Published : 19 Aug 2025, 02:56 PM
কোটি কোটি আইফোন তৈরি করে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি নির্মাতা জায়ান্টে পরিণত হয়েছে ফক্সকন। তবে, কোম্পানিটি এখন বলত পারে তাদের মূল ব্যবসা আর কেবল অ্যাপলনির্ভর নয়।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিকাশের সুযোগ নিয়ে আয় ও ব্যবসার ধরন বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাইওয়ানের এই উৎপাদন জায়ান্ট।
তাইওয়ানের এই কোম্পানিটি মূলত আইফোন বানিয়েই সবচেয়ে বেশি অর্থ আয় করেছে। এখন তারা নজর দিয়েছে এআই সার্ভার, ক্লাউড ও নেটওয়ার্কিং পণ্য বিশেষ করে মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার জন্য পণ্য বানানোয়।
২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এসে ফক্সকনের শীর্ষ ক্লায়েন্টের অবস্থান হারাল অ্যাপল।
এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, গত কয়েক বছরে নিজেদের ব্যবসার ধরন ধীরে ধীরে বদলেছে ফক্সকন। আগে যেখানে ভোক্তা পণ্যে বিশেষ করে মোবাইল ফোন তৈরিতে গুরুত্ব দিত কোম্পানিটি এখন সেখানে তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে এআই ও ক্লাউড প্রযুক্তি।
তাইওয়ানের কেবল একটি কোম্পানি নয়, বরং দেশটির পুরো প্রযুক্তি শিল্পেই এ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক দিন ধরেই স্মার্টফোন ব্যবসার ওপর খুব বেশি নির্ভর করে এসেছে ফক্সকন, যেটিকে বড় এক ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। প্রায় ২০ বছর আগে আইফোন বাজারে আসার পর থেকে বর্তমানে ধীরে ধীরে এর চাহিদা কমে যাচ্ছে। ফলে, আইফোনের বিক্রি কমে যাওয়ায় সমস্যার মুখে পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইফোন উৎপাদক কোম্পানিটি।
এ ঝুঁকি থেকে রেহাই পেতে ফক্সকন-এর চেয়ারম্যান ইয়াং লিউ ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কোম্পানিটি নতুন বিভিন্ন ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে কাজ করছেন, যেখানে এআই সার্ভার, ইলেকট্রিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে জোর দিচ্ছে তারা।
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি ও চিপ ব্যবসায় ফক্সকন এখনও তেমন বড় আয় করতে না পারলেও এআই সার্ভার তৈরিতে তাদের সাফল্য এখন স্পষ্ট। বর্তমানে এনভিডিয়ার সবচেয়ে বড় সার্ভার নির্মাতা হয়ে উঠেছে কোম্পানিটি। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাদের আগেভাগে নেওয়া সিদ্ধান্ত, যা তারা নিয়েছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি আলোচনায় আসার আগেই।

কেবল কয়েক বছরের ব্যবধানে ফক্সকনের ব্যবসার চিত্র অনেকটা বদলে গিয়েছে। এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট আয়ের ৩৫ শতাংশ এসেছে ভোক্তা ইলেকট্রনিক পণ্য বা আইফোন থেকে, আর ৪১ শতাংশ এসেছে ক্লাউড ও নেটওয়ার্কিং ব্যবসা থেকে, যার মধ্যে রয়েছে এআই সার্ভারও। অথচ ২০২১ সালে কোম্পানিটির আয়ের ৫৪ শতাংশই আসত ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্য থেকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক বছর আগে ফক্সকন বুঝে-শুনে যে বিনিয়োগ করেছিল, তা এখন ফল দিতে শুরু করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এআই চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়া ও অন্যান্য বড় এআই কোম্পানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে তারা।
‘টিএফ ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিজ’-এর বিশ্লেষক মিং-চি কুও বলেছেন, “বহু বছর ধরেই এ খাতে কাজ করছে ফক্সকন। উচ্চমানের চাহিদা পূরণ করছে, বিভিন্ন সাইটে পণ্য অ্যাসেম্বলি ও কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছে তারা। পাশাপাশি নিজেদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে কোম্পানিটি। ”
