Published : 16 Jul 2026, 02:39 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে তরুণদের পাশাপাশি বয়স্ক কর্মীরাও বড় ধরনের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বস্টন কলেজের ‘সেন্টার ফর রিটায়ারমেন্ট রিসার্চ’-এর নতুন গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের পর থেকে এআইসংশ্লিষ্ট শিল্প খাতগুলোয় ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের চাকরি ছাড়ার বা বেকার হওয়ার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে।
স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে সরাসরি কাজ হারানো বা প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিক চাপ উভয় কারণেই বয়স্ক পেশাজীবীদের চিরাচরিত অবসরের হিসাব বদলে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
বয়স্ক কর্মীদের ওপর এআইয়ের তিন ধরনের প্রভাব
প্রতিবেদনটির লেখক ও অর্থনীতির অধ্যাপক জিওফ্রে সানজেনবাখার বলেছেন, এআই মূলত তিনটি উপায়ে বয়স্ক কর্মীদের কর্মজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে।
● স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন: প্রযুক্তির কারণে কর্মীরা সরাসরি প্রতিস্থাপিত হচ্ছেন, যার ফলে তারা বেকার হয়ে যাচ্ছেন বা শ্রমবাজার থেকে পুরোপুরি ছিটকে পড়ছেন।
● প্রযুক্তির চাপ ও অবসর: নতুন এআই প্রযুক্তি মানিয়ে নেওয়ার মানসিক চাপ থেকে বাঁচতে অনেকে এমন চাকরি খুঁজছেন যেখানে এআইয়ের ব্যবহার নেই বা তারা সময়ের আগেই স্থায়ীভাবে অবসরে চলে যাচ্ছেন।
● ইতিবাচক প্রভাব: কিছু ক্ষেত্রে জেনারেটিভ এআই কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও মজুরি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের আরও দীর্ঘ সময় কাজ করতে ও কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করছে।
‘টাফটস ইউনিভার্সিটি’র ‘ডিজিটাল প্ল্যানেট’ উদ্যোগ ও ‘কারেন্ট পপুলেশন সার্ভে’র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি আসার আগে পর্যন্ত এআইসংশ্লিষ্ট পেশাগুলোতে বয়স্ক কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের হার কম ছিল। চ্যাটজিপিটি পরবর্তী সময়ে এই চিত্র বদলেছে এবং তাদের চাকরি ছাড়ার হার এখন ‘পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এআই কমিয়ে দিতে পারে কর্মজীবনে দৈর্ঘ্যের ব্যবধান
এআইয়ের কারণে বিভিন্ন পেশার বয়স্ক কর্মীদের দীর্ঘ কর্মজীবনের মেয়াদ কমে আসতে পারে। অধ্যাপক সানজেনবাখারের গবেষণা অনুসারে, যেসব বয়স্ক কর্মী এআই-সংক্রান্ত পরিবর্তনের মুখে বেশি পড়ার ঝুঁকিতে আছেন তারা শ্বেতাঙ্গ, কলেজ ডিগ্রিধারী ও এআই নিয়ে কম ঝুঁকির মুখে থাকা কর্মীদের তুলনায় বেশি আয় করেন।
‘ডিজিটাল প্ল্যানেট’-এর এআই এক্সপোজার স্কোরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এ গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ও সবচেয়ে কম ঝুঁকির মুখে থাকা পেশাগুলো হচ্ছে–
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকা ৫ পেশা
● ওয়েব ও ডিজিটাল ইন্টারফেইস ডিজাইনার
● ওয়েব ডেভেলপার
● ডেটাবেইস আর্কিটেক্ট
● কম্পিউটার প্রোগ্রামার
● ডেটা সায়েন্টিস্ট
সবচেয়ে কম ঝুঁকির মুখে থাকা পাঁচ পেশা
● খনন ও লোডিং চালনা কর্মী
● খনির ছাদ নির্মাণ কর্মী
● হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়
● পেইন্টিং ও স্প্রে কর্মী
● ফাইবারগ্লাস ল্যামিনেটর ও প্রস্তুতকারক
এ তথ্যটি সমাজে প্রচলিত একটি ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সাধারণত মনে করা হয়, শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত বয়স্ক কর্মীরা সংক্ষিপ্ত কর্মজীবনের কারণে উচ্চশিক্ষিত ও ‘হোয়াইট-কলার’ কর্মীদের চেয়ে দ্রুত অবসরে যান।
তবে সানজেনবাখার তার গবেষণায় লিখেছেন, “এআইয়ের প্রভাব কম ও উচ্চ বেতনের বিভিন্ন চাকরির মধ্যে কর্মজীবনের দৈর্ঘ্যের এ ব্যবধানকে কমিয়ে আনতে পারে।”
ফলে, নীতিনির্ধারকরা যখন অবসরের বয়স পরিবর্তন করার কথা বিবেচনা করবেন তখন তাদের অবশ্যই এআইয়ের এসব সম্ভাব্য প্রভাব মাথায় রাখা উচিত।
উচ্চ আয়ের কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা কমতে পারে
ট্রাস্টিদের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, অবসরকালীন সুবিধা প্রদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলটি ২০৩২ সালের শেষদিকে শেষ হতে পারে। এ তহবিলের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে নীতিনির্ধারকরা অবসরের বয়স বাড়ানোসহ বেশ কিছু পরিবর্তন বেছে নিতে পারেন।
এর আগে, ১৯৮৩ সালে সর্বশেষ বড় সংস্কারের সময় অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে ৬৭ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। নতুন সংস্কারেও বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এমনটা কোনো স্বল্পমেয়াদী সমাধান নয়। এ ছাড়া উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর ‘পে-রোল ট্যাক্স’ বা প্যারোল কর বাড়ানোর বিকল্পও রয়েছে, যা ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় একটি প্রস্তাব।
অধ্যাপক সানজেনবাখার বলেছেন, “সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরবর্তীতে যা-ই ঘটুক না কেন, কম আয়ের মানুষের তুলনায় উচ্চ আয়ের মানুষের সুবিধা অনেক বেশি কমে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
“আর্থিক কারণে এ শ্রেণির মানুষদের এখন আরও দীর্ঘ সময় কাজ করা প্রয়োজন। তবে কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব কীভাবে প্রকাশ পায় তার ওপর ভিত্তি করে কাজের ক্ষেত্রে কর্মীদের সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।”
বয়স্ক কর্মীদের মানিয়ে নেওয়ার উপায়
সানজেনবাখার বলেছেন, বয়স্ক কর্মীরাও এআই গ্রহণ করছেন তবে তা তরুণ কর্মীদের মতো অতটা ব্যাপক হারে নয়।
‘এএআরপি’র সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১ হাজার ১৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ২৪ শতাংশ এআই’কে তাদের কাজের ক্ষেত্রে হুমকি ও ১৯ শতাংশ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, ৩৭ শতাংশ মনে করছেন, এআই একইসঙ্গে হুমকি ও সুযোগ তৈরি করছে।
তবে এএআরপি ও লিংকডইন-এর আলাদা গবেষণায় দেখা গেছে, অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের চাকরিগুলো জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা থেকে সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা বেশি। তরুণ কর্মীদের ৪২.২ শতাংশের তুলনায় বয়স্ক কর্মীদের ৪৯.৪ শতাংশ এমন সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছেন।
কারণ, বয়স্ক কর্মীদের বিভিন্ন কাজে সাধারণত এমন কিছু দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা এআই সহজে নকল করতে পারে না, যেমন পারস্পরিক সহযোগিতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্ব।
‘মনস্টার’-এর ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ ভিকি সালেমি বলেছেন, যেসব বয়স্ক পেশাজীবী এখনও এআই ব্যবহার শুরু করেননি, তাদের জন্য এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।
মনস্টারের ডিসেম্বর ‘ওয়ার্কওয়াচ’ প্রতিবেদন অনুসারে, জরিপকৃত ১ হাজার ৫০৪ জন কর্মীর মধ্যে ৪২ শতাংশই এআই মোটেও ব্যবহার করেন না। যারা ব্যবহার করেন তাদের বড় অংশই ইমেইল, শেডিউলিং ও লেখার সহায়তার মতো প্রাথমিক কাজে ব্যবহার করছেন।
অন্য অনেকে কোডিং, অটোমেশন, ডেটা অ্যানালাইসিস, চাকরির আবেদন বা রেজুমে ও কভার লেটার তৈরি বা গ্রাফিক্স ও কনটেন্টের মতো সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহার করছেন।
সালেমি বয়স্ক কর্মীদের বর্তমানের শ্রমবাজারে টিকে থাকার জন্য দ্বিমুখী কৌশল নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে এআই সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং একইসঙ্গে নিজেদের বিভিন্ন মানবিক দক্ষতাকে আরও দৃঢ় করার কথা বলেছেন তিনি।
সালেমি বলেছেন, এমনটা শুরু করার একটি ভালো উপায় হচ্ছে আপনার কোম্পানি বর্তমানে যেসব এআই টুল ব্যবহার করছে সেগুলো শিখে নেওয়া, যা আপনাকে গভীর চিন্তাভাবনার জন্য বাড়তি সময় দেবে। পাশাপাশি বর্তমান পদে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বা নতুন চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে যোগাযোগ দক্ষতা, সম্পর্ক তৈরি ও সমস্যা সমাধানের মতো দক্ষতাগুলো ফুটিয়ে তুলতে ভুলবেন না।
“আপনি যখন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে গড়ে তোলার ক্ষমতার পাশাপাশি শক্তিশালী মানবিক দক্ষতা দেখাতে পারবেন তখন তা আপনার প্রার্থীতার জন্য সবুজ সংকেত হিসেবে কাজ করবে।”