Published : 03 Apr 2026, 02:39 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত বিশেষ চশমা ও অ্যাপের মাধ্যমে দূর থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় ব্রাইটন ম্যারাথনে অংশ নিচ্ছেন দৃষ্টিহীন এক শিল্পী। এমন ঘটনা বিশ্বে এই প্রথম হতে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিহীন মানুষের সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে দিতেই তার এই রোমাঞ্চকর উদ্যোগ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
শিল্পীমহলে ‘মিস্টার ডট’ নামে পরিচিত ক্লার্ক রেনল্ডস ২৬.২ মাইলের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবেন ‘মেটা এআই’ চশমা পরে। এ চশমাটির যোগ থাকবে ‘বি মাই আইজ’ অ্যাপের সঙ্গে। এ অ্যাপটি দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজে, যেমন ঘরের কোনো জিনিস খুঁজে পেতে বা পণ্য চিনতে বিশ্বজুড়ে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে যোগ করে।
তবে ৪৫ বছর বয়সী রেনল্ডস এ প্রযুক্তির সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। তিনি ‘ফাইট ফর সাইট’ নামের চ্যারিটির জন্য এ ম্যারাথনে অংশ নিচ্ছেন।
নিজের এই সাহসী উদ্যোগ সম্পর্কে রেনল্ডস বলেছেন, “আমি যখন এ চশমা ও অ্যাপটি হাতে পাই তখন ভাবছিলাম, দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য এই প্রযুক্তি আর কী কী করতে পারে তার সীমা কতটুকু বাড়ানো যায়?”
তার লক্ষ্য, প্রযুক্তির মূল ব্যবহারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এর সম্ভাবনাকেই তুলে ধরা।
“আমি ভাবলাম, চলো আরও একবার ম্যারাথনে দৌড়াই, যেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষ আমার কানে কানে দিকনির্দেশনা দেবে।”
এ চ্যারিটির দূত হিসেবে তিনি আশা করছেন, তার এ চ্যালেঞ্জ দৃষ্টিহীনতা নিয়ে সমাজের নেতিবাচক ধারণা ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে।
রেনল্ডস ‘রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা’ নামের বংশগত এক সমস্যায় ভুগছেন। তার দৃষ্টিশক্তি অনেকটা পানির নিচে থাকার মতো, যেখানে কেবল ছায়া আর আবছা আকৃতি দেখা যায়।
গত বছর থেকে ‘রে-ব্যান মেটা এআই’ চশমা ব্যবহার শুরু করেছেন রেনল্ডস। তিনি আর্ট গ্যালারিতে গিয়ে ডেম জুডি ডেঞ্চের কণ্ঠে শিল্পকর্মের বর্ণনা শোনার জন্যও এ চশমা ব্যবহার করেছেন।
চশমার সঙ্গে অ্যাপটি যোগ করে এই শিল্পী ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে ‘বি মাই আইজ’ সক্রিয় করেন। এরপর তিনি একজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে যুক্ত হন। একজন স্বেচ্ছাসেবক চশমার মাধ্যমে রেনল্ডসের সামনের দৃশ্যগুলো দেখতে পান।
রেনল্ডস বলেছেন, “এসব কাজের মাধ্যমে আমি বলতে চাই, আমি অসাধারণ কেউ নই, বা কোনো সুপারহিরো নই। আমি আপনাদের মতোই সাধারণ একজন মানুষ, আমি কেবল এক বিকল্প পথ খুঁজে বের করেছি, যাতে আমি ম্যারাথনে দৌড়াতে পারি, যা আমার জীবন যাপনের নতুন এক মাধ্যম মাত্র।
“দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য প্রযুক্তি এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে হয়ত অনেক চিকিৎসা আসবে। তবে আমরা সেই চিকিৎসার অপেক্ষায় বসে থাকতে পারি না। আমাদের যতটুকু সম্ভব সেরা জীবন কাটাতে হবে।
“আমি সব সময় বলি, আমি দৃষ্টিহীন হওয়াটাকে ভালোবাসি। আমি তো এটা পরিবর্তন করতে পারব না, আমি নিজেকে সেভাবেই ভালোবাসি। আমি নিজেকে অক্ষম মনে করি না, আমি কেবল দৃষ্টিহীন, এইটুকুই।”
ম্যারাথনের প্রস্তুতির সময় এখন পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি মানুষ তাকে সাহায্য করেছেন। তার প্রথম স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একজন নারী।
এ ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন থাইল্যান্ডে ছুটিতে থাকা এক স্কটিশ নারী ও কানাডার একজন অবসরপ্রাপ্ত নৌকর্মকর্তা।
রেনল্ডস বলেছেন, “আমার স্বেচ্ছাসেবকরা সরাসরি চশমার মাধ্যমে সবকিছু দেখেন... যেন তারা আমার চোখ দিয়েই পুরো পৃথিবী দেখছেন।”
তারা রেনল্ডসকে রাস্তার ডাস্টবিন বা পার্ক করা গাড়ির মতো বিভিন্ন বাধা চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেন এবং একইসঙ্গে তাদের মধ্যে চমৎকার সব কথাবার্তাও হয়।
রেনল্ডস বলেছেন, সাধারণত স্বেচ্ছাসেবকরা এ কাজে এগিয়ে আসেন কারণ তাদের পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য হয়ত দৃষ্টিহীনতায় ভুগছেন।
“আমি কেবল ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধানে অনেক তথ্য পেয়ে যাই। কথা বলতে বলতে আর দৌড়াতে দৌড়াতে দেখা যায় চোখের পলকেই আমি তিন মাইল পথ পাড়ি দিয়েছি।”
এর আগে, একজন সরাসরি গাইডের (সহযোগী) সহায়তায় লন্ডন ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন রেনল্ডস। তবে সেবার তিনি ঠিক করেছিলেন যে আর কখনো এভাবে দৌড়াবেন না। কারণ এর জন্য সবসময় অন্য একজন মানুষের ওপর নির্ভর করতে হত ও এতে প্রশিক্ষণেও ব্যাঘাত ঘটত।
এ ছাড়া দুজনের কদমের ছন্দে অমিল হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিত।
তার বদলে তিনি এখন রিমোট অবস্থান থেকে পাওয়া সহায়তায় দৌড়ানোকে অনেক সহজ মনে করছেন। নিজের বাড়ির আশপাশে ০.৮ মাইলের ল্যাপে তিনি এখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
রেনল্ডস বলেছেন, “এখন আমি নিজের গতিতে দৌড়াতে পারি। কোনো বাড়তি চাপ নেই। আমাকে অন্য কারও কদমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। আপনি তো গল্পের মধ্যে হারিয়ে যাবেন, আমরা খেলাধুলা থেকে শুরু করে আবহাওয়া, সব বিষয় নিয়ে কথা বলি, বিশেষ করে যদি তারা বিদেশী হয়ে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে এসব আলাপ আমি সত্যিই খুব উপভোগ করি।”
ম্যারাথনের দিন ‘ফাইট ফর সাইট’ চ্যারিটি তার জন্য একদল স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখছে, যার মধ্যে রয়েছে তার পরিবার, বন্ধু ও সম্ভাব্য কিছু ‘সেলিব্রিটি’। তারা সবাই মিলে রেনল্ডসকে ফিনিশ লাইন পার করতে সাহায্য করবেন। তিনি ছয় ঘণ্টার মধ্যে এই দৌড় শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছেন।
রসিক এই দৌড়বিদ আশা করেছিলেন যে স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকায় টিভি উপস্থাপিকা ভিক্টোরিয়া কোরেন মিচেল থাকবেন। ভিক্টোরিয়া নিজে থাকতে না পারলেও ‘অনলি কানেক্ট’ কুইজ শো’র এ উপস্থাপিকা রেনল্ডসের তহবিলে আড়াইশ পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন।
রেনল্ডসের অনুদানের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫০ পাউন্ড। তবে বড় বড় অনুদান ও ‘বি মাই আইজ’-এর সহায়তায় এখন তার লক্ষ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার পাউন্ডে।
‘ফাইট ফর সাইট’-এর পরিচালক এলিনর সাউথউড বলেছেন, “আমাদের একজন অ্যাম্বাসেডরকে এমন অসাধারণ চ্যালেঞ্জ নিতে দেখাটা এক কথায় চমৎকার। কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি রেনল্ডস তার যাত্রাপথে ‘বি মাই আইজ’-এর স্বেচ্ছাসেবকদের যোগ করে এক অনন্য উপায়ে জনসচেতনতা তৈরি করছেন। আমরা তাকে উৎসাহিত করার জন্য অধীর অপেক্ষায় আছি!”
ব্রেইল পদ্ধতির এই শিল্পী তার শিল্পের মাধ্যমেও ‘মজার ও খেলার ছলে’ সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করেন। আমেরিকা থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত তার একক শিল্প প্রদর্শনী হয়েছে।
আগামী বছর তার এক বিশেষ ‘আর্ট ইনস্টলেশন’ আসার কথা রয়েছে, যেখানে একটি দোকানের ব্র্যান্ডের নাম থেকে শুরু করে অর্থ ও সাইনবোর্ড সবকিছুই থাকবে ব্রেইল পদ্ধতিতে।
তিনি বলেছেন, “এমনটি হতে যাচ্ছে আমার শিল্পী জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত।”