Published : 10 Oct 2025, 06:37 PM
মোয়াই নামে পরিচিত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইস্টার দ্বীপের বিশাল পাথরের বিভিন্ন মূর্তি মানবজাতির মনে এক অনির্বচনীয় বিস্ময় ও রহস্যের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে।
কিন্তু ‘রাপা নুই’ দ্বীপের প্রাচীন মানুষেরা চাকা বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কীভাবে এত বিশাল পাথরের মূর্তি, যেগুলোর কিছু ওজন প্রায় ৮০ টন পর্যন্ত তা কঠিন ও রুক্ষ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরাতে পেরেছিলেন?
অবশেষে এই রহস্যের উত্তর খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন ‘বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটি’র নৃতত্ত্ববিদ কার্ল লিপো ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনা’র প্রত্নতত্ত্ববিদ টেরি হান্ট’সহ গবেষকদের একটি দল।
পদার্থবিজ্ঞান, থ্রিডি কম্পিউটার মডেলিং ও বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, এসব মূর্তিকে টেনে বা শুয়ে গড়িয়ে নেওয়া হয়নি, বরং রাপা নুইয়ের মানুষেরা দড়ি ব্যবহার করে এগুলোকে সোজা অবস্থায় ‘হাঁটানোর’ মতো করে সরাতেন। বিশেষ ধরনের রাস্তা বানিয়ে এগুলোকে দুলতে দুলতে জিগজ্যাগ পথে এগিয়ে নেওয়া হত।
তাদের এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক ‘জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স’-এ।
মোয়াই মূর্তিগুলোকে ‘হাঁটিয়ে’ স্থানান্তর করা হতে পারে এই ধারণা বহু বছর ধরেই প্রচলিত। তবে কার্ল লিপোর দলের গবেষণাই প্রথমবারের মতো এর পক্ষে পরীক্ষামূলক ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রমাণ উপস্থাপন করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
লিপো বলেছেন, “একবার মূর্তিটিকে নড়াতে পারলেই কাজটা মোটেও কঠিন নয়, এক্ষেত্রে মানুষ এক হাত দিয়েই টানছিল। এতে শক্তি সাশ্রয় হয় ও মূর্তিটিও বেশ দ্রুত এগোয়। তবে এ কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশ হচ্ছে, শুরুতে সেটিকে দুলিয়ে চলতে শুরু করানো।”
তত্ত্বটিকে যাচাই করতে প্রায় ১ হাজারটির মতো মোয়াই মূর্তি পরীক্ষা করার পাশাপাশি এগুলোর নকশার সূক্ষ্ম বিভিন্ন দিকও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
তারা লক্ষ্য করেছেন, অনেক মূর্তিরই চওড়া, ডি-আকৃতির ভিত্তি ও সামান্য সামনের দিকে ঝোঁক রয়েছে, যা আসলে এসব মূর্তিকে সোজা অবস্থায় সরানোর বিষয়টিকে সহজ করে তুলেছে। এ ধারণার প্রমাণ পেতে গবেষকরা একই বৈশিষ্ট্যওয়ালা ৪.৩৫ টন ওজনের এক মোয়াই মূর্তির প্রতিরূপ তৈরি করেছেন।
কেবল ১৮ জন মানুষ ও কয়েকটি দড়ি ব্যবহার করেই সফলভাবে মূর্তিটিকে ৪০ মিনিটে ১০০ মিটার দূরত্বে সরিয়ে নিতে পেরেছেন গবেষকরা, যা আগের যে কোনো পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও দ্রুত।
লিপো বলেছেন, “পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে ব্যাপারটা পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত। এসব মূর্তি যত বড়, তাদের নড়াচড়াও তত বেশি স্থির ও নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে এত বিশাল বস্তু স্থানান্তরের এটিই সম্ভবত একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়।”
রাপা নুই দ্বীপের রাস্তা থেকেও এই ধারণার আরও প্রমাণ মেলে। প্রাচীন এসব পথ প্রায় ৪.৫ মিটার চওড়া ও আকারে কিছুটা অবতল বা ভেতরের দিকে দেবে থাকা, যা দুলতে থাকা এসব মূর্তিকে সামনের দিকে এগোনোর সময় ভারসাম্য রাখতে ও সঠিক পথে পরিচালিত হতে সাহায্য করেছে।
লিপোর অনুমান, রাপা নুইয়ের মানুষেরা এসব মূর্তি স্থানান্তরের অংশ হিসেবেই এসব রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। তারা যতবার একটি মূর্তি সরাত, ততবারই নতুন রাস্তা তৈরি করত, ফলে পথে পথে আঁকাবাঁকা ও সমান্তরাল পথের জাল গড়ে উঠেছিল।
তিনি বলেছেন, “প্রতিবার যখনই একটি মূর্তি সরাতেন তখনই একটি রাস্তা বানাতেন তারা।”
ইস্টার দ্বীপ নিয়ে নানা লাগামছাড়া তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। যেমন– কারো কারো ধারণা, ভিনগ্রহবাসী বা অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ এটি। তবে লিপো জোর দিয়ে বলেছেন, এসব মূর্তিকে ধারাবাহিকভাবে ‘হাঁটিয়ে স্থানান্তর’ তত্ত্বকেই সমর্থন করছে তাদের গবেষণার এসব প্রমাণ।
তিনি বলেছেন, “মোয়াই মূর্তিগুলো কীভাবে সরানো হয়েছিল তার অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই। আমরা যত বেশি পরীক্ষা করেছি, আমাদের এ ধারণা তত আরও দৃঢ় হয়েছে।”
কেবল এক ঐতিহাসিক রহস্যের সমাধানই নয়, বরং এ গবেষণা রাপা নুই জনপদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেও তুলে ধরেছে। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এমন এক চমৎকার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন তারা, যার মাধ্যমে দ্বীপের বহু মাইল জুড়ে বিশাল পাথরের এসব মূর্তি স্থানান্তর করা সম্ভব হয়েছিল।