Published : 26 Nov 2025, 10:33 AM
ফেইসবুকের ব্যবহার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে তা নিয়ে নিজস্ব এক গবেষণা চালিয়েছিল মেটা। গবেষণায় যারা ফেইসবুকের ব্যবহার বন্ধ করেছেন তারা বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও একাকীত্ব কম অনুভব করেছেন– এমন তথ্য উঠে আসার পর সেই গবেষণা স্থগিত করেছিল মেটা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট আদালতে বড় বড় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দেশটির একাধিক স্কুল। সেই মামলার নথিতে মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণা বন্ধের এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
মামলায় অভিযোগ উঠেছে, প্ল্যাটফর্মে স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি জানত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিটি। তবে ব্যবহারকারীদের কাছে তা প্রকাশ করেনি। সচেতনভাবে ব্যবহারকারীদের থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য লুকিয়েছে তারা।
২০২০ সালে ‘প্রজেক্ট মার্কারি’ নামে এক গবেষণা শুরু করেছিল মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটি। গবেষণায় সার্ভে বা জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘নিলসেন’-এর সঙ্গে মিলে মেটার বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখেছেন, ফেইসবুক ‘ডিঅ্যাক্টিভেট’ করলে তা ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে।
মামলার অভিযোগ অনুসারে, গবেষণায় যখন উঠে আসে, ফেইসবুকের ব্যবহার বন্ধে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে তখন ওই প্রজেক্টটি বন্ধ করে দেয় মেটা। গবেষণার ফলাফল প্রকাশ না করে কোম্পানিটি বলেছিল, ‘কোম্পানির আশপাশে প্রচলিত মিডিয়া বর্ণনার কারণে তা গবেষণার ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে’।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, আদালতের নথিতেও দেখা গেছে, মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষকরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। একজন গবেষক লিখেছেন, “নিলসেনের গবেষণায় উঠে এসেছে, ফেইসবুক ব্যবহার সামাজিক তুলনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে”। আরেকজন গবেষক এ গবেষণার ফলাফলকে তুলনা করেছেন তামাক শিল্পের সঙ্গে, যেখানে “বিভিন্ন তামাক কোম্পানি জানে যে সিগারেট ক্ষতিকর, তারপরও সেই তথ্য তারা নিজেদের কাছে লুকিয়ে রাখে”।
রয়টার্স লিখেছে, মেটা বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ১৯৮০-এর দশকে ডাচ-ব্রিটিশ তেল কোম্পানি ‘শেল’ ও আমেরিকান তেল কোম্পানি ‘এক্সন’ নামের বড় দুই তেল ও গ্যাস কোম্পানির এক অভ্যন্তরীণ গবেষণাতেও উঠে এসেছিল, কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির কারণে জলবায়ু বিপর্যয় ঘটবে। এরপরও তারা সেই গবেষণার তথ্য লুকিয়েছিল। মেটাও ঠিক একইভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহারকারীদের থেকে লুকিয়েছে।
এক বিবৃতিতে মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের সম্পূর্ণ তথ্য দেখলে বোঝা যাবে, আমরা এক দশকের বেশি সময় ধরে অভিভাবকদের কথা শুনে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা করে টিনএজারদের সুরক্ষায় বাস্তব পরিবর্তন এনেছি।”
বিবৃতিতে কোম্পানির ইনস্টাগ্রাম ‘টিন অ্যাকাউন্টস’-এর কথা তুলে ধরা ওই মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা এসব অভিযোগের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ এগুলো বাছাই করা উদ্ধৃতি ও ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।”
মেটা দাবি করেছে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি বিভিন্ন নথি এখনও প্রকাশ হয়নি এবং এগুলো বাতিল করা উচিত। কারণ অভিযোগকারীরা কেন এসব তথ্য প্রকাশ করতে চাচ্ছেন তাদের সেই দাবিও খুব স্পষ্ট।
এসব মামলা দায়ের করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত ডিস্ট্রিক্ট স্কুল, যেটি এখন পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট অফ ক্যালিফোর্নিয়া আদালত এবং শুনানির জন্য ২৬ জানুয়ারি দিন ধার্য হয়েছে।
তবে মেটার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা লুকিয়ে রাখার অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে, ২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে ৪১টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়া বড় একটি মামলা দায়ের করেছিল, যেখানে অভিযোগ ছিল, কোম্পানির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম টিনএজ ব্যবহারকারীদের ক্ষতির পাশাপাশি তাদের সামাজিক মাধ্যমে আসক্ত করে তুলছে।
সেই মামলার রায়ে একজন বিচারক বলেছিলেন, অভ্যন্তরীণ গবেষণাকে ব্লকের চেষ্টা করেছে মেটার আইনজীবীরা। সেই গবেষণাতেও উঠে এসেছিল, মেটার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।