Published : 31 Dec 2025, 02:35 PM
দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলজুড়ে এমন সব জায়গায় অদ্ভুত পাথুরে কাঠামো নীরবে বেড়ে উঠছে, যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকাই প্রায় অসম্ভব।
এসব কাঠামো বা গঠন ‘মাইক্রোবায়ালাইট’ নামে পরিচিত। দেখতে সাধারণ পাথরের মতো মনে হলেও, এগুলো আসলে পুরোপুরি জ্যান্ত। বাস্তবে এগুলো অসংখ্য ক্ষুদ্র অণুজীবের সমষ্টি, যা সক্রিয়ভাবে এসব গঠন তৈরি করেছ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
অণুজীবের দল বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে স্তরে স্তরে তৈরি এসব আল্পনার মতো গঠন পৃথিবীর প্রাচীনতম বাস্তুতন্ত্রের কাছাকাছি।
নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, বিজ্ঞানীদের আগের ধারণার চেয়েও এগুলো অনেক বেশি সক্রিয় ও সহনশীল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
‘বিগেলো ল্যাবরেটরি ফর ওশান সায়েন্সেস’ ও ‘রোডস ইউনিভার্সিটি’র গবেষকদের যৌথ পরিচালনায় করা নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় এসব ‘মাইক্রোবায়ালাইট’ কেবল প্রতিকূল পরিবেশেই টিকে আছে তা নয়। এগুলো অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ও পরিবেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন শুষে নিচ্ছে, যা পরবর্তীতে শক্ত পাথরের মধ্যে স্থায়ীভাবে জমা হচ্ছে।
এসব অণুজীব যখন পানি থেকে দ্রবীভূত কার্বন শুষে নিয়ে তা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটে রূপান্তরিত করে তখনই এসব ‘মাইক্রোবায়ালাইট’ গঠিত হয়। এ ক্যালসিয়াম কার্বোনেট সেই একই খনিজ উপাদান, যা চুনাপাথর ও প্রবাল প্রাচীরে মেলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার ফলে স্তরে স্তরে সাজানো পাথরের মতো কাঠামো তৈরি হয়, যা হাজার হাজার বছর, এমনকি কোটি কোটি বছর পর্যন্তও টিকে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া এসব মাইক্রোবায়ালাইট পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রাচীনতম বিভিন্ন প্রমাণের মধ্যে অন্যতম, যা তিনশ কোটি বছরেরও বেশি পুরানো।
বিজ্ঞানের কাছে পরিচিত বেশিরভাগ মাইক্রোবায়ালাইটই প্রাচীন জীবাশ্ম। এ কারণেই গবেষকরা দীর্ঘকাল ধরে ভেবেছেন, বর্তমানে জীবিত বিভিন্ন মাইক্রোবায়ালাইট অত্যন্ত ধীরগতিতে বেড়ে ওঠে।
নতুন এ গবেষণা সেই পুরানো ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের চারটি সক্রিয় মাইক্রোবায়ালাইট ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এসব ‘জ্যান্ত পাথর’ প্রতি বছর দৈর্ঘ্যে প্রায় দুই ইঞ্চি পর্যন্ত বাড়তে পারে।
‘বিগেলো ল্যাবরেটরি’র সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিস্ট ও এ গবেষণার প্রধান লেখক র্যাচেল সিপলার বলেছেন, “পাঠ্যবইতে এসব গঠনকে প্রায় বিলুপ্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে আমরা এমন প্রাণবন্ত অণুজীব গোষ্ঠী খুঁজে পেয়েছি যেগুলো অত্যন্ত প্রতিকূল ও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল পরিবেশেও বেশ দ্রুত বেড়ে উঠছে।”
গবেষণা বলছে, এসব মাইক্রোবায়ালাইট ঠিক সেই সব জায়গায় তৈরি হয়, যেখানে উপকূলীয় বালিয়াড়ি থেকে ক্যালসিয়ামওয়ালা পানি চুইয়ে বের হয়। এসব পরিবেশ খুবই চরম ও প্রতিকূল। এসব গঠন হয়ত একদিন রৌদ্রে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, তো পরদিনই আবার পানিতে তলিয়ে যায়। সেইসঙ্গে এদের তাপমাত্রা, সূর্যের আলো ও পানির রাসায়নিক উপাদানের প্রচণ্ড পরিবর্তন ঠেকাতে হয়। এরপরও এসব অণুজীব অসাধারণ সক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়।
গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়ের একটি হচ্ছে এদের কার্বন গ্রহণ পদ্ধতি। দিনের বেলা এসব অণুজীব উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে।
তবে গবেষকরা বলছেন, রাতেও যখন কোনো সূর্যালোক থাকে না তখনও এদের কার্বন শোষণের হার প্রায় একই থাকে।
রাতের বেলার সক্রিয়তা প্রমাণ করেছে, এসব অণুজীব অতিরিক্ত কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, যা অনেকটা গভীর সমুদ্রের তলদেশে থাকা ‘হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট’ বা উষ্ণ প্রস্রবণ-এর আশপাশে বাস করা প্রাণীদের ব্যবহৃত প্রক্রিয়ার মতো। এসব বিকল্প বিপাকীয় পদ্ধতি এসব মাইক্রোবায়ালাইটকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টায় বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
দৈনিক কার্বন গ্রহণের পরিমাণ পরিমাপ করে গবেষণা দলটি বলছে, প্রতি বর্গমিটার মাইক্রোবায়ালাইট প্রতি বছর প্রায় ৯ থেকে ১৬ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। বড় পরিসরে এই হিসাব চিন্তা করলে দেখা যায়, একটি টেনিস কোর্টের সমান আয়তনের মাইক্রোবায়ালাইট এলাকা প্রতি বছর কয়েক একর বনের সমান কার্বন ধরে রাখতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এদের কার্বন সঞ্চয় প্রক্রিয়া। গাছপালা ও মাটি কার্বনকে জৈব পদার্থ হিসেবে জমা রাখে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পচে বা ভেঙে গিয়ে আবার পরিবেশে ফিরে যেতে পারে। তবে মাইক্রোবায়ালাইট কার্বনকে সরাসরি স্থায়ী খনিজ পাথরে রূপান্তরিত করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী কার্বন সঞ্চয়ের জন্য এগুলোকে প্রকৃতির অন্যতম কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়।
গবেষকরা এবারই প্রথম কার্বন গ্রহণের হারের সঙ্গে অণুজীব সম্প্রদায়ের জেনেটিক গঠনের যোগসূত্র খতিয়ে দেখেছেন। এই সম্পর্কটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, কেন কিছু মাইক্রোবায়ালাইট ব্যবস্থা অন্যগুলোর তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন ধরনের অণুজীব কীভাবে কার্বনের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখে।