Published : 09 Nov 2025, 12:37 PM
অর্ধ শতাব্দী ধরে অটুট রয়েছে সামরিক জেট ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’-এর বিশ্ব রেকর্ড। এটি এমন এক নজির স্থাপন করেছিল, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। প্লেনটির কালো চেহারা, গোপন মিশনের ইতিহাস আর অসম্ভব গতিই একে করেছে মানব প্রকৌশলের অমর প্রতীক।
এখনও পর্যন্ত মানব ইতিহাসে তৈরি সবচেয়ে চমকপ্রদ সামরিক জেটগুলোর মধ্যে একটি ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’। এর দৃষ্টিনন্দন কালো চেহারা, অতুলনীয় গতি ও রেকর্ডভাঙা কর্মসক্ষমতা একে করেছে প্রকৌশলের এক অনন্য শিল্পকর্ম।
প্লেনটি তৈরি করেছে মার্কিন অ্যারোস্পেস, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কোম্পানি লকহিড মার্টিনের ‘অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামস’ বা এডিপি বিভাগ, যা বিশ্বজুড়ে ‘স্কাঙ্ক ওয়ার্কস’ নামে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকে গোপনে এ প্লেনের নকশা তৈরি করেছিলেন কোম্পানিটির প্রতিভাবান প্রকৌশলীরা।
প্রথমবারের মতো প্লেনটি পরীক্ষামূলকভাবে ওড়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে এবং কেবল এক বছরের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন বিমান বাহিনীর বহরে যোগ হয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
প্রায় তিন দশক ধরে ১৯৯০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শত্রুদের চোখের আড়ালে ও বজ্রের গতিতে গোপন মিশনে আকাশে ছুটে বেড়িয়েছে প্লেনটি। ওই সময়ে মোট ৩২টি এসআর-৭১ তৈরি করেছিল লকহিড। বিস্ময়করভাবে এর কোনোটিই শত্রুর গুলিতে ধ্বংস হয়নি, যদিও ১২টি দুর্ঘটনায় হারিয়ে গিয়েছে।
১৯৭৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে লন্ডন পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছিলেন মেজর জেমস সালিভান ও নোয়েল উইডিফিল্ড। পুরো যাত্রাটি সম্পন্ন হয়েছিল ১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিটেরও কম সময়ে, যা ছিল সেই সময়ে বিখ্যাত কনকর্ড জেটের সেরা সময়ের চেয়েও প্রায় এক ঘণ্টা দ্রুততর। পুরো যাত্রায় গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় সোয়া দুই হাজার কিলোমিটার গতিতে উড়েছিল প্লেনটি, যা ছিল কেবল শুরু।
১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই ঘণ্টায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে পৃথিবীর দ্রুততম মানবচালিত জেট প্লেনের রেকর্ড গড়েছিল ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’, যা পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কৌশলগত গুপ্তচর প্লেনের সর্বোচ্চ গতি ও উচ্চতার রেকর্ড।
তবে প্রযুক্তিগতভাবে বলা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর ‘অক্সকার্ট-১২’ নামের গুপ্তচর প্লেনটি এসআর-৭১-এর চেয়ে কিছুটা দ্রুততর ছিল। তবে সেই গতি অপ্রমাণিত ও অলিখিত পরিস্থিতিতেই রয়ে গিয়েছে।
এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড তৈরি হয়েছিল অতিদ্রুত ও অতিউচ্চ উচ্চতায় ওড়ার মিশনের জন্য। সেই লক্ষ্য নিখুঁতভাবে পূরণও করেছিল প্লেনটি। ওই সময়ে ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তি ছিল বিকাশের পর্যায়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল এমন এক প্লেনের, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশসীমা অতিক্রম করে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে, কিন্তু ধরা পড়বে না।
এসআর-৭১-এর অসাধারণ গতি ও উচ্চতার সীমা একে এমন স্থানে উড়তে সক্ষম করেছিল, যা ছিল তৎকালীন সোভিয়েত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাগালের অনেক বাইরে। এর পাইলটরা প্রায় সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানকে অতিক্রম করে ফাঁকি দিতে পারতেন, যা এ প্লেনের অসাধারণ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ-উড্ডয়নসক্ষম সামরিক জেট, যার পেছনে কাজ করেছিল দুটি শক্তিশালী ‘প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি জে৫৮’ ইঞ্জিন। প্রতিটি ইঞ্জিনই আফটারবার্নার চালু অবস্থায় সাড়ে ৩২ হাজার পাউন্ড থ্রাস্ট উৎপন্ন করত, যা এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ডকে পরিণত করেছিল আকাশের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে।