Published : 28 Dec 2025, 02:44 PM
ডাইনোসরদের জন্মের শতকোটি বছর আগে এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎপত্তিরও অনেক আগে পৃথিবী দেখতে বর্তমানের চেয়েও অনেক বেশি আদিম ও আলাদা ছিল।
কোটি কোটি বছর আগে কানাডার অন্টারিও অঞ্চলটি এখনকার মতো শীতল ছিল না। তখন সেখানে জলবায়ু ছিল প্রচণ্ড উষ্ণ এবং সেই অগভীর লবণাক্ত জলাশয়টি বাষ্পীভূত হয়ে আজকের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ডেথ ভ্যালি’র মতো রূপ নিচ্ছিল।
ওই সময় পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে তা পাথুরে লবণের স্ফটিক তৈরি করে। সেইসব স্ফটিকের ভেতরে আটকা পড়ে যায় তরল পদার্থ ও বাতাসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ। লবণের বিভিন্ন স্তর যখন পলির নিচে চাপা পড়ে তখন সেইসব অংশ সেখানে সংরক্ষিত হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
দীর্ঘ ১৪০ কোটি বছর ধরে সেইসব অতি ক্ষুদ্র বুদবুদ অস্পৃশ্য অবস্থায় ছিল। এগুলো অত্যন্ত নিরবে পৃথিবীর প্রাচীন বায়ুমণ্ডলের সরাসরি নমুনাকে সংরক্ষিত করে রেখেছে। অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই প্রাচীন রহস্য উন্মোচন করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।
অধ্যাপক মরগান শ্যালারের সঙ্গে মিলে এই প্রাচীন লবণের স্ফটিকের ভেতরে আটকে থাকা বিভিন্ন গ্যাস বিশ্লেষণ করেছেন ‘রেনসেলার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’-এর স্নাতক শিক্ষার্থী জাস্টিন পার্কের নেতৃত্বে গবেষকদের একটি দল।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সরাসরি রেকর্ডকে প্রায় ১৪০ কোটি বছর আগের অতীতে নিয়ে গিয়েছে তাদের এ কাজ। এর আগে বাতাসের সরাসরি নমুনার ওপর ভিত্তি করে এমন গবেষণা করা সম্ভব নয়নি।
তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ।
প্রাচীন বাতাস নিয়ে গবেষণার কাজটি বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিনের বড় এক চ্যালেঞ্জ। গবেষকরা কয়েক দশক ধরেই জানতেন, লবণের এসব স্ফটিক বাতাস ও লোনা পানিমিশ্রিত ক্ষুদ্র কিছু অংশ বা ‘ফ্লুইড ইনক্লুশন’ নিজেদের ভেতরে আটকে রাখতে পারে।
সমস্যা হচ্ছে গ্যাস যখন পানিতে দ্রবীভূত থাকে তখন তা মুক্ত বাতাসে থাকা গ্যাসের তুলনায় ভিন্ন আচরণ করে। এই ভিন্নতা আলাদা করা ও প্রাচীন বায়ুমণ্ডলের প্রকৃত বিভিন্ন উপাদান পুনরায় নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন কাজ ছিল।
পার্ক এ সমস্যার সমাধান করেছেন নতুন কিছু পদ্ধতি উদ্ভাবন ও গবেষণাগারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি নিজস্ব যন্ত্রপাতির মাধ্যম। ফলে গবেষক দলটি সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন গ্যাসকে আলাদা ও সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন।
প্রথমবারের মতো মেসোপ্রোটেরোজোয়িক যুগের কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অক্সিজেনের মাত্রা সরাসরি পরিমাপ করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর ইতিহাসের এ সময়কালটিকে অনেক সময় ‘বোরিং বিলিয়ন’ বা ‘একঘেয়ে শতকোটি বছর’ বলা হয়। কারণ, ধারণা করা হত এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর পরিবেশে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন বা নাটকীয় ঘটনা ঘটেনি।
গবেষণায় উঠে এসেছে, সেই সময়ে অক্সিজেনের মাত্রা ছিল বর্তমান বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৩.৭ শতাংশ, যা অনেক বিজ্ঞানীর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। অক্সিজেনের এ পরিমাণটি জটিল বহুকোষী প্রাণের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। এরপর আরও ৮০ কোটি বছর পর্যন্ত কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব দেখা যায়নি।
কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রাও ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, সেই সময় সূর্য এখনকার চেয়ে দুর্বল বা কম উত্তপ্ত হওয়ার পরও পৃথিবী কীভাবে উষ্ণ ছিল। কার্বন ডাই অক্সাইডের এই উচ্চ মাত্রা সম্ভবত পৃথিবীকে পুরোপুরি জমে বরফ হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে এবং বর্তমান যুগের মতো জলবায়ু তৈরি করে দিয়েছে।
তবে অক্সিজেনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার পরও প্রাণীরা আরও আগে বিবর্তিত হল না কেন? এমন প্রশ্নে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, তাদের এ নমুনাটি সেই বিশাল সময়ের ক্ষুদ্র এক মুহূর্তেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অক্সিজেনের উচ্চ মাত্রা সম্ভবত সংক্ষিপ্ত সময়ের বৃদ্ধি ছিল, দীর্ঘস্থায়ী কোনো অবস্থা নয়। এ আবিষ্কারে প্রমাণ মেলে ‘বোরিং বিলিয়ন’ যুগটি আসলে একঘেয়ে ছিল না, বরং ওই সময় বায়ুমণ্ডলে অনেক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছিল।
এ আবিষ্কারের সময়টিও বেশ কৌতুহলী উদ্দীপক। ওই সময়ের কাছাকাছি সময়েই পৃথিবীতে লাল শৈবালের দেখা গিয়েছিল, যা আজও অক্সিজেনের অন্যতম প্রধান উৎস। সেই প্রাচীন কালে এ শৈবালের সংখ্যা বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে থাকতে পারে।
প্রাচীন লবণের বিভিন্ন স্ফটিক উন্মোচনের মাধ্যমে পৃথিবীর সুদূর অতীতের এক বিরল ও সরাসরি দৃশ্যপট দেখার সুযোগ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার এসব তথ্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে ও কীভাবে জটিল প্রাণের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে সে সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিয়েছে।