Published : 07 Oct 2025, 11:38 AM
আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে আমাদের হয়ত নতুন এক ‘পাসকালিয়ান’ বাজি ধরতে হতে পারে, ঠিক যেমনটি বহু আগে ব্লেইস পাসকাল ঈশ্বরে বিশ্বাস নিয়ে প্রস্তাব করেছিলেন। তবে, এখানে প্রসঙ্গটি ঈশ্বর নয়, বরং এআইয়ের ভবিষ্যৎ ও এর প্রভাব নিয়ে।
১৬৫৪ সালে ফরাসি দার্শনিক ও গণিতবিদ ব্লেইস পাসকাল ঈশ্বরে বিশ্বাসের পক্ষে একটি যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা ‘পাসকালের বাজি’ নামে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, কেউ ঈশ্বরে যদি বিশ্বাস করে এবং ঈশ্বর না-ও থাকেন তবে তার ক্ষতি খুবই সামান্য। তবে কেউ যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে অথচ ঈশ্বর থেকে থাকেন তাহলে তার ক্ষতি হতে পারে অসীম।
ফলে একজন যুক্তিনির্ভর ব্যক্তি কী করবে? পাসকালের মতে, সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক সিদ্ধান্ত হল ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখা। কারণ এতে ক্ষতির ঝুঁকি কম হলেও লাভ হতে পারে অসীম।
পাসকালের যুক্তি নির্ভর করেছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর, যার ফলাফল হতে পারে চিরন্তন। তবে বর্তমানে এআইয়ের রূপান্তরমূলক প্রভাবের প্রমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। ব্যাপক পরিসরে এর আগমন ঘটবে দূর ভবিষ্যতে নয়, বরং সামনের কয়েক বছরের মধ্যেই, এমনটাই উঠে এসেছে টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে।
বাজিটি হচ্ছে, হয়ত এআই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ, শিক্ষা, কর্পোরেশন ও সমাজকে আমূল বদলে দেবে বা দেবে না। আমরা যদি পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেই এবং তা যদি এমনটা না-ও ঘটে তবে আমরা সম্ভবত ডিজিটাল দক্ষতায় বিনিয়োগ করব, প্রচলিত বিভিন্ন কোম্পানি নিয়ে আমরা নতুনভাবে ভাবব এবং শ্রমিকের মজুরির বাইরে আয় বণ্টনের বিকল্প উপায় নিয়েও চিন্তা করব, যেগুলো কোনো ভয়াবহ ক্ষতি নয়।
তবে আমরা যদি প্রস্তুতি না নেই এবং হঠাৎ করে কোনো পরিবর্তন এসে পড়ে তাহলে আমাদের সামনে বিশাল বেকারত্ব, অচল হয়ে পড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাপক সামাজিক বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি থাকবে। এক্ষেত্রে যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত একেবারেই স্পষ্ট, যেখানে আমাদের ধরে নিয়েই এগোতে হবে যে এই রূপান্তর ঘটবে।

এরইমধ্যে এআইয়ের প্রথম ধাক্কা সামলাচ্ছে চাকরির বাজার। কিছুটা অতিরঞ্জিত শোনালেও এআই স্টার্টআপ অ্যানথ্রপিক-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ড্যারিও অ্যামোদেই এবং মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগলের সাবেক সিইও এরিক স্মিডের মতো প্রযুক্তি প্রধানদের অনুমান বলছে, আগামী ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ এন্ট্রি-লেভেলের দাপ্তরিক চাকরি বিলুপ্ত করে দিতে পারে এআই।
তাদের সঙ্গে একমত নোবেল বিজয়ী জেফ্রি হিন্টন, মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক এবং আরও অনেক বিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ও প্রযুক্তি নির্বাহী, যারা আসন্ন এক ‘জবপোক্যালিপ্স’ বা চাকরির মহা বিপর্যয়ের আগাম সতর্কতা দিচ্ছেন।
আমাদের প্রচলিত ধারণা, হাজার হাজার বছর ধরে অর্থনীতি অনেকবার পরিবর্তনের ধাক্কা সামলেছে এবং প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে শ্রমবাজার নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। নতুন যে কোনো প্রযুক্তি সবসময় নতুন উচ্চ বেতনের কাজের সুযোগ তৈরি করে, যা পুরানো বিভিন্ন কাজকে বদলে দেয়।
তবে সম্ভবত এবার তেমনটি ঘটবে না। আগের বিভিন্ন পরিবর্তনের ঢেউ মূলত শারীরিক শ্রমের কাজকে প্রতিস্থাপন করেছিল। আর এইবারেরটা বদলাবে মানুষের বিচারবুদ্ধিকে। সহজেই যদি এসব এআই সিস্টেম মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে সাধারণ এক পণ্যে বদলে দেয় তাহলে কী হতে পারে?
এটি ধীরে ধীরে শতাধিক বছরের মধ্যে কারখানা শ্রমিকদের বদলের বিষয়ে নয় বা সামান্য কিছু চাকরির জন্য পুনরায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায় এমন ছোট শ্রমবাজারে প্রভাব পড়ার বিষয়ও নয়, বরং এটি খুবই ছোট সময়ের মধ্যে দাপ্তরিক কর্মীদের এক বিশাল অংশের চাকরি হারানোর বিষয়।
এআইয়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব যাই হোক না কেন বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান ব্যবস্থা মানুষকে এমন কাজের জন্য প্রস্তুত করছে, যা এআই সবচেয়ে ভালো করে। যেমন– তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও কোনোকিছুর মানসম্পন্ন, নির্ধারিত ফলাফল তৈরি করা। ফলে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি আসলে তাদের শিক্ষার্থীদের ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে ওঠার জন্য প্রস্তুত করছে, আর শিক্ষার্থীদেরই এই অবস্থার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।
এখানে থামলে চলবে না। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা প্রস্তুত হবে এআই ও মানব মেডিক্যাল দলের যৌথ কাজের জন্য। বিভিন্ন আদালতকে তৈরি থাকতে হবে এমন কাঠামোর জন্য যেখানে এআই এজেন্টরা চুক্তি স্বাক্ষর করবে, নতুন নতুন উদ্ভাবন করবে বা অপরাধ ঘটাবে।
এ ছাড়াও, আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে এমন এক পৃথিবীর জন্য যেখানে এআইয়ের সক্ষমতা খারাপ কাজেও ব্যবহার হতে পারে, বিশেষ করে সাইবার হামলা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমাদের নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণার প্রয়োজন, যা মানুষের মূল্যকে কেবল কাজের সঙ্গে যোগ করবে না, বরং এআইয়ের পূর্ণাঙ্গ উপস্থিতি আমাদের জীবনে কীভাবে গভীর প্রভাব ফেলছে তা-ও বিবেচনায় আনবে। বিভিন্ন যন্ত্র যখন মানুষের চেয়ে বেশি চিন্তা করবে, বেশি কাজ করবে, বেশি সৃজনশীলতাও দেখাবে এবং আমাদের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠবে তখন প্রশ্ন উঠবে জীবনের অর্থ আসলে কী?
এআই নিয়ে আমাদের ধারণা যদি ভুল হয় তাহলে আমরা গভীর কিছু দার্শনিক চিন্তাভাবনা করেছি। কিন্তু যদি আমাদের ধারণা ঠিক হয় ও আমরা তেমন কোনো দার্শনিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি না নেই তাহলে এমন এক অর্থহীনতার সংকটে পড়তে পারি আমরা, যা ব্যাপক মানসিক চাপ বা তার চেয়েও বড় সমস্যার তৈরি করতে পারে।
পাসকাল চিরন্তন বিষয় নিয়ে বাজি ধরেছিলেন। কিন্তু এআইয়ের বাজি ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে হয়ত ঝুঁকি কম। তবে পাসকালের ঈশ্বরের মতো এআইয়ের আগমন কোনো বিচার দিবসের জন্য অপেক্ষা করবে না। সে এরইমধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে।