Published : 26 Apr 2026, 10:27 AM
ফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের নীল আলো ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু নয়, বরং দিনের আলো কম পাওয়া ও রাতের অভ্যাসই বেশি প্রভাব ফেলে বলে উঠে এসেছে এক গবেষণায়।
এক দশকের বেশি সময় ধরে ফোনের পর্দা, টিভি, কম্পিউটার ও এলইডি বাতির নীল আলো ঘুম নষ্ট করছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোনের আলো ঘুমে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সেটিই মূল কারণ নয়।
এ নিয়ে ২০১৪ সালের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছে বিবিসি। সেখানে ১২ জন অংশগ্রহণকারীর অর্ধেক সংখ্যক ঘুমানোর আগে আইপ্যাডে পড়েন, বাকিরা কাগজের বই পড়েন। গবেষণায় দেখা গেছে, আইপ্যাড ব্যবহারকারীরা ঘুমাতে বেশি সময় নিয়েছেন, পরদিন বেশি ঝিমুনি অনুভব করেছেন এবং তাদের শরীরে মেলাটোনিন কম তৈরি হয়েছে।
তখন গবেষকরা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, আইপ্যাডের এলইডি পর্দা থেকে আসা নীলাভ আলোই এর কারণ। কারণ, নীল আলো শরীরের দৈনন্দিন চক্রে প্রভাব ফেলে, আর এই চক্রই মানুষের কখন ঘুম পাবে তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জেমি জেইৎজার বলেন, “এটি ছিল ভীষণ বিভ্রান্তিকর এক গবেষণা।”
তার ভাষ্যে, গবেষণাটির বিজ্ঞানভিত্তি দুর্বল ছিল না, কিন্তু তা মানুষকে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়।
জেইৎজার বলেন, “মেলানোপসিন এমন একটি প্রোটিন, যা নীল আলোর প্রতি বেশি সংবেদনশীল।”
তিনি বলেন, মানুষের চোখে থাকা মেলানোপসিন নামের আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন নীল আলোতে বেশি সাড়া দেয়। অন্য আলোর রঙেও এটি প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে, নীল আলোর প্রভাব কেবল কিছুটা বেশি।
“আমাদের স্ক্রিন থেকে যে পরিমাণ আলো বের হয়, তা আসলে খুবই সামান্য।”
তার ব্যাখ্যায়, পরীক্ষাগারে মানুষকে সারাদিন খুব কম আলোতে রেখে পরে হঠাৎ উজ্জ্বল আলো দেখানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে নীল আলো বেশি প্রভাব ফেলে, কিন্তু এটি দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র নয়।
সাম্প্রতিক ১১টি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্ক্রিনের আলো সবচেয়ে খারাপ অবস্থাতেও ঘুম বিলম্বিত করে গড়ে মাত্র নয় মিনিট।
আরেকটি গবেষণার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ফোন, ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট থেকে ২৪ ঘণ্টায় যে পরিমাণ নীল আলো পাওয়া যায়, তা বাইরে সূর্যালোকে এক মিনিট থাকার চেয়েও কম। এ বিষয়ে ২০২৩ সালে লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পরিচালিত গবেষণার নাম ছিল “ব্লু লাইট অফ দ্য ডিজিটাল এরা: এ কম্পারেটিভ স্টাডি অফ ডিভাইসেস”। এই গবেষণার ফলও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমের জন্য আসল বিষয় হলো সারাদিন মোট কতটা আলো পাওয়া যাচ্ছে। ভালো ঘুমের জন্য সকালে বেশি আলো এবং রাতে কম আলো দরকার। নীল আলোর ভূমিকা থাকলেও দিনের মোট আলোক-সংস্পর্শই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ঘুম ও ক্রোনোবায়োলজি গবেষণা দলের পরিচালক হোভার্ড ক্যালেস্টাড বলেন, “আপনার এমন চশমা পরা উচিত, যাতে খুব বেশি নীল আলো দেখা না যায়।”
তার মতে, নীল আলো ঠেকাতে কার্যকর চশমা থাকলেও সেটি অধিকাংশ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।
ক্যালেস্টাড বলেন, “সম্ভব হলে বাইরে যান, না হলে আলো দেওয়ার বাতি ব্যবহার করুন।”
তিনি বলেন, সকালে অন্তত ৩০ মিনিট বাইরে হাঁটা ঘুমের জন্য কার্যকর হতে পারে।
জেইৎজার বলেন, “দিনের বেলা যত বেশি আলো পাবেন, সন্ধ্যার আলো তত কম প্রভাব ফেলবে।”
তার মতে, দিনের আলো শরীরের ঘড়িকে স্থিতিশীল রাখে এবং রাতে আলোতে সংবেদনশীলতা কমায়।
ঘরে বসে কাজ করলে দিনের বেলা উজ্জ্বল আলো ব্যবহার এবং সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে আলো কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
জেইৎজার বলেন, “আলোর সংস্পর্শে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পার্থক্য।”
তার মতে, দিন ও রাতের আলোর পার্থক্যই শরীরকে সময় বুঝতে সাহায্য করে।
স্ক্রিনের নীল আলোর চেয়ে ফোন বা ল্যাপটপে ঘুমের আগে কী দেখা হচ্ছে, সেটিও বড় বিষয় বলে মনে করেন জেইৎজার।
তিনি বলেন, “এই যন্ত্রগুলো থেকে আলো নয়, বরং এগুলোর বিষয়বস্তুই মানুষকে বেশি জাগিয়ে রাখে।”
তার মতে, আলো নয়, বরং ঘুমের আগে দেখা বিষয়বস্তুই অনেক সময় মানুষকে জাগিয়ে রাখে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীল আলো ঠেকাতে চশমা, মোমবাতির আলো ও অন্ধকার ঘর ব্যবহার করে করা ব্যক্তিগত পরীক্ষায় ঘুমের মোট সময় খুব বেশি বদলায়নি। তবে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময় কিছুটা নিয়মিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের আগে নির্দিষ্ট রুটিনও ঘুমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পর্দার আলো কমে যাওয়া বা বিশেষ চশমা পরা অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের প্রস্তুতির মানসিক সংকেত হিসেবেও কাজ করতে পারে।