Published : 28 Mar 2026, 01:09 PM
আধুনিক পৃথিবীর ঘড়ি পারমাণবিক শক্তিতে চললেও সময় গণনার পদ্ধতিটি আসলে প্রাগৈতিহাসিক। এ যুগেও হাজার বছরের পুরানো এক জটিল পদ্ধতি মেনে চলছে সময়।
এ রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে মেসোপটেমিয়ার ধূলিকণা মাখা প্রাচীন লিপি আর সুমেরীয়দের আঙুলের গাঁটের গণনায়।
বিবিসি লিখেছে, সেকেন্ড, মিনিট ও ঘণ্টার হিসাবের রহস্যময় সিদ্ধান্তটি আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে নেওয়া হয়েছিল, যার রেশ ধরে মানুষ আজও সময় গণনা করছে।
১৭৯৩ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সের নবগঠিত প্রজাতন্ত্র দুর্ভাগ্যজনক এক পরীক্ষা শুরু করেছিল সময় গণণার প্রচলিত এ নিয়মকে পাল্টে ফেলার। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রচলিত সময়ের হিসাব বদলে ফেলবে। স্বাভাবিকভাবেই তারা মেট্রিক পদ্ধতি প্রয়োগের কথা ভাবছিলেন।
ওই সময়ের ফ্রান্সের বিপ্লবীরা ঠিক করেছিলেন একদিনকে ২৪ ঘণ্টার বদলে ১০ ঘণ্টায় ভাগ করা হবে। প্রতি ঘণ্টায় থাকবে ১০০টি করে ‘ডেসিমেল মিনিট’ ও প্রতি মিনিটে থাকবে ১০০টি করে ‘ডেসিমেল সেকেন্ড’।
সময়ের এ পদ্ধতিটি ছিল বিপ্লবীদের তৈরি বড় এক ক্যালেন্ডারের অংশ। যার লক্ষ্য, বছরের গঠনকে আরও যুক্তিযুক্ত ও খ্রিস্টধর্মীয় প্রভাবমুক্ত করা। যার মধ্যে ছিল ১০ দিনে এক সপ্তাহ হওয়ার নিয়মও।
প্রচলিত বিভিন্ন ঘড়িকে এ নতুন ডেসিমেল পদ্ধতিতে রূপান্তরের কাজ দ্রুত শুরু হয়ে যায়। সিটি হলগুলোতে ডেসিমেল ঘড়ি বসানো এবং সরকারি সব কাজ এই নতুন ক্যালেন্ডার অনুসারে রেকর্ড করা হতে থাকে।
লন্ডনের ‘রয়াল মিউজিয়াম গ্রিনউইচ’-এর বিজ্ঞান যোগাযোগকর্মী ফিন বুরিজ বলেছেন, এ পদ্ধতিটি দ্রুতই অসংখ্য সমস্যা তৈরি করতে শুরু করে।
পুরানো বিভিন্ন ঘড়িকে নতুন করে ডিজাইন বা পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যবস্থার কারণে ফ্রান্স তার প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, গ্রামের মানুষ ১০ দিন পর পর ছুটির বিষয়টি একেবারেই পছন্দ করেনি। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সে এ ডেসিমেল সময় পদ্ধতি এক বছরের কিছু বেশি সময় টিকে ছিল।
মানুষ কীভাবে একদিনকে ২৪ ঘণ্টা, এক ঘণ্টাকে ৬০ মিনিট ও এক মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে গণনা করতে শুরু করলেন, যা আজও প্রচলিত রয়েছে তা বুঝতে আমাদের সময় গণনার একদম শুরুর যুগে ফিরে যেতে হবে।
সময় গণনার বিষয়টি প্রাচীনতম বিভিন্ন সংখ্যা পদ্ধতির গল্প, যা মানুষদের এ পথে নিয়ে গিয়েছিল এবং বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করেছে যে, কেন এ জটিল পদ্ধতিটি এর উদ্ভাবক সভ্যতার পতনের পরও আজও টিকে আছে।
৬০ ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি
এই সবকিছুর মূলে রয়েছে সুমেরীয়রা। তারা ছিল মেসোপটেমিয়ার (মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে বর্তমান ইরাক) এক প্রাচীন জাতি, যারা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০০ থেকে ১৯৪০ অব্দ পর্যন্ত সেখানে বসবাস করতেন।
তারাই ছিল বিশ্বের প্রথম শহর গড়ে তোলা সভ্যতাগুলোর একটি। সেচ ব্যবস্থা ও লাঙলসহ আরও অনেক উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রথম লিখিত লিপি তৈরির কৃতিত্বও তাদেরই দেওয়া হয়। তাদের এই লিপিতে সংখ্যা গণনার ভিত্তি ছিল ‘৬০’।
মানুষের প্রতিটি আঙুলে তিনটি করে কর বা গাঁট আছে। বুড়ো আঙুল বাদ দিয়ে এক হাতের বাকি চারটি আঙুলের সবকটি গাঁট গুনলে ১২ পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে। এবার অন্য হাতের একটি আঙুল দিয়ে এই ১২’কে ‘একক’ হিসেবে ধরুন এবং প্রথম হাতে আবার ১২ পর্যন্ত গোনা শুরু করুন। এভাবে দ্বিতীয় হাতের পাঁচটি আঙুল ব্যবহার শেষ হওয়া পর্যন্ত গুনতে থাকুন। আপনি কত পর্যন্ত গুনলেন? ষাট (৬০)।
সুমেরীয়রা কেন তাদের গণিত ব্যবস্থাকে ‘১০’ এর বদলে ‘৬০’ এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিল তা নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন তত্ত্বের মধ্যে এই একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা মেলে। তাদের সেই সিদ্ধান্ত আজও মানুষের সময় গণনার পদ্ধতির ওপর প্রভাব ফেলে চলেছে।
কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ব্রান্সউইক’-এর কিউনিফর্ম বা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের লিখন পদ্ধতি বিশেষজ্ঞ মার্টিন উইলিস মনরো বলেছেন, সুমেরীয়দের ক্রমাগত বিভিন্ন শহরে কৃষিব্যবস্থা দিন দিন বড় ও জটিল হয়ে উঠছিল। সেই কৃষিকাজের হিসাব রাখার তাগিদ থেকেই মূলত তারা এ লিখিত সংখ্যা পদ্ধতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।
তারা হিসাব রাখার জন্য ছোট ছোট মাটির ‘ট্যাবলেট’ ব্যবহার করতে শুরু করে, যেগুলোর আকার ছিল বর্তমানের স্মার্টফোনের সমান বা তার চেয়েও ছোট। নরম মাটির ওপর তারা সংখ্যার বিস্তারিত তথ্য ছাপ দিয়ে লিখে রাখতেন।
এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে চিহ্ন দেওয়ার পদ্ধতিও চলে আসে, যা পরবর্তীতে সুমেরীয়দের বিখ্যাত ‘কিউনিফর্ম’ লিপি হিসেবে পরিচিতি পায়।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এসব মাটির ট্যাবলেট আবিষ্কৃত হয় এবং সেগুলোর পাঠোদ্ধারের কাজ শুরু হয়।
বিশেষজ্ঞ মনরো বলেছেন, এসব ‘ট্যাবলেট’ থেকে ইঙ্গিত মেলে সুমেরীয়রা অনেক ধরনের সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। তবে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও শেষ পর্যন্ত সময়ের হিসাব রাখার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘সেক্সাজেসিমাল’ বা ৬০ ভিত্তিক পদ্ধতি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্রাউন ইউনিভার্সিটি’র প্রাচীন বিজ্ঞান ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ এরিকা মেজারোস বলেছেন, সুমেরীয়রা ৬০’কে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করতেন যেভাবে মানুষ এখন ১০’কে ব্যবহার করেন।
যেমন, মানুষ ৯ এর পরে যখন পরের ঘরে যান তখন বামে ‘১’ লিখি ও ডানে ‘০’ বসিয়ে ১০ করেন। ঠিক একইভাবে তারা ৫৯ পর্যন্ত গোনার পর ৬০ এর জন্য আলাদা কোনো বড় সংখ্যা ব্যবহার না করে বামের ঘরে ‘১’ বসাতেন।
