Published : 18 Mar 2026, 10:35 AM
ডিজিটাল যুগে পৃথিবীর প্রায় সব অলিগলি এখন হাতের মুঠোয় হলেও আমেরিকার মিনেসোটার এক শহর গত ২০ বছর ধরে গুগল ম্যাপের স্ট্রিট ভিউ থেকে আড়ালে রয়েছে।
বিলাসবহুল এ শহরটির নাম ‘নর্থ ওকস’, যেখানে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যে কারো জন্যই বেশ কঠিন। সম্প্রতি ড্রোন ও কৌশলী পন্থায় শহরটির অন্দরমহলের রহস্য সামনে এনেছেন এক ইউটিউবার।
ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের জনবহুল শহর মিনিয়াপোলিস থেকে কেবল ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত এ শহর। গুগল ম্যাপের প্রায় সব ধরনের আধুনিক ফিচার থেকে এ এলাকাটি সম্পূর্ণ বাইরে।
মিনেসোটাভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতা ক্রিস পার ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল’কে বলেছেন, গত দুই দশক ধরে গুগলকে এ এলাকায় স্ট্রিট ভিউয়ের ছবি তুলতে বাধা দিয়ে আসছে শহরটির কর্তৃপক্ষ।
“আপনি যখন নর্থ ওকস সম্পর্কে জানতে শুরু করবেন তখনই এর আসল রহস্য আপনার সামনে উঠে আসবে।”
শহরটি নিজের এ গোপনীয়তা বজায় রাখতে পেরেছে প্রতিটি বাড়ি কেনার চুক্তিনামার এক বিশেষ নিয়মের কারণে। এখানকার প্রত্যেক বাসিন্দার সম্পত্তির সীমানা রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে পুরো এলাকাটি আইনগতভাবে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে বিবেচিত, যেখানে অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা বা ম্যাপ তৈরি নিষিদ্ধ।
এ আইন ব্যবহার করে ২০০৮ সালে শহরের কর্মকর্তারা গুগলকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
ওই সময় তৎকালীন মেয়র টমাস ওয়াটসন বলেছিলেন, “বিষয়টি এমন নয় যে কিছু অহংকারী মানুষ এ শহরকে পুরো দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আসলে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ঢোকার কোনো অনুমতি তাদের (গুগল) নেই।”
শহর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর গুগল তাদের অনলাইন ম্যাপ থেকে নর্থ ওকসের সব ‘স্ট্রিট ভিউ’ ছবি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
কনটেন্ট নির্মাতা ক্রিস পার বলেছেন, “ম্যাপ হচ্ছে জনকল্যাণমূলক কাঠামো। কোনো অঞ্চলের অসম্পূর্ণ মানচিত্র থাকা মানবতার জন্য এক ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো বিষয়।”
তবে নর্থ ওকসে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে তার একটি ফাঁক খুঁজে বের করেছেন পার।
তার ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা ভিডিও অনুসারে, নর্থ ওকস কেবল তাদের এলাকায় অনধিকার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। তবে ম্যাপ তৈরি নিষিদ্ধ করেনি। ফলে তিনি শহরের সীমানার বাইরে থেকে ড্রোন উড়িয়ে আকাশপথের সাহায্যে এলাকাটির মানচিত্র তৈরি করতে পেরেছেন।
শহরের এ কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা এড়িয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য ক্রিস পার ‘ক্রেইগসলিস্ট’-এ একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে নর্থ ওকসে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ চান। শেষ পর্যন্ত একজন ব্যক্তি ১০ ডলারের বিনিময়ে তাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেন।
ক্রিস পার বলেছেন, “সবার ধারণা যে মিনেসোটার বড় বড় কোম্পানির অনেক নির্বাহী এবং সিইওরা নর্থ ওকসে বসবাস করেন।”
উনবিংশ শতাব্দীতে রেলওয়ে টাইকুন জেমস জে. হিল এখানে ‘নর্থ ওকস ফার্ম’ তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সমৃদ্ধ এক শহরে পরিণত হয়।
এলএ চার্জার্স-এর জো অল্ট এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার মেন্ডেলও এখানে একটি জমির মালিক ছিলেন।
ইউটিউব ভিডিওতে ক্রিস পার দেখিয়েছেন, নর্থ ওকস শহরটি বিশাল সব প্রাসাদসম বাড়ি ও তুষার পরিষ্কার করা পরিপাটি রাস্তায় ভরে আছে। প্রতিটি বাড়ি সাজানো বাগান ও লনের মাঝে সুন্দরভাবে অবস্থিত। সেখানকার কিছু বিলাসবহুল বাড়ির দাম জনপ্রিয় আবাসন সাইট ‘জিলো’তে প্রায় ২৯ লাখ ডলার পর্যন্ত দেখা গেছে।
পুরো বিশ্বে নর্থ ওকসের মতো জায়গা খুব কমই আছে, যা গুগল ম্যাপের নজর থেকে এভাবে আড়ালে রয়েছে। যেমন, উত্তর কোরিয়ার প্রায় কোনো অংশই ম্যাপে নেই। কেবল রাজধানী পিয়ংইয়ং-এর হাতেগোনা কয়েকটি স্থান দেখা যায়।
প্রায় ৩৭ লাখ বর্গমাইল আয়তনের বিশাল দেশ চীনের গ্রাম অঞ্চলের অনেক অংশও ম্যাপে নেই। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে।
দেশটির প্রায় পুরো অংশই গুগল ম্যাপে দেখা সম্ভব। কেবল এরিয়া ৫১ ও অন্যান্য কিছু সরকারি স্থাপনা প্রযুক্তি কোম্পানিটির ম্যাপ পরিষেবা থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছে।
এ পুরো বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের জন্য ইন্ডিপেনডেন্টের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি গুগল কর্তৃপক্ষ এবং নর্থ ওকস-এর বর্তমান মেয়র ক্রিস্টা ওল্টার।