Published : 24 Jan 2026, 12:15 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানব অ্যাকাউন্টের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ঝাঁক। ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও ভোটারদের বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে আগামী দিনের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধসিয়ে দিতে পারে এ প্রযুক্তি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক নেতারা খুব শিগগিরই মানুষের মতো আচরণ করে এমন ‘এআই এজেন্ট’ ব্যবহার করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য, জনমতকে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করা, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, নতুন এ ‘বিপজ্জনক হুমকি’ নিয়ে সতর্ক করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কর্মী মারিয়া রেসা ও বার্কলে, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও ইয়েল ইউনিভার্সিটির শীর্ষ গবেষকরা।
তারা বলেছেন, এ ক্ষতিকর ‘এআই সোয়ার্ম’ বা এআইয়ের ঝাঁক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে, যেখানে এদের শনাক্তের কাজটি খুব কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনগণকে নির্বাচন বাতিল বা ফলাফল পাল্টে দেওয়ার মতো বিষয় মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন কোনো স্বৈরশাসক। ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই এই প্রযুক্তি বড় পরিসরে ব্যবহৃত হতে পারে।
সতর্কবার্তাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
এ ঝুঁকি ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি এআইচালিত অপপ্রচার ঠেকাতে ‘সোয়ার্ম স্ক্যানার’ বা ঝাঁক শনাক্তকারী প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জলছাপ বা ‘ওয়াটারমার্ক’ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২০২৪ সালে তাইওয়ান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার নির্বাচনেও এআইচালিত এ ধরনের প্রভাব বিস্তারের প্রাথমিক কিছু নমুনা দেখা গেছে।
গবেষকরা বলেছেন, “একদল ক্ষতিকর এআই এজেন্টের সম্মিলিত আক্রমণ বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সিস্টেম নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে, বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটিতে মিশে যেতে এবং কোনো একটি বিষয়ে মানুষের মধ্যে ভুয়া জনমত তৈরি করতে পারে। মানুষের সামাজিক আচরণ নকল করে এরা গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলছে।”
তবে ‘প্রচার প্রযুক্তি’ বিশেষজ্ঞ ইনগা ট্রাউথিগ বলেছেন, রাজনীতিবিদরা সহজে এই প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবেন না। কারণ প্রচারের নিয়ন্ত্রণ তারা নিজেদের হাতে রাখতে চান। এ ছাড়া ভোটাররা এখনও অফলাইন প্রচারের মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত হন। ফলে এ ধরনের অবৈধ পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া শেষ পর্যন্ত লাভজনক হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েই যায়।
এ সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছেন ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র গ্যারি মার্কাস। বর্তমান বিভিন্ন এআই মডেলের অতিরঞ্জিত সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান ও নিজেকে একজন ‘জেনারেটিভ এআই রিয়ালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।
এ দলে আরও আছেন তাইওয়ানের প্রথম ডিজিটাল মন্ত্রী অড্রে ট্যাং। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “স্বৈরাচারী শক্তির মদতপুষ্ট ব্যক্তিরা এআইকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং আমাদের সমাজের বিভিন্ন শক্তিকেই আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।”
তালিকায় আরও রয়েছেন ‘কনস্টানজ ইউনিভার্সিটি’র সামাজিক ও আচরণগত ডেটা সায়েন্সে বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড গার্সিয়া, ‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি’র অপপ্রচার বিশেষজ্ঞ স্যান্ডার ভ্যান ডার লিন্ডেন এবং ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার সামারফিল্ড।
তারা বলেছেন, রাজনৈতিক নেতারা এমন অগণিত এআই এজেন্ট ব্যবহার করতে পারেন, যেগুলো অনলাইনে মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করবে। এসব এআই খুব সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন অনলাইন দল বা কমিউনিটিতে ঢুকে পড়বে, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের বিভিন্ন দুর্বলতা বুঝবে এবং অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ও সুকৌশলী মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পুরো দেশের মানুষের মতামত বদলে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
এআইয়ের মাধ্যমে আলোচনার সুর ও বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই হুমকি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। এসব এআই এখন মানুষের আচরণ হুবহু নকল করতে পারছে, যাতে কেউ এদের শনাক্ত করতে না পারে এজন্য কথাবার্তায় আঞ্চলিক বা চলিত ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের মতো অনিয়মিতভাবে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছে এরা।
এ ছাড়া, ‘এজেন্টিক’ এআইয়ের উন্নতির ফলে এগুলো এখন নিজেরাই নিজেদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও পরিচালনা করতে পারে।
ওসলোর ‘সিনটেফ’ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও এ প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ড্যানিয়েল থিলো শ্রোডার বলেছেন, এসব এআই কেবল সামাজিক মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনটি বেশি কার্যকর হবে তার ওপর ভিত্তি করে মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার, ব্লগ লেখা ও ইমেলও ব্যবহার করতে পারে এরা।
তাইওয়ানের ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির একজন সংসদ সদস্য ও চীনা অপপ্রচার বিরোধী কর্মী পুমা শেন বলেছেন, তাইওয়ানের ভোটাররা প্রায়ই অজান্তে চীনা অপপ্রচারের শিকার হন, সেখানে গত দুই-তিন মাসে থ্রেডস ও ফেইসবুকের মতো যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এআই বটের সক্রিয়তা অনেক বেড়েছে।
শেন জানান, রাজনৈতিক আলোচনার সময় এসব এআই এমন তথ্য দেয়, যা যাচাই করা সম্ভব নয়। ফলে সাধারণ মানুষ তথ্যের ভারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এসব এআই এমন সব ভুয়া নিবন্ধের সূত্র দেয়, যেখানে দাবি করা হয়, আমেরিকা তাইওয়ানকে আর সমর্থন করবে না। এসব এআই বট তরুণ তাইওয়ানিজদের এই বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্ব অত্যন্ত জটিল। ফলে ‘তোমাদের যদি গভীর জ্ঞান না থাকে তবে কোনো পক্ষ নিও না’।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক-এর মতো সিলিকন ভ্যালির বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে অনেক বড় বড় দাবি করলেও বাস্তবে ততটা উন্নতি হচ্ছে না। ফলে ‘এআই সোয়ার্ম’-এর হুমকিটি আসলে কতটা বাস্তব তা নিশ্চিত হতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।