Published : 02 Jun 2026, 02:54 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে পোপ চতুর্দশ লিওর তীব্র সতর্কবার্তার মঞ্চে হঠাৎ দেখা গেল মার্কিন এআই কোম্পানি অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে। পোপ যেখানে এআইয়ের কারণে চাকরিচ্যুতি ও পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, সেখানে এ প্রযুক্তিরই এক রূপকারের উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
এ জোট কি সত্যিই কোনো শুভ উদ্যোগ, না কি স্রেফ নিজেদের ইমেজ বাঁচানোর ‘ভ্যাটিকান-ওয়াশিং’? বা এআই নিয়ে সতর্কবার্তার সময় অ্যানথ্রপিকের প্রতিষ্ঠাতা কেন পোপের পাশে বসেছিলেন?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, পোপ চতুর্দশ লিও নিজের পোপ পদের প্রথম প্রধান লিখিত ধর্মীয় বাণীতে এআইয়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন, যেখানে তিনি মানবজাতির জন্য এ প্রযুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিভিন্ন হুমকি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের প্রতিস্থাপন করা বা চাকরি কেড়ে নেওয়া, যুদ্ধকে আরও বাড়ানো এবং পরিবেশের ক্ষতি করা।
ভ্যাটিকানে এ পবিত্র বাণী প্রকাশের দিন তা উদযাপনের জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পোপের পাশে অতিথি বক্তা হিসাবে একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস ওলাহ। তিনি সেই এআই বিপ্লবের পেছনের অন্যতম কারিগর, যা নিয়ে পোপ লিও এতটা উদ্বিগ্ন।
ক্রিস ওলাহর এ উপস্থিতির কারণে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, ক্যাথলিক চার্চ ও বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান এআই কোম্পানি কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে? কারণ অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি নিজেই এমন এক ভবিষ্যৎ বয়ে নিয়ে আসতে পারে, যা নিয়ে পোপ লিও সতর্ক করছেন।
পোপ লিওর এ লিখিত বাণীতে এআইয়ের কারণে হুমকির মুখে পড়া মানুষের কাজের মর্যাদা বা ডিগনিটি ধরে রাখার বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
তবে এআইয়ের জবাবদিহিতা নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংগঠন ‘সেন্টার ফর হিউম্যান টেকনোলজি’র পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার পিট ফারলং বলেছেন, অ্যানথ্রপিকসহ বড় বিভিন্ন এআই কোম্পানি এসব উদ্বেগকে তেমন একটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।
“এসব কোম্পানির প্রত্যেকেই এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা মানুষের জায়গা দখল করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এমনটা পোপের বাণীর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে আপনি এমন এক পৃথিবীতে মানুষের কাজের মর্যাদা ধরে রাখতে পারেন না, যেখানে আপনি প্রযুক্তিই তৈরি করছেন মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।”
মার্চে অ্যানথ্রপিকের নিজস্ব শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার কারণে কিছু পেশা, যেমন কোডার, কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধি ও ডেটা-এন্ট্রি কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ ছাড়া, গেল মাসে অলাভজনক এআই গবেষণা কেন্দ্র ‘ইপোখ এআই’ প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ শতাংশ ফুল-টাইম কর্মী বলেছেন, এআই এরইমধ্যে তাদের কাজের কিছু অংশ দখলে নিয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই নিজেই সতর্ক করে বলেছেন, আগামী বছরগুলোতে অফিসিয়াল বা হোয়াইট-কলার চাকরিগুলোতে এক বিপর্যয়কর ধস নামতে পারে।
‘ভ্যাটিকান-ওয়াশিং’
‘নটর ডেম ল স্কুল’-এর আইনের অধ্যাপক ও মেটা ওভারসাইট বোর্ডের কো-চেয়ার পাওলো কারোজ্জা বলেছেন, ভ্যাটিকানের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের এ যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত খুব সামান্যই রয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যেই কোনো রকম গঠনমূলক আত্ম-পর্যালোচনা ছাড়াই কেবল এক ‘লোকদেখানো ভালো ভালো কথা’র আলোচনা তৈরি হতে পারে।
“এটাই তো অ্যানথ্রপিকের ব্র্যান্ড পলিসি, তাই না? নিজেদেরকে আরও বেশি নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার পক্ষের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেই তারা অন্যদের চেয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করছে। এটা বলার মধ্যে তাদের এক ব্যবসায়িক লাভও আছে যে, ‘দেখুন, আমাদের এ নিরাপত্তাবান্ধব সুনামের কারণেই পোপও আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছেন। গুগলের মতো কোম্পানি কিন্তু ওই মঞ্চে ছিল না, ওপেনএআই’ও ছিল না’।”
অনুষ্ঠানে ক্রিস ওলাহর উপস্থিতি নিয়ে শুরুতে কিছুটা সন্দিহান থাকলেও, কারোজ্জা এখনও ইতিবাচক আশা রাখছেন। তিনি বলেছেন, “এখানকার সব পক্ষের মধ্যেই সংলাপ বা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টিকে কোনোভাবেই ‘আমরা বনাম ওরা’র লড়াই বানিয়ে ফেলা যাবে না।”
‘সেন্টার ফর হিউম্যান টেকনোলজি’র পিট ফারলং’ও মোটের উপর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বলেছেন, “পোপ তার লেখায় যা বলেছেন তা অ্যানথ্রপিকের কাজের ধরনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আমার কাছে বিষয়টি ভালো লক্ষণ।”
ফারলং মনে করেন, আপাতত অ্যানথ্রপিকের এ প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবেই ধরে নেওয়া যায় এবং এআইয়ের এ অগ্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একইসঙ্গে এসব কোম্পানি যখন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে শেয়ার বাজারে যাবে তখন আর্থিক লাভের ক্রমাগত চাপ তাদের এ বর্তমান অবস্থানকে কতটা বদলে দেয় সে বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার।
পোপের সঙ্গে মঞ্চে ওলাহ নিজের বক্তব্যে বলেছেন, প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় এআই ল্যাব বা গবেষণাগারই এমন কিছু “প্রণোদনা ও বাধ্যবাধকতার (ইনসেন্টিভ ও কনস্ট্রেইন্টস) মধ্যে থেকে কাজ করে, যা অনেক সময় সঠিক কাজটি করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
“আমাদের মধ্যে কেউ যত আন্তরিকভাবেই সঠিক কাজটি করতে চান না কেন এবং আমি বিশ্বাস করি আমাদের অনেকেই চান যে, আমরা সব সময়ই সেই বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে প্রভাবিত হব।”
অবশ্য কিছু এআই নিরাপত্তা কর্মীর ধারণা, এআইয়ের বিভিন্ন ক্ষতি লাগাম টানার ক্ষেত্রে পোপের এ পদক্ষেপ যথেষ্ট জোরালো ছিল না।
‘ডিস্ট্রিবিউটেড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর প্রতিষ্ঠাতা টিমনিট জেব্রু এক লিংকডইন পোস্টে লিখেছেন, এ জোটটি আসলে এক ধরনের ‘ভ্যাটিকান-ওয়াশিং’ বা ভ্যাটিকানকে ব্যবহার করে নিজেদের ইমেজ ভালোর চেষ্টা।
“চার্চের উচিত ছিল নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করা শোষিত ডেটা কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, ডেটা সেন্টারের কারণে যাদের পানি দূষিত হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করছেন তাদের সঙ্গে বা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমন অন্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে জোট বাঁধা।”
এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি অ্যানথ্রপিক।
এআই ও যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে অ্যানথ্রপিক পোপ একমত
অন্যান্য কিছু বিষয়ে চার্চ ও অ্যানথ্রপিক একে অপরের সঙ্গে একমত। যেমন, যুদ্ধে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমারেখা বা রেড লাইন টেনে দেওয়া।
পোপ লিও বাণীতে লিখেছেন, কীভাবে এআই ‘সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথকে আরও সহজ করে দিতে পারে, মানুষকে তাদের দায়বদ্ধতা থেকে আড়াল করতে পারে ও এমন সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে যেখানে শত্রুকে স্রেফ একটি সংখ্যা বা পরিসংখ্যান এবং ভুক্তভোগীদের ‘পার্শ্ববর্তী ক্ষতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।”
তিনি ‘জীবনের পবিত্রতা’ রক্ষা করতে এবং ‘এ ধরনের অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা’ এড়াতে ‘সবচেয়ে কঠোর নৈতিক বাধ্যবাধকতা’ আরোপের আহ্বান জানান।
