Published : 29 Jan 2026, 10:43 AM
মানবজাতি কি নিজের তৈরি প্রযুক্তির হাতেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? সম্প্রতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে পরমাণু বিজ্ঞানীদের দেওয়া সতর্কবার্তা।
মঙ্গলবার ‘বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ তাদের প্রতীকী ‘ডুমসডে ক্লক’ বা ‘কেয়ামতের ঘড়ি’র কাঁটাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভীতিপ্রদ অবস্থানে বা মধ্যরাতের সবচেয়ে কাছে এগিয়ে এনেছে, যা মহাপ্রলয়ের থেকে এখন কেবল ৮৫ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে।
রয়টার্স লিখেছে, বিশ্বজুড়ে এ মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণকে দায়ী করেছেন বিজ্ঞানীরা। যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পারমাণবিক শক্তিধর বিভিন্ন দেশের আগ্রাসী মনোভাব, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির শিথিলতা, ইউক্রেইন ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ঝুঁকি।
গেল বছরের তুলনায় এবার ঘড়ির কাঁটা ৪ সেকেন্ড এগিয়ে এনেছেন ‘বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’-এর বিজ্ঞানীরা।
১৯৪৫ সালে ‘বুলেটিন অফ দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ প্রতিষ্ঠা করেন জার্মান বংশোদ্ভূত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জে. রবার্ট ওপেনহাইমারসহ একদল বিজ্ঞানী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এ ‘লস অ্যালামোস ল্যাবরেটরি’র পরিচালক ওপেনহাইমারকে ‘পারমাণবিক বোমার’ জনকও বলা হয়।
১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির সময় থেকে প্রতি বছর ঘড়িটির সময় নির্ধারণ করে আসছে শিকাগোভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি। নিজেদের তৈরি করা প্রযুক্তিতে মানবজাতি বিশ্বকে ধ্বংসের কতটা কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে– সাধারণ মানুষকে সেই সতর্কবার্তা দেওয়াই ছিল এ ঘড়ি তৈরির মূল উদ্দেশ্য।
সামরিক ব্যবস্থায় এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, জৈবিক অস্ত্র তৈরির কাজে অপব্যবহার হওয়ার এবং বিশ্বজুড়ে ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে এআই। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের অব্যাহত হুমকিকেও বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
পরমাণু নীতি বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যালিক্সান্দ্রা বেল বলেছেন, “ডুমসডে ক্লক স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক বিভিন্ন ঝুঁকি নির্দেশ করেছে, যেখানে বর্তমানে বিশ্ব নেতৃত্বের এক চরম ব্যর্থতাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
“সরকার যে দেশেরই হোক না কেন তা নব্য-সাম্রাজ্যবাদ ও শাসনব্যবস্থায় স্বৈরাচারী এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকে পড়া বিশ্বকে কেবল ধ্বংসের বা মধ্যরাতের দিকেই ঠেলে দেবে।”
গত চার বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ঘড়ির কাঁটাকে মধ্যরাতের আরও কাছে এগিয়ে নিয়ে গেলেন বিজ্ঞানীরা।
বেল বলেছেন, “পারমাণবিক ঝুঁকির বিচারে ২০২৫ সালের কোনো কিছুই ইতিবাচক পথে এগোয়নি। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কূটনৈতিক কাঠামো বা চুক্তি এখন চরম চাপের মুখে। কোনো কোনোটি ভেঙেও পড়ছে। পারমাণবিক পরীক্ষার আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
“এ ছাড়া, পরমাণু অস্ত্রের ছায়া ও সংঘাত বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকির মধ্যেই বিশ্বে তিনটি সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের এই ঝুঁকি এখন এতটাই বেশি যে, তা মেনে নেওয়া যায় না ও দীর্ঘস্থায়ীও হতে দেওয়া অসম্ভব।”
ইউক্রেইনে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধ, ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাতের কথা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন বেল। একইসঙ্গে এশিয়ায় চলা উত্তেজনা, যেমন কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতি ও তাইওয়ানের প্রতি চীনের হুমকির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
গেল বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে পশ্চিম গোলার্ধে বাড়তে থাকা উত্তেজনার কথাও বলেছেন বেল।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে টিকে থাকা সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাব করেছিলেন, উভয় দেশ যেন আরও এক বছরের জন্য এ চুক্তির বিভিন্ন শর্ত মেনে চলে।
এ চুক্তির আওতায়, কোনো দেশই ১ হাজার ৫৫০টির বেশি কার্যকর পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমা মোতায়েন করতে পারবে না। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও এ প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাড়া দেননি। পুতিনের এই প্রস্তাব গ্রহণ করা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে তা নিয়ে পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
গত অক্টোবরে মার্কিন সেনাবাহিনীকে আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যা দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল।
২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সর্বশেষ পরীক্ষা বাদে গত ২৫ বছরের বেশি সময়ে পৃথিবীর আর কোনো পারমাণবিক শক্তিধর দেশ কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়নি।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, দমন ও স্থিতিশীলতা ব্যুরোর উচ্চপদস্থ কর্মী বেলের ধারণা, এ ধরনের পারমাণবিক পরীক্ষা যদি পুরোদমে আবার শুরু হয় তবে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় চীনই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, বর্তমানে ক্রমাগতভাবে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে চীন।