রযুক্তির এই ব্যাপক প্রসার বড় ধরনের উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে সার্বিক পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে।
সিঙ্গাপুরের ‘এস. রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর সিনিয়র অ্যানালিস্ট গ্যাব্রিয়েল লিম বলেছেন, “গাড়িতে ওটিএ’র ব্যবহার এখন জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
“ডেটা প্রাইভেসি ফাঁস হওয়ার উদ্বেগের পাশাপাশি, কোনো বিদেশি চক্র বা হ্যাকার দূর থেকে চলন্ত গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে– এমন আশঙ্কাও এখন উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।”
এ বছরের মে মাসে মার্কিন থিংক-ট্যাংক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’ এক সতর্কবার্তায় বলেছিল, বিদেশি সরকারগুলোর গুপ্তচরবৃত্তির সক্ষমতা সীমিত করতে অটোমোবাইল খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কোম্পানিটির প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, “বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তির হুমকি থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত গাড়িগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা। সেইসঙ্গে যানবাহনে নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং গাড়িগুলো ঠিক কী ধরনের ডেটা সংগ্রহ করছে তা স্পষ্টভাবে প্রকাশের নিয়ম বাধ্যতামূলক করা উচিত।”
চলন্ত বাসের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে দূরদূরান্তে
গাড়িতে তারবিহীন ‘ওভার-দ্য-এয়ার’ বা ওটিএ প্রযুক্তির ঝুঁকি যে কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কিছু মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায়। ইন্টারনেট-সংযোগ যানবাহনের নিরাপত্তা বিভিন্ন ত্রুটি এখন প্রকাশ্য রূপ নিতে শুরু করেছে।
গেল বছরের শেষদিকে নরওয়ের সরকারি বাস পরিচালনাকারী কোম্পানি ‘রটার’ তাদের দুটি বাসে পরীক্ষামূলক অনুসন্ধান চালায়, যেখানে দেখা গেছে, একটি বাসের ওটিএ প্রযুক্তির মধ্যে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে।
কোম্পানিটি প্রতিবেদনে বলেছে, “রোমানিয়ার একটি সিম কার্ড ব্যবহার করে মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাসটির ব্যাটারি ও পাওয়ার সাপ্লাইয়ের মূল কন্ট্রোল সিস্টেমে প্রবেশ করা সম্ভব। যার মানে নির্মাতা কোম্পানি চাইলে দূর থেকেই বাসটিকে যে কোনো সময় থামিয়ে বা অচল করে দিতে পারে।”
নরওয়ের এ তদন্তের পর নড়েচড়ে বসেছে যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্ক। দেশ দুটি নিজস্ব উদ্যোগে এ বিষয়ের ওপর তদন্ত শুরু করেছে।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের পরিবহন মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ও দেশটির ‘ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার’-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
এসব প্রাথমিক তদন্ত চালানো হয়েছিল চীনা গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি ‘ইউটং’-এর তৈরি বাসের ওপর।
‘সোয়ানসি ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক সিরাজ আহমেদ শেখ সতর্ক করে বলেছেন, এ সংকট কোনো নির্দিষ্ট একটি কোম্পানি বা দেশের মধ্যে সীমিত নয়। প্রযুক্তিটি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে ঝুঁকি এখন সার্বজনীন।
“কেবল সড়ক পরিবহনই নয়, ওটিএ প্রযুক্তির ব্যবহার এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নৌপথ, রেলপথ, মহাকাশ গবেষণা, বিশেষ করে ড্রোন, শিল্পকারখানার ভারী যন্ত্রপাতি ও রোবোটিক্সের মতো সংবেদনশীল খাতেও।”
এ তারবিহীন প্রযুক্তি যত গণমুখী হচ্ছে এর দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের বিষয়টি ততই জরুরি হয়ে উঠছে বলে মনে করেন ‘এস. রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর গবেষক গ্যাব্রিয়েল লিম।
“এ প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি। বিভিন্ন ওটিএ সিস্টেম কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, বিশেষ করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রযুক্তির পেছনে এগুলো কীভাবে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।”