এ বছরের শুরুতে অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই মার্কিন সরকারকে তাদের তৈরি বিভিন্ন এআই মডেল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও গণ-নজরদারির কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।
ফলে ট্রাম্প প্রশাসন অ্যানথ্রপিক’কে কালো তালিকাভুক্ত এবং এ এআই কোম্পানিটিকে জাতীয় সাপ্লাই চেইনের জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে, যা পরবর্তীতে আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং সেই আইনি লড়াই এখনও চলছে।
অ্যানথ্রপিক তাদের মূল প্রতিযোগী চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের তুলনায় নিজেদের ব্র্যান্ডকে ‘এআই নিরাপত্তার’ পক্ষে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ওপেনএআইতে একসময় আমোদেই কাজ করতেন।
অ্যানথ্রপিক নিজেদের এআই সিস্টেমগুলোর বিভিন্ন ঝুঁকিকে অকপটে স্বীকার এবং দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার প্রচার করেছে।
কোম্পানিটি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে লবিয়িং বা নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করার পেছনে রেকর্ড ১৬ লাখ ডলার খরচ করেছে, যা তাদের প্রতিযোগী ওপেনএআইয়ের চেয়ে বেশি। ওয়াশিংটন ও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তাদের এ প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য এআই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে আইন তৈরি করা।
পোপ লিওর পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টারের আহ্বান, অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের নির্মাণযজ্ঞ
প্রায় ৪২ হাজার শব্দের দীর্ঘ এ ধর্মীয় বাণীর এক অনুচ্ছেদে পোপ লিও এআই বিপ্লব পরিচালনায় থাকা বিভিন্ন ডেটা সেন্টারের মৃদু সমালোচনা করেছেন এবং এগুলোর পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
পোপ লিখেছেন, “বর্তমান এআই সিস্টেমগুলোর জন্য অনেক পরিমাণে বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়, যা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে। এ কারণে, আরও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা অপরিহার্য, যা পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমাবে এবং আমাদের এ যৌথ আবাসভূমিকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।”
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টারের আবাসভূমি যুক্তরাষ্ট্রে এসব কম্পিউটার হাব দেশজুড়ে তীব্র জনরোষের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা শিল্প-কারখানার ধোঁয়া নির্গমন থেকে শুরু করে আকাশছোঁয়া বিদ্যুৎ বিলের মতো নেতিবাচক বিভিন্ন প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
তবে প্রচুর শক্তি অপচয়কারী এসব কম্পিউটার ক্লাস্টারই অ্যানথ্রপিকের ব্যবসার মূল ভিত্তি। কারণ তাদের ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা বিভিন্ন এআই মডেলকে সচল রাখতে এ কম্পিউটেশনাল পাওয়ার বা শক্তির প্রয়োজন।
এর বিপরীতে, অনেক সরকারি সংস্থা ও বিশ্বের বড় বিভিন্ন কোম্পানি জটিল কর্মপদ্ধতি ও বিশ্লেষণের জন্য অ্যানথ্রপিকের বিভিন্ন এআই মডেলের ওপর নির্ভর করে, তা সেটা ব্যবসায়িক মুনাফা পেতেই হোক বা কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের জন্যই হোক না কেন।
অ্যানথ্রপিকের এ ব্যবসায়িক আকাঙ্ক্ষা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে পোপ লিওর আহ্বানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। গত বছর এআই কোম্পানিটি ডেটা সেন্টারসহ এআই অবকাঠামো খাতে ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে কোম্পানিটি অঙ্গীকার করেছে, এসব স্থাপনার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের যে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের মুখে পড়তে হয় তা তারা পরিশোধ করবে এবং পিক-আওয়ার বা যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে তখন তারা বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর জন্য বিশেষ সিস্টেম ব্যবহার করবে।