Published : 12 May 2026, 10:48 AM
২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি আসার পর থেকে বিশ্বজুড়ে যে এআই বিপ্লব শুরু হয়েছে তা কেবল সাধারণ কর্মীদের কর্মসংস্থানই কেড়ে নিচ্ছে না, বরং আমূল বদলে দিচ্ছে বড় বড় কোম্পানির নীতিনির্ধারণী পর্যায়কেও।
বর্তমানে অনেক কোম্পানিই ‘চিফ এআই অফিসার’ নামের নতুন এক জ্যেষ্ঠ পদ তৈরি করছে, যা কর্পোরেট দুনিয়ায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আরেমিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
আইবিএম-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, এআই সাধারণ কর্মীদের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি বড় বড় কোম্পানির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সিইও’দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকেও আমূল বদলে দিচ্ছে।
এ পরিবর্তন কতটা দ্রুত ঘটছে তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক জরিপে, যেখানে দুই হাজার কোম্পানির মধ্যে ৭৬ শতাংশই এখন ‘চিফ এআই অফিসার’ নামে নতুন উচ্চপদ তৈরি করেছে, যা এক বছর আগেও ছিল কেবল ২৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্পোরেট দুনিয়ায় এআইয়ের এ জয়জয়কার ভবিষ্যতে বড় ধরনের শ্রম সংকট তৈরি করতে পারে।
‘ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানি’র পার্টনার ভিভেক লাথ বলেছেন, “শিল্প বিপ্লব ও ডিজিটাল বিপ্লবের পর এআইয়ের হাত ধরেই সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে যাচ্ছে।”
প্রযুক্তির এ দাপটের মধ্যেও মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব কমছে না।
আইবিএম-এর ওই প্রতিবদনে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ মানুষের ধারণা, এআইয়ের এ যুগে মানুষের ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠবে। ফলে ‘চিফ হিউম্যান রিসোর্সেস অফিসার’ বা সিএইচআরও’দের প্রভাব আগের চেয়ে বাড়বে।
অস্পষ্ট সীমানা
এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে কোম্পানির উচ্চপর্যায়ে এর মালিকানা বা দায়িত্ব কার হবে তা নিয়ে ততই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
মার্কেট রিসার্চ কোম্পানি ‘ওমডিয়া’র প্রধান বিশ্লেষক লিয়ান জ্যে সু বলেছেন, বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পদ, যেমন ‘চিফ টেকনোলজি অফিসার’, ‘চিফ ইনফরমেশন অফিসার’ ও ‘চিফ ডেটা অফিসার’দের মধ্যে এআইয়ের দায়ভার আসলে কার তা নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে।
সু আরও বলেছেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন অবকাঠামো তৈরি, সঠিক পরিচালনা বা ‘গভর্ন্যান্স’, বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় ও কাজের ধরনের আধুনিকায়ন।
এসব চ্যালেঞ্জ ঠেকাতেই বিভিন্ন কোম্পানি এখন বিশেষভাবে ‘চিফ এআই অফিসার’ পদটি তৈরি করছে, এরা কোম্পানির এআই রূপান্তরের বিষয়টি তদারকি করবে। যেমন, এ বছরেই ‘এইচএসবিসি’ ও ‘লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ’-এর মতো বড় বিভিন্ন কোম্পানি এ পদে নিয়োগ দিয়েছে।
তবে কত সংখ্যক কোম্পানি আসলে এ নতুন পদটি তৈরি করছে, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘গার্টনার’-এর পরিচালক জোনাথন তাবাহ এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন।
“আমরা কি ‘চিফ এআই অফিসার’ নিয়োগ হতে দেখছি? হ্যাঁ, দেখছি। তবে এমনটি কি সব কোম্পানির ক্ষেত্রে সাধারণ এক নিয়ম হয়ে দাঁড়াবে? না, সম্ভবত তা হবে না।”
তাবাহ বলেছেন, যেসব কোম্পানি এরইমধ্যে ‘চিফ এআই অফিসার’ নিয়োগ দিয়েছে তারা আসলে এ উদ্ভাবনের দৌড়ে সবার আগে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে উচ্চপর্যায়ে এমন নতুন পদ তৈরি করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, যা সব কোম্পানির পক্ষে সম্ভব বা যৌক্তিক নাও হতে পারে।
অন্যদিকে, আইবিএম-এর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হ্যান্স ডেকার্স বলেছেন, এ নতুন পদের উত্থানে প্রমাণ মেলে, “এআই এখন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রযুক্তিগত উদ্যোগ হিসেবে আটকে নেই।
“চিফ ইনফরমেশন অফিসার, চিফ টেকনোলজি অফিসার ও চিফ ডেটা অফিসার প্রত্যেকেই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে একজন চিফ এআই অফিসারের মূল কাজ পুরো কোম্পানি জুড়ে এআইয়ের প্রয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে কর্মীদের কাজ করার পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা যায়।”
আইবিএম তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, “একজন চিফ এআই অফিসার পুরো কোম্পানির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার সাহস জোগাতে পারে। একইসঙ্গে এআই ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা ও সঠিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে, যাতে দলগুলো বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে পারে।”
ভিভেক লাথ বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট পদের নাম তৈরি করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পুরো কোম্পানি জুড়ে এআইয়ের বিভিন্ন কাজের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় নিশ্চিত করা।
তবে ‘২০২৬ এআই অ্যান্ড ডেটা লিডারশিপ এক্সিকিউটিভ বেঞ্চমার্ক সার্ভে’র লেখক ও শিল্প উপদেষ্টা র্যান্ডি বিন বলেছেন, চিফ এআই অফিসার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব একেক কোম্পানিতে একেক রকম এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তিত হয়।
বিন বলেছেন, আসল প্রশ্নটি হচ্ছে এ নতুন পদটি কি কেবল ‘অস্থায়ী বা রূপান্তরকালীন’ ভূমিকা হিসেবে থাকবে, যা এআইয়ের প্রাথমিক ধাপ শেষ হলে অন্য কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্বের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে, নাকি স্থায়ী পদ হিসেবেই টিকে থাকবে।
মানবসম্পদ বা এইচআর সংক্রান্ত প্রশ্ন
ওমডিয়া’র বিশ্লেষক সু বলেছেন, “কোম্পানির প্রতিভা ব্যবস্থাপনা, নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার জন্য ‘চিফ এইচআর অফিসার’ বা মানবসম্পদ প্রধানরা এক অনন্য অবস্থানে রয়েছেন। কর্মীদের মধ্যে এআই সংক্রান্ত শিক্ষার অভাব বা ‘এআই লিটারেসি’ অধিকাংশ কোম্পানির জন্য বড় বাধা।”
একইভাবে, র্যান্ডি বিন বলেছেন, ‘২০২৬ এআই অ্যান্ড ডেটা লিডারশিপ’ জরিপে ৯৩.২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার চেয়ে ‘সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ’ বা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পরিবেশই প্রধান বাধা।
এদিকে, গার্টনার-এর বিশ্লেষক তাবাহ বলেছেন, এআইয়ের মাধ্যমে কাজ স্বয়ংক্রিয় করার বিষয়টি এইচআর বিভাগকে আরও কৌশলগত ভূমিকা পালনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
“বিষয়টি এইচআর বিভাগের জন্য একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে তারা অবশেষে দৈনন্দিন কাজের বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে দক্ষ ও কৌশলগত নেতৃত্ব দেওয়ার পর্যায়ে উঠে আসতে পারবে।”
তবে তাবাহ সতর্ক করে বলেছেন, “আপনার কোম্পানির এইচআর বিভাগ যদি কৌশলগত না হয়ে সাধারণ দাপ্তরিক কাজ বা অপারেশনাল কাজেই সীমাবদ্ধ থাকে তবে চিফ এআই অফিসার ব্যবহারের ফলে তা আরও বেশি সেদিকেই ঝুঁকে পড়বে, অর্থাৎ তখন এদের কাজগুলো বেশি অটোমেটেড হয়ে যাবে।”
কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হতে পারে এআইয়ের কারণে কর্মীদের চাকরি হারানো বা যেসব পরিবর্তন আসছে তার মানবিক বিভিন্ন প্রভাব কীভাবে সামলানো হবে সেই বিষয়টি।
তাবাহ বলেছেন, “স্বল্পমেয়াদে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চাকরিতে সবচেয়ে কম প্রভাব পড়বে... কারণ এআইয়ের প্রভাব থেকে তারাই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত।
“তবে এর মানে এই নয় যে, এআই কীভাবে কাজে লাগাতে হবে বা এর প্রয়োগ কীভাবে ঘটাতে হবে সেই দায়িত্ব থেকে তারা মুক্তি পাচ্ছেন। তাদের নিজেদের পদের ওপর সরাসরি প্রভাবের কথা বললে তারা আপাতত বেশ নিরাপদেই থাকছেন।”
আসলে কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোকে খুব সহজে নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে ফেলা যায় না। যেমন, কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বিভিন্ন অংশীজন বা স্টেকহোল্ডারদের সামলানোর মতো কাজগুলো এআই অ্যালগরিদমের হাতে ছেড়ে দেওয়া বেশ কঠিন।
“কোম্পানির কোথায় এআইয়ের প্রভাব পড়বে তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাতেই থাকে। ফলে এ পরিবর্তনের ধাক্কা থেকে নিজেদের রক্ষার সামর্থ্যও তাদের বেশি।”
‘লেঅফস ডটএফওয়াইআই’-এর হিসাব অনুসারে, এ বছরের এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এক লাখেরও বেশি প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এপ্রিলে মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বিভিন্ন কোম্পানিতে ২০ হাজারেরও বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর মিলেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ছাঁটাই আসলে ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে তারই আগাম সংকেত।