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ২০০২ সাল থেকেই এনভিডিয়ার গ্রাফিক্স কার্ডের জন্য নমুনা ডিজাইন তৈরি করা শুরু করেছিল ফক্সকন। ২০০৯ সালের দিকেই ক্লাউড সেবাদাতা কোম্পানিগুলোর ডেটা সেন্টারের জন্য সাধারণ সার্ভার তৈরি করতে শুরু করেছে তারা। এনভিডিয়ার সঙ্গে এখন তাদের যে এআই সার্ভার ব্যবসা চলছে, তা অনেক দিক থেকে সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতারই চূড়ান্ত ফল।
ফক্সকন বলেছে, বর্তমানে সাধারণ সার্ভার ও এআই সার্ভার– দুই ক্ষেত্রেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীদের একটি তারা। এ দুই ধরনের সার্ভারেই তাদের বাজারে দখল রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
কুও বলেছেন, প্রায়ই অন্যান্য কোম্পানির চেয়ে অনেক আগেই কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে ফক্সকন। অ্যাপলের ক্ষেত্রেও আগেভাগে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেছিল তারা। এখন এনভিডিয়ার ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নিয়েছে কোম্পানিটি।
তিনি বলেছেন, “দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বে ফক্সকন নিজের উদ্যোগেই এগিয়ে আসতে বেশি রাজি। ”
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, বর্তমানে হিউস্টন ও টেক্সাসে কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ফক্সকন, যা এনভিডিয়ার ৫০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ এবং মেক্সিকোতেও এআই সার্ভার তৈরির জন্য কারখানা খোলার উদ্যোগ তাদের ব্যবসায়িক কৌশলকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ফক্সকনের অনুমান, তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের এআই সার্ভার থেকে আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭০ শতাংশেরও বেশি বাড়বে।
তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে রাজি হয়নি ফক্সকন ও এনভিডিয়া। এদিকে, মন্তব্যের অনুরোধে জবাব দেয়নি অ্যাপল।
পুরো শিল্পখাতজুড়ে পরিবর্তন
ফক্সকনে যে পরিবর্তন ঘটেছে তা তাইওয়ানের প্রযুক্তি শিল্পের বড় এক রূপান্তরের অংশ। আগে এখানে বেশিরভাগ কোম্পানি ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ওপর নির্ভর করত বিশেষ করে ফক্সকন আইফোন বানাত, ‘কোয়ান্টা কম্পিউটার’ ও ‘উইস্ট্রন কর্প’ নোটবুক তৈরি করত, সেখানে এখন সবাই এআই সার্ভারে প্রচুর বিনিয়োগ করছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এনভিডিয়ার পার্টনার উইস্ট্রনের আয় বেড়েছে ৯২.৭ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে কোয়ান্টার আয় বেড়েছে ৬৫.৬ শতাংশ।
ফক্সকনের মতো মূল নকশা নির্মাতাদের কথা উল্লেখ করে ‘বোফা গ্লোবাল রিসার্চ’-এর এশিয়ার টেকনোলজি হার্ডওয়্যার রিসার্চের প্রধান রবার্ট চেং বলেছেন, “২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তাইওয়ানের বিভিন্ন ওডিএম কোম্পানির ব্যবসার আয় বাড়ছে। তাদের বিক্রির এ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বাজারের চলতি ট্রেন্ডের বড় এক প্রমাণ। ”
তাইওয়ানের ‘মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড কনসাল্টিং ইনস্টিটিউট’-এর শিল্প পরামর্শক ক্রিস ওয়েই বলেছেন, এসব কোম্পানির দ্রুত এআই সার্ভারে পরিবর্তনের পেছনের কারণ হচ্ছে তাইওয়ানের বিভিন্ন প্রযুক্তি সরবরাহ চেইন গত দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে মিল রেখে ডেটা সেন্টার অবকাঠামো তৈরিতে কাজ করছে।
তার ধারণা, গোটা বিশ্বে সার্ভার চালানের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এআই সার্ভারের ৯০ শতাংশেরও বেশি বহন করছে তাইওয়ান।
এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন প্রযুক্তি গবেষক চেং।
তিনি বলেছেন, “আমরা মনে করি এআই সার্ভারের দিকে এই পরিবর্তন যেভাবেই হোক না কেন তা তাইওয়ানের প্রযুক্তি খাতের জন্য ভালো। কারণ দ্রুত পরিবর্তিত গ্রাহকদের চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে তাইওয়ানের বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে।