Published : 05 Feb 2026, 05:06 PM
মহাকাশ বিজ্ঞানের চিরাচরিত ইতিহাস বদলে দিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে রাশিয়া, যেখানে বর্তমান প্রযুক্তিতে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস সময় লাগে, সেখানে রাশিয়ার নতুন আবিষ্কৃত ইঞ্জিন সেই সময়কে কমিয়ে আনবে কেবল ৩০ দিনে– এমনই দাবি দেশটির।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, রাসায়নিক রকেট দিয়ে মানুষের মহাকাশ অভিযানের গল্প শুরু হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন নতুন অধ্যায় শুরু করতে উন্মুখ। সেটি হচ্ছে প্লাজমা প্রপালশন।
পুরানো আমলের রাসায়নিক রকেটের তুলনায় নতুন প্রজন্মের এসব রকেট অনেক বেশি সাশ্রয়ী, শক্তিশালী ও দ্রুতগতির। এদের অনেক সময় ‘ম্যাগনেটোপ্লাজমা রকেট’ বলাও হয়, এগুলোর অনেক ধরন ও নকশা রয়েছে। এ ইঞ্জিন মূলত জ্বালানিকে আয়নিত করে ও চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে সেটিকে প্রচণ্ড গতিতে ছুড়ে দেওয়ার ধাক্কা বা থ্রাস্ট তৈরি করে।
ভবিষ্যতের দিক পরিবর্তন বুঝতে পেরে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এরইমধ্যে ‘পালস প্লাজমা রকেট’ ও টেক্সাসের ‘অ্যাড অ্যাস্ট্রা রকেট’ কোম্পানির তৈরি ‘ভ্যারিয়েবল স্পেসিফিক ইমপালস ম্যাগনেটোপ্লাজমা রকেট’ নামের দুটি প্রকল্পের পেছনে মোটা অংকের বিনিয়োগ করেছে সংস্থাটি।
বর্তমানে প্রচলিত জ্বালানীর রকেটে চড়ে পৃথিবী থেকে মঙ্গলে পৌঁছাতে গড়ে প্রায় ৮ মাস সময় লাগে। তবে নাসার এই নতুন প্রযুক্তির রকেট ব্যবহার করলে সেই সময় নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ দিনে নেমে আসবে। বিষয়টি অনেকটা এমন যেন, কেউ নৌকা করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার পর তাকে ‘জেট প্লেন’ আবিষ্কারের কথা জানানো হল।
প্লাজমা রকেটের এই দৌড়ে সবশেষ সংযোজন হচ্ছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘রোসাটম’-এর তৈরি ‘ম্যাগনেটোপ্লাজমা অ্যাক্সিলারেটর’। মস্কোর ‘ট্রয়েটস্ক ইনস্টিটিউট’-এ তৈরি এ ইঞ্জিনটি পারমাণবিক শক্তি ও কোয়ান্টাম কম্পিউটার বা উইন্ড টারবাইন তৈরির মতো উন্নত প্রযুক্তিতে পারদর্শী।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ প্রযুক্তির কথা প্রথম সামনে আনে রাশিয়া। এ ইঞ্জিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর হাইড্রোজেন কণানির্ভর গতি, যা প্রতি রকেটকে সেকেন্ডে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি দিতে পারে। এর সক্ষমতা বা পাওয়ার আউটপুট ৩০০ কিলোওয়াট।
রোসাটম-এর দাবি অনুসারে, বর্তমানে অন্য কোনো প্রযুক্তিতে এমন সক্ষমতা দেখা যায় না। যেখানে অন্যান্য ইঞ্জিনে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতি পাওয়া যায়, সেখানে রাশিয়ার এই প্রযুক্তি তার প্রায় দ্বিগুণ গতি দিতে পারে।
স্কুলপড়ুয়াদের সেই ‘তুমি যা পারো, আমি তার চেয়ে ভালো পারি’ স্বভাবের মতোই রাশিয়ান এ সংস্থাটি দাবি করেছে, তাদের প্লাজমা রকেট তাত্ত্বিকভাবে কেবল এক মাসে মঙ্গলে পৌঁছাতে পারে। পরিকল্পনা অনুসারে সবকিছু চললে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই ইঞ্জিনের একটি উড্ডয়নওয়ালা সংস্করণ তৈরি করতে চায় তারা।
রাশিয়ার জন্য অনেক বড় লক্ষ্য এটি। কারণ দেশটির মহাকাশ শিল্পের অবস্থা বর্তমানে খুব একটা ভালো নয়। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে রাশিয়ার অন্যতম বড় রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘আরএসসি এনার্জিয়া’র প্রধান ইগর মালতসেভ তাদের মহাকাশ উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে হতাশাজনক মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “পরিস্থিতি আসলে কেমন তা নিয়ে আমাদের নিজেদের ও অন্যদের কাছে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে।”
রাশিয়া ২০৩০ সালের মধ্যে এই ‘অতুলনীয়’ প্লাজমা ইঞ্জিন বাস্তবে তৈরি করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্লাজমা ইঞ্জিনের পেছনে উঠেপড়ে লেগেছে।
চীনের ‘শি’আন অ্যারোস্পেস প্রপালশন ইনস্টিটিউট’ দাবি করেছে, যুগান্তকারী এক ‘উচ্চ-থ্রাস্টওয়ালা ম্যাগনেটিক প্লাজমা থ্রাস্টার’ তৈরি করছে তারা।
গত অক্টোবরে ‘উহান ইউনিভার্সিটি’ থেকে আসা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ প্লাজমা প্রযুক্তিকে মহাকাশ ছাড়িয়ে সাধারণ প্লেন ইঞ্জিনেও ব্যবহারের উপায় খুঁজছে দেশটি।
রাশিয়ার এ প্লাজমা ইঞ্জিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়ত তাদের আগের অনেক ব্যর্থ বা অতিরঞ্জিত প্রযুক্তির তালিকায় যোগ হতে পারে। তবে মানব মহাকাশ অভিযানের এ নতুন অধ্যায়টির সম্ভাবনা মোটেও অবাস্তব নয়।