Published : 10 Aug 2025, 07:10 PM
ফিলিস্তিনিদের মোবাইল ফোন কলের অনেক রেকর্ড জমা রাখতে মাইক্রোসফটের অ্যাজিউর ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী– এমন তথ্য প্রকাশের পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্টটি।
ইসরায়েলে থাকা কোম্পানিটির কর্মীরা সংবেদনশীল বিভিন্ন সামরিক প্রকল্পতে নিজেদের কাজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করতে পারে এমন উদ্বেগের মধ্যে দেশটির সামরিক নজরদারি সংস্থা ‘ইউনিট ৮২০০’ কীভাবে তাদের অ্যাজিউর ক্লাউড স্টোরেজ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে তা নিয়ে তদন্ত করছে মাইক্রোসফট।
‘ইউনিট ৮২০০’ কোম্পানিটির অ্যাজিউর ক্লাউডে কী ধরনের তথ্য রাখছে তা তদন্ত করছেন মাইক্রোসফটের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। গার্ডিয়ানের এক তদন্তে উঠে এসেছে, ফিলিস্তিনিদের মোবাইল ফোনের কলের অনেক রেকর্ড ওই ক্লাউডে জমা রাখছে গোয়েন্দা সংস্থাটি।
এ নিয়ে উদ্বিগ্ন মাইক্রোসফট। কারণ কোম্পানিটি জানে না ঠিক কী তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং সেটি কতটা গোপনীয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকাটি।
ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি পত্রিকা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’ ও হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘লোকাল কল’-এর সঙ্গে যৌথ তদন্তে উঠে এসেছে, অ্যাজিউরের এক বিশেষ ও আলাদা জায়গা ব্যবহার করে গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ ফোন কলের রেকর্ড সংরক্ষণ করছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাটি।
এ তদন্তের অংশ হিসেবে সাক্ষাৎকার নেওয়া ‘ইউনিট ৮২০০’-এর সূত্র বলেছে, ক্লাউডে রাখা এই বিশাল ফোন কলের তথ্য থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে গাজায় বোমা হামলার লক্ষ্য খোঁজা ও শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহার করেছে তারা।
এ পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত বিভিন্ন সূত্র বলেছে, বুধবার প্রকাশিত ওই যৌথ তদন্তটি মাইক্রোসফটের নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যেখানে তারা মনে করছেন, ‘ইউনিট ৮২০০’ কীভাবে অ্যাজিউর ব্যবহার করছে তা হয়ত ঠিকঠাক জানাচ্ছেন না কোম্পানিটির কিছু ইসরায়েলি কর্মী।
সূত্রগুলোর মতে, এখন মাইক্রোসফট এমন এক অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ চালাচ্ছে যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের ডেটা সেন্টারে কী ধরনের তথ্য রাখা আছে এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় যুদ্ধে সেই তথ্য কিভাবে ব্যবহার করছে তা পুনরায় যাচাই করা যায়।
মে মাসে মাইক্রোসফট বলেছিল, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে করা পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত ‘কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি’ যে অ্যাজিউর গাজায় ‘মানুষকে লক্ষ্য করে বা ক্ষতি করার জন্য’ ব্যবহার করেছে ইসরায়েল। এ পর্যালোচনার বিভিন্ন ফলাফল আংশিকভাবে কোম্পানির ইসরায়েলভিত্তিক কর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে গার্ডিয়ান।
তবে সম্প্রতি ইসরায়েলে যারা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক দেখভাল করছেন তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কোম্পানির মার্কিন সদর দপ্তরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
অভ্যন্তরীণ ওই আলোচনার সঙ্গে জড়িত পরিচিত এক সূত্র বলেছে, কর্মকর্তারা ইসরায়েলের কর্মীদের দেওয়া কিছু তথ্য যাচাই করতে পারেননি এবং সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, হয়ত ওই কর্মীরা তাদের নিয়োগকর্তার চেয়ে নিজেদের দেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি বেশি দায়বদ্ধ ছিল।
এদিকে, মাইক্রোসফটের ফাঁস হওয়া কিছু নথি ব্যবহার করে গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, ইউনিট ৮২০০-র সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন কর্মী আগে অনলাইনে প্রকাশ করেছেন যে, তারা এই বিশেষ গোয়েন্দা ইউনিটে চাকরি করেছেন বা রিজার্ভ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। এ ইউনিটটির কাজের ক্ষেত্র যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি বা এনএসএ’র সমান।
কর্মকর্তাদের উদ্বেগ থাকার পরও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের কাজের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা শুরু করেনি মাইক্রোসফট। গাজা অভিযানে মাইক্রোসফটের প্রযুক্তির ওপর ইসরায়েলের নির্ভরশীলতা সম্পর্কে গার্ডিয়ানসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন সফটওয়্যার জায়ান্টটি।
মাইক্রোসফটের একজন মুখপাত্র বলেছেন, কোম্পানি “এসব অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে, যা আমাদের আগের স্বাধীন বিভিন্ন তদন্তেই প্রমাণিত হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, যে কোনো নতুন তথ্য যাচাই করে দেখা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ পাওয়া ফাঁস হওয়া মাইক্রোসফটের বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে, কোম্পানিটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও জানতেন যে, ২০২১ সালে কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরুর সময় অ্যাজিউর ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে বড় পরিমাণ সংবেদনশীল ও গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা করছে ইউনিট ৮২০০। ওই সময় নিজেদের ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা যোগের কাজ করছিল মাইক্রোসফট।
তবে কোম্পানিটি জোর দিয়ে বলেছে, তাদের কর্মকর্তারা জানতেন না ‘ইউনিট ৮২০০’ ফিলিস্তিনিদের ফোন কলের বিষয়বস্তু অ্যাজিউরে সংরক্ষণ করছে।
এ সপ্তাহের শুরুতে মাইক্রোসফটের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের কাছে গ্রাহকের ক্লাউড পরিবেশে সংরক্ষিত কোনো তথ্য নেই।”
মাইক্রোসফটের এ তদন্তের খবর প্রকাশের পর এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ বলেছে, “আমাদের সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় মাইক্রোসফটের সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তবে আমরা নিশ্চিত করছি, আইডিএফের সঙ্গে ডেটা সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াকরণের কাজ করছে না মাইক্রোসফট এবং আগেও এ ধরনের কাজ কখনও করেনি।”