Published : 26 Jun 2026, 01:12 PM
অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম এক অঞ্চলে প্রায় তিনশ কোটি বছর আগের এক উল্কা গহ্বরের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের প্রাচীনতম উল্কাপাতের স্থান।
শিলার ভেতরের খনিজ কণা বিশ্লেষণ করে পাওয়া এ অকাট্য প্রমাণ আদি পৃথিবীর প্রলয়ঙ্করী গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন ধারণা দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পিলবারা অঞ্চলের প্রাচীন শিলাগুলোতে এ মহাজাগতিক ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। ঘটনাটি ঘটেছিল আর্কিয়ান যুগ বা ৪০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি বছর আগে। এ সময় পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো কেবল গঠিত হতে শুরু করেছে এবং আদিম প্রাণের বিকাশ ঘটছে।
উল্কাপাতের সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণের জন্য ‘কার্টিন ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানীরা ‘নর্থ পোল ডোম ক্রেটার’ নামের এলাকার কিছু বিরল ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, যা ‘শ্যাটার কোন’ বা উল্কাপাতের ফলে পাথরে তৈরি শঙ্কু আকৃতির ফাটল নামে পরিচিত।
তাদের এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জিওলজি’তে।
কার্টিন ইউনিভার্সিটির ‘টাইমস্কেলস অফ মিনারেল সিস্টেমস গ্রুপ’-এর ভূতত্ত্ববিদ ও এ গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক ক্রিস কার্কল্যান্ড বলেছেন, “সুসংরক্ষিত এসব শিলাস্তর বিশ্বজুড়ে ভূতাত্ত্বিক সময়ের এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ দলিল, যেখানে আদি পৃথিবীকে রূপদানকারী হিংস্র ও প্রলয়ঙ্করী বিভিন্ন প্রক্রিয়ার বিরল এক ঝলক আমাদের সামনে তুলে ধরে।
“পৃথিবীতে এমন খুব কম জায়গা আছে, যা টাইম ক্যাপসুল হিসেবে কাজ করে এবং আমাদের গ্রহের গঠন প্রক্রিয়াকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। আর এ কারণেই এগুলো এত বিশেষ।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, ‘নর্থ পোল ডোম ক্রেটার’ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ারই অন্য আরেকটি গহ্বর ‘ইয়ারাবুব্বা’র চেয়েও প্রাচীন। এর আগে দুইশ ২০ কোটি বছরের পুরানো ‘ইয়ারাভাবা’ গহ্বরটিই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন উল্কাপাতের স্থান হিসেবে বিবেচিত হত।
উল্কাটি ঠিক কখন পৃথিবীর বুকে আঘাত হেনেছিল তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে গবেষকেরা দুটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

গবেষকেরা ব্যাসাল্ট পাথরের ভেতরে থাকা জিরকন খনিজের ‘ছোট বজ্রপাতের মতো’ আকৃতির বিভিন্ন কণার বয়স বিশ্লেষণ করেছেন।
উল্কাপাতের তীব্র তাপে এসব ক্ষুদ্র জিরকন দানা গলিত অবস্থা থেকে পুনরায় স্ফটিকে পরিণত হয়ে কাঁটার মতো এক অদ্ভুত কঙ্কাল সদৃশ কাঠামো তৈরি করেছিল, যা সাধারণত চাঁদের বুকে উল্কাপাতের ফলে তৈরি বিভিন্ন গহ্বরেই কেবল দেখা যায়।
অস্ট্রেলিয়ার তৈরি বিশেষ যন্ত্র ‘সেনসিটিভ হাই-রেজোলিউশন আয়ন মাইক্রোপ্রোব’-এর সাহায্যে এসব জিরকন স্ফটিকের বয়স পরিমাপ করা হয়। এতে দেখা যায়, আকৃতি পরিবর্তনকারী এ তীব্র ধাক্কাটি প্রায় তিনশ কোটি বছর আগে ঘটেছিল।
পাশাপাশি, বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাপাটাইট’ বা এক ধরনের ক্যালসিয়াম ফসফেট খনিজের বয়সও বিশ্লেষণ করেছেন। উল্কাপাতের পর তীব্র তাপ ও উত্তপ্ত তরলের কারণে পাথরের ফাটলে এ খনিজটি তৈরি হয়েছিল। এ বিশ্লেষণ থেকেও বিজ্ঞানীরা একই ধরনের সময়কালের সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
অধ্যাপক কার্কল্যান্ড বলেছেন, উল্কাটি আঘাত হানার সময় পৃথিবী আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জায়গা ছিল। ওই সময় পৃথিবী ‘পানিময়’ ছিল, যেখানে মহাদেশীয় ভূত্বক বা স্থলের পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য, যেখানে সূর্য বর্তমানের চেয়ে ঝাপসা বা স্তিমিত এবং চাঁদ ছিল পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি। পৃথিবীতে আদি প্রাণের অস্তিত্ব ছিল ‘স্ট্রোমাটোলাইট’ বা এক ধরনের সায়ানোব্যাকটেরিয়া বা শ্যাওলা আকারে।
‘ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটি’র ভূ-রসায়নবিদ ও সহযোগী অধ্যাপক ব্রুস শেফার বলেছেন, আর্কিয়ান যুগে পৃথিবী ক্রমাগত উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে ‘বিধ্বস্ত’ হচ্ছিল। এসব আঘাতের চিহ্ন এখনো চাঁদের পৃষ্ঠের গহ্বরগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায়।
পৃথিবীর বুকে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া, ভূত্বকের ক্ষয় ও সাবডাকশন বা এক প্লেটের নিচে অন্য প্লেটের ঢুকে যাওয়া প্রক্রিয়ার কারণে ভূমিতে থাকা সেই প্রাচীন বিভিন্ন চিহ্নের বেশিরভাগই মুছে গেছে।
“পৃথিবীর বুকেও সেই একই ধরনের উল্কাপাতের ঘটনার প্রমাণ খুঁজে পাওয়া সত্যিই রোমাঞ্চকর। আমরা জানি যে এমনটা ঘটেছিল, তবে বাস্তবে তা দেখা ও নিজের হাতে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারাটা রোমাঞ্চকর।”
এ গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যোগ না থাকলেও শেফার বলেছেন, সংঘর্ষের ফলে জিরকনের পুনরায় স্ফটিকে রূপান্তর ও অ্যাপাটাইটের গঠনের ওপর ভিত্তি করে গবেষকেরা কিছু উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা ঠিক কী ঘটেছিল তা উন্মোচন করতে সাহায্য করেছে।
“এমনটা সত্যিকারের এক গোয়েন্দা কাহিনীর মতো। এ দুটি উপাদানই যে একই সময়ে পরিবর্তিত হয়েছিল তা-ই এ ঘটনাটির সময়কাল নিখুঁতভাবে প্রমাণের সবচেয়ে শক্তিশালী উৎস। এ অ্যাপাটাইট ও জিরকন একসঙ্গেই এ ঘটনার অকাট্য প্রমাণ বা স্মোকিং গান হিসেবে কাজ করেছে।”