Published : 05 Jul 2026, 12:04 AM
আধুনিকায়নের কথা বলে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল রাজধানীর শাহবাগে শিশুদের জন্য সরকারি খাতের বিনোদন পার্ক ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’। কথা ছিল এক বছরের মধ্যেই নতুন রূপে পার্কটি খুলে দেওয়া হবে।
কিন্তু সেই এক বছরের প্রকল্প এখন গড়িয়েছে সাত বছরে, শুরুর ৭৮ কোটির বাজেট ঠেকেছে ৬০৪ কোটিতে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার গিয়ে অন্তবর্তী সরকারের সময় শেষে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
সেই সরকারেরও প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল, শিশু পার্ক ‘আধুনিকায়নের কাজ’ শেষ হয়নি এখনো। শহীদ জিয়া শিশু পার্ক দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে ‘ঢিমেতালে’।
এরইমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে এখন পার্কের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আছে প্রকল্পের নতুন কর্মকর্তা আসার অপেক্ষায়।
সংস্থাটির ভাষ্য, পার্কে রাইড বসাতে কেনাকাটার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী বছরের শুরুতে পার্কটি চালুর আশা করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে অবশ্য পার্কের ভেতরে তেমন কর্মযজ্ঞ দেখা গেল না। পার্কের ভেতরে তৈরি হয়েছে সবজি বাগান। ভেতরে ভবঘুরেদের আস্তানাও হয়েছে।
১৯৭৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ১৫ একর জমিতে জাপানের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই শিশু পার্ক। শিশুদের জন্য এটি ছিল দেশের প্রথম বিনোদন পার্ক। সে সময় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন একটি লাভজনক উদ্যোগ হিসাবে শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা করে।
১৯৮৩ সাল থেকে এটি দক্ষিণ ঢাকার একমাত্র বিনোদন পার্ক হিসাবে ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ নামে পরিচিত হয়। তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপল করপোরেশন এবং বর্তমানে ডিএসসিসি এর রক্ষণাবেক্ষণ করেছে।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের কাজের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শিশু পার্কটি বন্ধ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আধুনিকায়ন শেষে ওই বছরের শেষে পার্কটি আবার খুলে দেওয়া হবে। শিশু পার্ক আধুনিকায়নের খরচ নির্ধারণ করা হয় ৭৮ কোটি টাকা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে শিশু পার্ক আধুনিকায়নেরও অর্থ দেওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু আশ্বাস অনুযায়ী ২০১৯ এর শেষ নাগাদ কাজ শেষ হয়নি।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চললেও মাঠপর্যায়ে কাজের কোনো অগ্রগতি ছিল না। ২০২২ সালে কাজে পুরোপুরি স্থবিরতা দেখা দেয়। সে সময় ডিএসসিসির তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অর্থ ‘অপর্যাপ্ত’ হওয়ায় কাজ শুরু করা যায়নি।
পরে ডিএসসিসি এই পার্ক আধুনিকায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ৬১৬ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রকল্প জমা দেয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ডিএসসিসির নিজস্ব প্রকল্প হিসেবে এটি পুনরায় অনুমোদন পায়, যার বাজেট দাঁড়ায় প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা।
প্রায় পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর শিশু পার্কের স্বতন্ত্র আধুনিকায়ন কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। কিন্তু পার্কের একটি অংশ শাহবাগ থানা ব্যবহার করায় উন্নয়ন কাজ ‘বাধাগ্রস্ত’ হওয়ার খবর সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছিল।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তরবর্তী সরকারের সময়ে শিশু পার্কের স্বতন্ত্র আধুনিকায়ন কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে আরো গতি পায়। গত বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসির চতুর্থ পরিচালনা পর্ষদের সভায় পার্কের আগের নাম ‘শহীদ জিয়া শিশু পার্ক’ পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৩ সালের ৬০৪ কোটি টাকার বাজেট ঠিক রেখে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পার্কটি খুলে দেওয়া হবে বলা হয়েছিল।

এর মধ্যে আবার পার্কের কাজে ধীরগতি দেখা দেয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরই রাইড কেনাকাটা ও নির্মাণ কাজ নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে ডিএসসিসির দাবি। এখন আগামী বছরের শুরুতেই পার্কটি চালুর সম্ভাবনার কথা বলছেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।
বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পার্কের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ সীমিত। ভেতরে পুরোনো স্থাপনা ও রাইড অপসারণের পর নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চিহ্ন থাকলেও, পুরো এলাকাজুড়ে খুব একটা কর্মচাঞ্চল্য নেই। দৃশ্যমান কাজের মধ্যে কেবল একটি ড্রেনের নির্মাণকাজ চোখে পড়ে।
পার্কের ভেতরে ভবঘুরে কিছু ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এ সময় সাংবাদিকের উপস্থিতি টের তারা দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়।
পার্কের একটি অংশে বিভিন্ন শাক সবজি চাষ হতেও দেখা গেছে। কারা এসব চাষ করছে সে বিষয়ে উপস্থিত কেউ স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে পার্কে কর্মরত সুমন ও রাব্বি নামে দুই কর্মীও স্বীকার করলেন, একটু ঢিমেতালেই কাজ চলছে।

ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই প্রকল্পের পরিচালক ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আনিছুর রহমানকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে শিশু পার্ক নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
গত ৩০ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে জারি করা পৃথক দুটি আদেশে এই তথ্য দেওয়া হয়।
ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, “প্রকল্প পরিচালককে বদলি করেছে মন্ত্রণালয়। নতুন পরিচালকও মন্ত্রণালয় থেকেই দেবে। আমার তো কাজ বন্ধ থাকবে না। আমার সেকশন তো আছে, কাজ চলতে থাকবে।
“এরইমধ্যে কনস্ট্রাকশন ওয়ার্ক শেষ হয়েছে। এখন বিভিন্ন রাইড যেগুলো আছে, সেগুলোর জন্য টেন্ডার করা হয়েছে। টেন্ডার হওয়ার পরে মালামাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব সেগুলো স্থাপন করে পার্ক চালু করার ব্যবস্থা করব।”
তবে রাইড বসানো ও পার্ক চালুর বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য দেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “১৫টি রাইড কেনার জন্য টেন্ডার চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে যাচাই-বাছাই করে কার্যাদেশ দেওয়া হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের শুরুতে পার্কটি চালুর সম্ভাবনা আছে।
“রাইডগুলো বিদেশ থেকে আনতে হবে। এলসি করতে হবে। আমার ধারণা, রাইডগুলো আনতে ছয় থেকে সাত মাস লাগতে পারে।”