আঙুলে গোনার যে তত্ত্বটি আগে বলা হয়েছে তার পরও সুমেরীয়রা ঠিক কেন ৬০ ভিত্তিক পদ্ধতিটিই বেছে নিয়েছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মনরো বলেছেন, “৬০ সংখ্যাটি ঠিক কোথা থেকে এল এর খুব বেশি অকাট্য প্রমাণ নেই।” কোনো কোনো গবেষকদের ধারণা, এ পদ্ধতিটি হয়ত সুমেরীয়দের আগমনের আগেও প্রচলিত ছিল।
তবে পদ্ধতিটি কেন এত জনপ্রিয় হয়েছিল তার কারণ স্পষ্ট। ৬০ সংখ্যাটিকে কোনো ভগ্নাংশ বা দশমিক ছাড়াই ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০, ৩০ ও ৬০ দিয়ে অনায়াসেই ভাগ করা যায়। এর বিপরীতে ১০ সংখ্যাটিকে কেবল ১, ২, ৫ ও ১০ দিয়ে ভাগ করা সম্ভব।
এসব পার্থক্যই এর বিভিন্ন সুবিধা স্পষ্ট করে তোলে।
গবেষক মেজারোস বলেছেন, “আপনি যখন হিসাবরক্ষণ, ট্যাক্স বা জমি পরিমাপের মতো অতি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য সংখ্যা পদ্ধতি তৈরি করছেন বা আপনার সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে জমি ভাগ করে দিচ্ছেন তখন এ ধরনের সহজ গাণিতিক হিসাব পদ্ধতি সত্যিই অনেক সহায়ক হয়।”

সময়ের আদি উৎস
সুমেরীয়রা সময় গণনা করতেন কি না তার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
তবে বিশেষজ্ঞ মনরো বলেছেন, ব্যাবিলনীয়দের (সুমেরীয়দের পরবর্তী মেসোপটেমীয় সভ্যতা) হাতে এক হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে সূর্যঘড়ি ও জলঘড়ির প্রথম ব্যবহার দেখা যাওয়ার অনেক আগে থেকেই সম্ভবত এ অঞ্চলে সময় গণনার প্রচলন ছিল।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ বাসেল’-এর প্রত্ন-জ্যোতির্বিজ্ঞানী রিতা গাউচি বলেছেন, মিশরীয় সভ্যতাই প্রথম যারা দিনকে বিভিন্ন ‘ঘণ্টায়’ ভাগ করেছিলেন।
প্রায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে এর প্রমাণ মেলে, যেখানে ঘণ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথম পরিচিত বিভিন্ন বস্তু রাতের ১২ ঘণ্টার হিসাব দিত।
গাউচি বলেছেন, এগুলো ছিল এক ধরনের ‘স্টার ক্লক’ বা তারা ঘড়ি, যা ২১০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মিশরীয় অভিজাতদের কফিনের ভেতরের ঢাকনায় পাওয়া গেছে।
মিশরীয়রা ঠিক কেন ১২ এর বিভাজন বেছে নিয়েছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত পুরো দিন ২৪ ঘণ্টায় রূপ নিয়েছে তা নিশ্চিত নয়। তাদের ১২টি রাশির একটি চক্র ছিল, তবে সেটি সম্ভবত ১২ ঘণ্টার হিসাব চালু হওয়ার পরে এসেছিল।
এক হাতের আঙুলের গাঁট ব্যবহার করে ১২ পর্যন্ত গোনার বিষয়টিও এখানে একটি সম্ভাবনা হতে পারে।
আবার কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ১০ দিনে এক সপ্তাহের নিয়মের সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু তারার উদয়-অস্ত যাওয়ার মিল থাকায় মিশরীয়রা ১২ সংখ্যা বেছে নিয়েছিলেন।
সময় পরিমাপের সবচেয়ে প্রাচীন যন্ত্র হিসেবে পরিচিত সূর্যঘড়ি ও জলঘড়ি খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ মিশরে আবির্ভুত হয়।
