Published : 26 Apr 2026, 05:53 PM
জাতিগত বিষয় নিয়ে ইলন মাস্কের বিতর্কিত মন্তব্য ও উস্কানিমূলক পোস্ট আগের তুলনায় কয়েকগুণ হয়েছে। টেসলা ও স্পেসএক্সের বিপুল ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যেও মাস্কের এসব ব্যক্তিগত বিশ্বাস ভক্তদের মধ্যে বিভক্তি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নীতিগত প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুসারে, মাস্ক গত ছয় মাসে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ জাতিগত ইস্যু ও ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’র মতো দাবি নিয়ে আগের চেয়ে বেশি পোস্ট করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, গেল ১৮২ দিনে বর্ণবাদ নিয়ে প্রায় সাড়ে আটশ পোস্ট করেছেন টেসলা, স্পেসএক্স ও এক্সের এই প্রধান নির্বাহী।
পোস্টের তথ্য বলছে, সাড়ে আটশ পোস্টের মধ্যে ৬ শতাংশ পোস্ট ছিল জাতিগত বিষয় নিয়ে এবং সেসব পোস্টের অর্ধেক জুড়েই ছিল ‘শ্বেতাঙ্গ’ শব্দটি।
২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বিষয়ক কিছু ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া মাস্ক মন্তব্য করেছিলেন, “তারা প্রকাশ্যে শ্বেতাঙ্গ গণহত্যার ওকালতি করছে।”
এরপর ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের এক প্রতিবাদ সমাবেশের ভিডিওর শেয়ার করে মাস্ক লিখেছিলেন, “তারা শ্বেতাঙ্গ গণহত্যার ডাক দিচ্ছে।”
বিশ্বের শীর্ষ ধনী এ ব্যক্তি একইসঙ্গে শ্বেতাঙ্গদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন ডানপন্থী অ্যাকাউন্টের পোস্ট নিয়মিত ‘রিপোস্ট’ করছেন। মাস্ক যে এবারই প্রথম জাতিগত বিষয় নিয়ে পোস্ট করছেন এমন নয়।
এর আগেও জাতীয়তাবাদ ও জন্মহার সংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রচার করতে নিজের এক্স প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছেন মাস্ক। তবে গত ছয় মাসে এ বিষয়ে তার পোস্ট করার হার আগের দুই বছরের তুলনায় তিন গুণ হয়েছে।
গত অক্টোবর থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি গড়ে প্রায় প্রতিদিন একবার করে জাতিগত ইস্যু নিয়ে পোস্ট করেছেন।
গেল বছরের সেপ্টেম্বরে এক্সে এমন এক পোস্টের সঙ্গে মাস্ক একমত পোষণ করেছিলেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল, শ্বেতাঙ্গদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে; হয় তাদের ‘বর্ণবাদী’ গালি শুনেই ‘বিজয়ী হওয়া, ক্রীতদাস হওয়া, ধর্ষিত হওয়া ও গণহত্যার শিকার হওয়া’ মেনে নিতে হবে নতুবা ‘বর্ণবাদী’ তকমা মাথায় নিয়েই ‘নিজেদের দেশ ও মর্যাদা’ পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
এসব উস্কানিমূলক মন্তব্যের উত্তরে মাস্ক লিখেছিলেন, ‘হ্যাঁ’। তার এসব পোস্ট অনেক সমর্থন পেলেও তারই কিছু অনুসারী এতে চরম বিরক্ত ও হতাশ হয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আগে এ ধরনের পোস্ট করলে অ্যাকাউন্ট ব্যান করা হত, আর এখন এ প্ল্যাটফর্মের মালিক নিজেই ‘শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী’ কনটেন্ট শেয়ার করছেন।”
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের আগে মঞ্চে মাস্কের দেওয়া একটি স্যালুট বা অভিবাদন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কেউ কেউ এটিকে ‘ফ্যাসিবাদী’ স্যালুট হিসেবে বর্ণনা করলেও মাস্ক তা বারবার অস্বীকার করেছেন।
সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে একজন অনুসারী তার সেপ্টেম্বরের পোস্টে মন্তব্য করেছেন, “ওহ, তাহলে ওটা শেষ পর্যন্ত হিটলারি স্যালুটই ছিল।”
বর্তমানে মাস্কের দেওয়া এসব পোস্ট অনেক কট্টর সমর্থককেও তার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এত বিতর্কেও মাস্ক পিছিয়ে আসেননি। গত ২০ এপ্রিলও তিনি অস্ট্রেলিয়ার জন্মহার সংক্রান্ত একটি পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, “অস্ট্রেলীয়রা এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছে।”
‘গ্লোবাল প্রজেক্ট অ্যাগেইনস্ট হেইট অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হেইডি বেইরিচ বলেছেন, মাস্ক এমন কিছু তত্ত্ব প্রচার করছেন যেগুলো ‘শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের’ মূল বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত। যার মধ্যে রয়েছে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ চলছে এমন বিশ্বাস, কর্মক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গদের নিয়োগ না দিয়ে বৈষম্য করা হচ্ছে এমন দাবি এবং শ্বেতাঙ্গরা দিন দিন সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে এমন ধারণা।
বাজার গবেষণা সংগঠন ‘ফিউচারাম’ এর প্রধান কৌশলবিদ শে বোলোর বলেছেন, “আমার ধারণা, মাস্কের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য সবসময়ই এক ধরনের খেসারত দিতে হয়। এখন সেই খেসারতের মাত্রা আরও বাড়ছে।”
তবে বোলোর বলেছেন, স্পেসএক্স ও টেসলার মতো সফল বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগের আর্থিক লাভ এতটাই বেশি যে, মানুষ পুরোপুরি এ ধনকুবেরের বিরুদ্ধে যেতেও পারছে না।
এ বিষয়ে ইন্ডিপেনডেন্টের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি টেসলা, স্পেসএক্স ও এক্স কর্তৃপক্ষ।
গত নভেম্বরে টেসলার বিনিয়োগকারীরা মাস্কের জন্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের বেতন প্যাকেজ অনুমোদন করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি, এ বেতন অফার ছিল রাজনীতি থেকে সরিয়ে মাস্কের মনোযোগ আবারও তার বিভিন্ন কোম্পানির দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
তবে নতুন এসব তথ্য বলছে, তিনি এখনও তার জাতিগত বিশ্বাসগুলো নিয়ে প্রচার চালানোতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
এ বছরের শেষদিকে আইপিও ছাড়ার পরিকল্পনা করছে স্পেসএক্স, যা সফল হলে মাস্ক হতে পারেন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার ব্যক্তি। তবে সমালোচকরা এর তীব্র বিরোধিতা করছেন।
টেসলার সাবেক বিনিয়োগকারী ফ্রেড ল্যাম্বার্টের মতো অনেকেই মনে করেন মাস্কের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা মানে ‘নৈতিকতার চেয়ে অর্থকে বড় করে দেখা’।
তিনি বলেছেন, “পুরো বিষয়টি আমাকে বিভ্রান্ত করেছে… শ্বেতাঙ্গদের ‘নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধার’ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোর পর মাস্ক যে একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”