Published : 30 Mar 2026, 12:08 PM
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে বিশ্বের হিলিয়াম বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছে চিপ উৎপাদন শিল্প।
এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া তাদের বিশাল হিলিয়াম মজুত ব্যবহার করে চীনসহ নতুন বাজার দখল ও উচ্চমূল্যের সুবিধা নিয়ে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পথে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে শিল্প পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের মধ্যে প্রযুক্তি খাতে হিলিয়াম এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের উপজাত হিসেবে হিলিয়াম সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিলিয়াম সরবরাহকারী দেশ কাতার ইরানি হামলার কারণে তাদের রপ্তানি সক্ষমতা হারিয়েছে।
‘এসএন্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে কাতার বিশ্ববাজারের ৩০ শতাংশেরও বেশি হিলিয়াম সরবরাহ করেছে। এত বড় ঘাটতি অন্য কোনো দেশের জন্য পূরণ করা বেশ কঠিন।
১২ মার্চ ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে কাতারের হিলিয়াম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজার থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বাজারে হিলিয়ামের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।”
এরপর থেকেই হিলিয়ামের দাম বেড়েছে। বাজার পর্যবেক্ষকরা চিপ নির্মাতাদের কাঁচামাল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রেতাদের সরবরাহ চেইন বজায় রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে।
এদিকে, উত্তর আমেরিকা বিশ্বের হিলিয়াম বাজারের সবচেয়ে বড় অংশের মালিক। কাতারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে উত্তর আমেরিকার উৎপাদকরা লাভবান হতে যাচ্ছে। তবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়াও এ পরিস্থিতি থেকে সুবিধা পেতে পারে।
হিলিয়াম নিয়ে রাশিয়ার পরিকল্পনা
সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরির বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়। কারণ হিলিয়ামের ঠান্ডা করার সক্ষমতা রয়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ১৩ই মার্চের ‘বার্নস্টাইন নোট’-এ বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইরান যুদ্ধের আগেই রাশিয়া হিলিয়াম উৎপাদন বাড়িয়েছিল। কারণ তাদের কাছে হিলিয়ামের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং ‘যুদ্ধ পরিচালনার জন্যও দেশটির অর্থের প্রয়োজন’। ফলে যেসব দেশে নিষেধাজ্ঞা নেই সেসব আন্তর্জাতিক বাজারে হিলিয়ামের সরবরাহ বেড়েছে ও দাম কমেছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধতার কারণে রাশিয়ার হিলিয়াম উৎপাদনকারীরা সেসব বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না।
‘সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন’-এর মতে, ২০২৩ সালে বিশ্বের ৩৩ শতাংশ ‘ম্যাচিওর নোড’ চিপ তৈরি করেছে চীন। দেশটি ক্রমশ মস্কোর দিকে ঝুঁকছে।
‘সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি’ বা সিজিইপি’র তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে রাশিয়া থেকে চীনে হিলিয়াম রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
গত বছর চীনের হিলিয়াম চাহিদার ৫৪ শতাংশ সরবরাহ করেছে কাতার। ফলে কাতারের হিলিয়াম রপ্তানি দীর্ঘস্থায়ীভাবে ব্যাহত হলে চীনের বাজারে বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা রাশিয়ার জন্য বড় সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে।
বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতার কারণে পশ্চিমা চিপ নির্মাতাদের কাছে রাশিয়ার হিলিয়াম পছন্দের উৎস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে ‘এসএন্ডপি গ্লোবাল এনার্জি’র ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস ও ফার্টিলাইজার বিভাগের গবষণা পরিচালক রালফ গুবলার বলেছেন, রাশিয়ার এ হিলিয়াম ‘চীনের মতো বাজারগুলোতে জায়গা করে নিতে পারে। ফলে অন্যান্য জায়গাতে সরবরাহ কমে আসবে’।
এক ব্লগ পোস্টে সিজিইপি’র রিসার্চ স্কলার এরিকা ডাউন্স লিখেছেন, “কাতারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া অব্যাহত থাকলে চীনের হিলিয়াম বাজারে রাশিয়ার নিজের প্রভাব আরও বাড়ানোর ভালো সুযোগ রয়েছে।”
‘কর্নব্লাথ হিলিয়াম কনসাল্টিং’য়ের প্রেসিডেন্ট ফিল কর্নব্লাথ বলেছেন, রাশিয়ার হিলিয়াম এখনও চিপ তৈরির বিশেষ বিভিন্ন কারখানাতে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উপযোগী বা ‘কোয়ালিফাইড’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। তবে তা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে চিপ খাতের জন্য উন্মুক্ত হবে অন্যান্য উন্নতমানের হিলিয়াম।
বার্নস্টাইন বিশ্লেষকরা বলছেন, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদন হিলিয়াম সংকটের কারণে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কম। এর কারণ হিসেবে তারা রাশিয়ার সরবরাহ বৃদ্ধি, চিপ নির্মাতাদের সঙ্গে শিল্প গ্যাস কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক ও এসব কোম্পানির নিজস্ব মজুতের কথা বলেছেন।
তবে এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে হিলিয়ামের দাম চড়া থাকতে পারে, যার ফলে অনেক ক্রেতা তাদের আমদানির উৎস পরিবর্তনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।
কাতার যখন তাদের গ্যাস উৎপাদন পুনরায় সচল করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে তখন তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণে রাশিয়ার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা।
এরপরও এ ‘একঘরে’ দেশটির হাতে এমন কিছু বাজার রয়েছে যারা তাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে আগ্রহী।
এদিকে, চিপ ডিজাইনার কোম্পানি ‘আর্ম’-এর শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
কোম্পানিটি বলেছে, তাদের নতুন উদ্ভাবিত নিজস্ব চিপ ২০৩১ সালের মধ্যে দেড় হাজার কোটি ডলার রাজস্ব তৈরি করবে।
এ চিপটি বিশেষভাবে ‘এআই ইনফারেন্স’-এর জন্য তৈরি হয়েছে। এ প্রযুক্তি বর্তমানে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এই খাতে বড় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।