বিশেষজ্ঞ রিতা গাউচি বলেছেন, এগুলোর কিছু কিছু দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগই ছিল ‘সম্ভবত সময় গণনার চেয়ে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত’।
“ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এগুলোর অনেকগুলোই ছিল দেবতাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া উপহার বা মানত। সেই যুগে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সময় গণনার ব্যাপারে আমাদের কাছে খুব বেশি তথ্য নেই।”
শুরুর দিকে মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের নথিপত্রে সময়ের ক্ষুদ্রতম একক ছিল ‘কাজের শিফট’।
গাউচি বলেছেন, সাধারণত এসব শিফটকে সকাল বা বিকেল এ দুই ভাগে ভাগ করা হত। তবে প্রাচীন মিশরের রোমান শাসনকাল খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দ থেকে ‘ঘণ্টা’ একটি আদর্শ একক হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই সময়ে ‘আধা ঘণ্টা’র ধারণাটিও প্রচলিত হতে শুরু করে।
মিনিটের আগমন
এদিকে, ব্যাবিলনীয়রাও ঘণ্টার ব্যবহার নিয়ে কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত তারাই প্রথম ঘণ্টাকে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এককে ভাগ করেছিল। তবে এর উদ্দেশ্যে সময় গণনা ছিল না।
ব্যাবিলনীয়রা (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ৫৪০ অব্দ পর্যন্ত যাদের দাপট ছিল) সুমেরীয়দের কাছ থেকে ‘কিউনিফর্ম’ লিপি ও ‘৬০ ভিত্তিক’ সংখ্যা পদ্ধতি উভয়ই গ্রহণ করেছিল।
বিশেষজ্ঞ মেজারোস বলেছেন, এক হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে তারা একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করেন, যা সূর্য আকাশে পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরে আসতে যে সময় নেয় (৩৬০ দিনের কিছু বেশি) এর ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল।
যে সভ্যতা আগে থেকেই ৬০ ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি ব্যবহার করছিল তাদের জন্য ‘৩৬০’ ছিল সুবিধাজনক সংখ্যা।
মেজারোস বলেছেন, “৬০ ভিত্তিক পদ্ধতিতে এমনটা সত্যিই দারুণ বিষয় ছিল। ফলে ৩৬০ দিনকে সহজেই ৩০ দিন করে ১২টি মাসে ভাগ করা যেত, যা চাঁদের চক্রের সঙ্গেও মিলে যেত।”
ব্যাবিলনীয়রা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ব্যবহারিক এক পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যেখানে মিশরীয়দের মতোই দিন ও রাতকে আলাদাভাবে ১২ ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।
তবে এ ‘ঋতুভিত্তিক ঘণ্টার’ দৈর্ঘ্য দিন ও রাতের হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হত।
মেজারোস বলেছেন, “আমরা দিনকে ১২ ভাগে ভাগ করেছি কারণ আমরা রাতের আকাশকে ১২টি মাস ও ১২টি রাশিতে ভাগ করি।”
অন্যান্য অনেক প্রাচীন সভ্যতাও এ ঋতুভিত্তিক ঘণ্টা ব্যবহার করত এবং ১৫ শতকের ইউরোপ ও ১৯ শতকের জাপানেও এর প্রচলন ছিল।
তবে বিশেষজ্ঞ মনরো বলেছেন, এ ঋতুভিত্তিক সময়কে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এর আগে কখনোই ছোট এককে যেমন মিনিট বা সেকেন্ডে ভাগ করা হয়নি।
“আদি আধুনিক যুগের আগে এমন বিষয় আসলে ছিল না... মেসোপটেমিয়া বা অন্য প্রাচীন সংস্কৃতিতেও এর অস্তিত্ব ছিল না। কারণ তখন এর আসলে কোনো প্রয়োজনও ছিল না।”
ব্যাবিলনীয়রা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ঘটনা গণনা ও পরিমাপের জন্য আরেকটি সময় পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ছিল না। এ পদ্ধতিতে তারা দিনকে ১২টি ‘বেরু’তে ভাগ করেছিলেন।
বর্তমানের হিসাবে একেকটি ‘বেরু’ মানে দুই ঘণ্টা। কেবল ব্যাবিলনীয়রাই নয়, প্রাচীন চীন ও জাপানেও এ ধরনের পদ্ধতির ব্যবহার দেখা যেত।
গণনার ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্ম নির্ভুলতার প্রয়োজনে ব্যাবিলনীয়রা এ দুই ঘণ্টার একেকটি ‘বেরু’কে ৩০টি প্রাচীন মিনিটে ভাগ করতে শুরু করে, যেগুলোকে বলা হয় ‘উশ’।
বর্তমান সময়ের হিসেবে একেকটি ‘উশ’ ৪ মিনিটের সমান। এ ‘উশ’কে আবার ৬০ ভাগে ভাগ করে তৈরি করা হয়েছিল আরও ক্ষুদ্র একক, যার নাম ‘নিন্ডা’। এর একেকটি ছিল বর্তমানের ৪ সেকেন্ডের সমান।
গবেষক মেজারোস বলেছেন, এসব উপবিভাগ সম্ভবত ব্যবহৃত হয়েছিল কারণ ‘৬০ ভিত্তিক পদ্ধতিতে আমরা সবকিছুকে ৬০ এর গুচ্ছ হিসেবে ভাগ করি’।
তবে বিশেষজ্ঞ মনরো বলেছেন, ব্যাবিলনীয়রা বিষয়টিকে ‘সময়ের উপবিভাগ’ হিসেবে ভাবতেন না। তারা আকাশের দূরত্ব বা গ্রহের গতি মাপার জন্য ‘সংখ্যার উপবিভাগ’ হিসেবে এমনটি ব্যবহার করতেন।
গাউচি বলেছেন, প্রাচীনকালে সময়ের এসব বিবর্তনের মধ্যে কে কার ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।
“খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দ থেকে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া যখন বিজ্ঞানের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয় তখন সেটি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও তাদের ধ্যানধারণার এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। একেই আমরা বলি ‘হেলেনিস্টিক’ বিশ্ব।”
মেজারোস বলেছেন, বিষয়টি স্পষ্ট যে, প্রাচীন গ্রীকরা ব্যাবিলনীয়দের এ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সময় পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছিলেন।
“তারা একই বিভাজন পদ্ধতি ধরে রেখেছিল যাতে তারা পুরানো তথ্যের সঙ্গে নতুন বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সহজেই যোগ করতে পারেন।
এ পদ্ধতিটি ব্যাবিলনীয়দের জন্য এতই কার্যকর ছিল যে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ জ্যোতির্বিদ্যার তথ্য ও বিভিন্ন ঐতিহ্য পাওয়ার জন্য পুরো সিস্টেমটিই হুবহু গ্রহণ করেছিলেন।”

সেকেন্ডের গণনা
গ্রীকদের আদালতে ‘বালিঘড়ি’র প্রচলন ছিল যাতে ‘সবাই কথা বলার জন্য সমান সময় পান’।
তবে বিশেষজ্ঞ গাউচি বলেছেন, গ্রীকরা ব্যাবিলনীয়দের যে সময় পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছিলেন তা জ্যোতিষীরাই ব্যবহার করতেন, সাধারণ মানুষের ‘দৈনন্দিন জীবনে এর তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না’।
সেই ‘হেলেনিস্টিক’ যুগের সংমিশ্রণ থেকে ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডের যে ধারণাগুলো বেরিয়ে এসেছিল তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আজকের দিনে এসে পৌঁছেছে।
তবে কেবল কয়েকশ বছর আগে সময় মাপার বিভিন্ন যন্ত্র বা ঘড়ি যথেষ্ট নির্ভুল হয়ে ওঠে। যার ফলে দৈনন্দিন জীবনে মিনিট ও সেকেন্ডের ব্যবহার শুরু হয়।
বর্তমানে বিজ্ঞানভিত্তিক অসংখ্য সংজ্ঞায় ‘সেকেন্ড’ এককটি ব্যবহৃত হয়। মানুষ যখন সেকেন্ডের চেয়েও ক্ষুদ্র সময়ের একক গুনতে শুরু করেন তখন বিজ্ঞানীরা ‘মেট্রিক পদ্ধতি’ বা দশ ভিত্তিক গ্রহণ করেন।
এর ফলে মানুষ এখন মিলিসেকেন্ড ও মাইক্রোসেকেন্ড বা সেকেন্ডের এক হাজার ভাগের এক ভাগ ও দশ লাখ ভাগের এক ভাগও ব্যবহার করেন।
বিংশ শতাব্দীতে ‘অ্যাটোমিক ক্লক’ বা পারমাণবিক ঘড়ি বিজ্ঞানীদের সেকেন্ডের সংজ্ঞাকে আরও নিখুঁতভাবে নির্ধারণের সুযোগ করে দিয়েছে।
আগে সূর্যের আহ্নিক গতির ওপর ভিত্তি করে সেকেন্ডের হিসাব করা হলেও এখন তা ‘সিজিয়াম ১৩৩’ পরমাণুর মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ শোষণ ও নির্গমনের সুনির্দিষ্ট মানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পারমাণবিক ঘড়ির নেটওয়ার্কই ইন্টারনেটের গতি থেকে শুরু করে জিপিএস ও অতিনির্ভুল এমআরআই ইমেজিং সবকিছুর পেছনে কাজ করছে।
সময় গণনার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়টি আসলে মানুষেরই তৈরি এক কাঠামো, যা মানুষের নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ড এসবকিছুই মানুষের কাছে এসেছে অনেকগুলো পছন্দ, কাকতালীয় ঘটনা ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে।
এগুলো মানুষের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এ পদ্ধতিটি আমাদের অভ্যাসে এত গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, এখন এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করাটা সম্ভবত সহ্য করার মতো হবে না।
১৮শ শতাব্দীতে ফ্রান্স যখন সময়ের ‘ডেসিমেল’ পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করেছিল বাস্তবে সেই নতুন পদ্ধতিটি খুব কমই ব্যবহৃত হয়েছিল। অথচ একই সময়ে দূরত্ব পরিমাপ ও মুদ্রা ব্যবস্থাকে ডেসিমেল করার ক্ষেত্রে তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফ্রান্সে ডেসিমেল সময় পদ্ধতি কেবল ১৭ মাস স্থায়ী হয়েছিল। তবে তাদের নতুন ক্যালেন্ডারটি প্রায় এক দশক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
বারিজ বলেছেন, “পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল ঠিকই তবে তা সফল হয়নি। মানুষ এ পরিবর্তন গ্রহণ করেননি।”
১৭৯৫ সালে ফরাসি ন্যাশনাল কনভেনশনের সদস্য ক্লদ-অ্যান্তোইন প্রিয়ুর-এর এক ভাষণ সম্ভবত ডেসিমেল সময় পদ্ধতির কফিনে শেষ পেরেকটি মেরেছিল।
তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এ পদ্ধতিটি কাউকে বাড়তি কোনো সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং অন্যান্য নতুন মেট্রিক পরিমাপ পদ্ধতিগুলো যেমন মিটার বা কেজির উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে নষ্ট করছে। কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।