Published : 26 May 2026, 03:23 PM
গেল ১০ বছরে ইমিউনোথেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ব্যাপকহারে বেড়েছে। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে শক্তিশালী চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা যায় তা এখন আয়ত্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এ চিকিৎসায় ক্যান্সার নিরাময় সবচেয়ে এগিয়ে থাকলেও গবেষকদের নজর এখন অন্যান্য জটিল রোগের দিকেও। যার মধ্যে বিভিন্ন সংক্রমণ, অ্যালার্জি, মস্তিষ্কের রোগ ও অটোইমিউন ডিসঅর্ডার বা ‘দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন ভুলবশত সুস্থ কোষকে আক্রমণ করে) অন্যতম।
এসব থেরাপি ঠিক কীভাবে কাজ করে?
ইমিউনোথেরাপি কী?
ইমিউনোথেরাপি এক ধরনের জৈবিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যা দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হচ্ছে ‘ভ্যাকসিন’ বা টিকা, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতাকে ক্ষতিকর জীবাণু চিনে তা ধ্বংস করার প্রশিক্ষণ দেয়। অন্যান্য ইমিউনোথেরাপি দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তা বাড়িয়ে দেয় বা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাকে শান্ত বা কমিয়ে রাখে।
এ ছাড়া কিছু থেরাপিতে ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম কোষ বা অ্যান্টিবডি ব্যবহৃত হয়, যা সরাসরি রোগের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করে।
কবে থেকে শুরু?
দেহের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়িয়ে রোগ ঠেকানোর চেষ্টা হাজার বছর পুরানো। তবে নানা ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসায় এর আধুনিক ও উন্নত বিভিন্ন সংস্করণ গত দুই দশকে সামনে এসেছে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বৈশ্বিক তালিকায় দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইমিউনোথেরাপির ১ হাজার ২৫৭টি পরীক্ষা হয়েছিল। আর গত এক দশকে এ সংখ্যাটি লাফিয়ে ৪ হাজার ৫৯১-এ পৌঁছেছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ও ইমিউনোলজিস্ট আড্রিয়ান লিস্টন বলেছেন, “সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই রোমাঞ্চকর। মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে, আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, যা আসলে ইমিউনোলজি বা রোগ প্রতিরোধবিদ্যার যুগ।”
ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপি কীভাবে কাজ করে?
ক্যান্সার রোগীরা ইমিউনোথেরাপি থেকে বড় সুফল পাচ্ছেন এবং বর্তমানে ৩০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় এ ধরনের ডজনখানেক থেরাপির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কিছু টিউমার দেহের বিভিন্ন ইমিউন কোষকে ‘অচল’ বা নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দেয়। তবে ‘চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর’ বা অ্যান্টিবডিভিত্তিক ওষুধগুলো ওই নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে আবার সচল করে তোলে, যাতে এরা ক্যান্সার আক্রান্ত বিভিন্ন কোষকে চিনে নিয়ে আক্রমণ করতে পারে।
মেলানোমার বা এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সারের মতো দ্রুত রূপ পরিবর্তনকারী বা মারাত্মক বিভিন্ন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এ চিকিৎসা বেশ ভালো কাজ করে, তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে নয়।
কেন কিছু রোগী এই চিকিৎসায় খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন আর অন্যরা একেবারেই সাড়া দেন না তা বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য। এ রহস্যের জট খুলতেই গেল সপ্তাহে চার বছর মেয়াদী এক গবেষণা প্রকল্প শুরু হয়েছে।
এ প্রকল্পে স্তন, মূত্রাশয়, কিডনি ও ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত হাজার হাজার রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে বোঝা যায় কোন কোন বিষয়গুলোর ওপর এই চিকিৎসার ফলাফল নির্ভর করে।
অ্যান্টিবডিভিত্তিক অন্যান্য ওষুধ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে ভিন্নভাবে লড়াই করে, যেমন ‘হারসেপটিন’ নামের ওষুধ স্তন ও পাকস্থলীর টিউমারের গায়ে লেগে থাকে এবং সেগুলোকে ধ্বংসের জন্য দেহের ইমিউন সিস্টেমকে সংকেত দেয়।
একইসঙ্গে এমনটি ক্যান্সার কোষের বেড়ে ওঠার রাসায়নিক সংকেতগুলোকেও বন্ধ করে দেয়। আরেকটি দারুণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, ক্যান্সার ভ্যাকসিন বা টিকা, যার অনেকগুলোই তৈরি হচ্ছে কোভিডের টিকায় ব্যবহৃত ‘এমআরএএনএ’ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে ক্যান্সারের ১০০টিরও বেশি ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বা পরীক্ষা চলছে, যা টিউমার ধ্বংস করার জন্য দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্বুদ্ধ করে।
অন্য কিছু থেরাপিতে সরাসরি রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোকেই কাজে লাগানো হয়। ২০১৮ সালে চিকিৎসকেরা এক নারীর ছড়িয়ে পড়া স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা করেছিলেন ভিন্ন এক পদ্ধতিতে।
তারা তার টিউমারের ভেতরে ঢুকে পড়া ইমিউন কোষগুলোকে দেহ থেকে সংগ্রহ করেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে সেসব কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে কোটি কোটি কোষে রূপান্তর করা হয় এবং সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিভিন্ন কোষকে আবার তার রক্তে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
আরেকটি পদ্ধতির নাম ‘কার-টি-সেল’ থেরাপি। এ পদ্ধতিতে রোগীর নিজের বিভিন্ন ইমিউন কোষকে ল্যাবরেটরিতে এমনভাবে নকশা বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করা হয়, যাতে এরা সুনির্দিষ্টভাবে ক্যান্সার কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে পারে।
গত মাসে, ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রের অভিনেতা স্যাম নিল বলেছেন, একটি ট্রায়ালের অংশ হিসেবে এ থেরাপি নেওয়ার পর তিনি এখন স্টেজ-৩ ব্লাড ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে ম্যানচেস্টার ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক ও লন্ডনের ‘ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউট’-এর ক্যান্সার ডায়নামিকস ল্যাবরেটরির প্রধান সামরা তুরাজলিচ বলেছেন, ক্যান্সার রোগটি সম্পর্কে এখন ধারণাই বদলে গেছে।
তার ভাষায়, “আমরা এখন ক্যান্সারকে এমন এক রোগ হিসেবে দেখছি, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। সত্যি বলতে, ক্যান্সার দেহে বাসা বাঁধতে পারার মানেই হচ্ছে শুরুতেই একে ধ্বংস করতে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছিল।”
এগুলো অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব?
ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির কাজ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া। তবে অন্য রোগের ক্ষেত্রে এ থেরাপির লক্ষ্য থাকে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতাকে কিছুটা শান্ত বা কমিয়ে রাখা।
এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণ অ্যালার্জির চিকিৎসা। যেমন, যাদের বাদাম বা ‘হে ফিভার’ অ্যালার্জির সমস্যা আছে তাদের দেহে অ্যালার্জি তৈরিকারী প্রোটিন খুব সামান্য পরিমাণে প্রবেশ করানো হয় এবং ধীরে ধীরে এর পরিমাণ বাড়ানো হয়, যাতে শরীর এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি চীনে হওয়া এক পরীক্ষায় ডিমের অ্যালার্জি কমানোর জন্য মানুষকে এক ধরনের প্যানকেক খেতে দেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা এখন পরীক্ষা করে দেখছেন, বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ইমিউনোথেরাপি দিয়ে আরও বেশ কিছু রোগের চিকিৎসা করা যায় কি না। এ সপ্তাহেই ব্রিস্টলের একদল গবেষক বলেছেন, তারা বাতের ব্যথার ওষুধ ‘টসিলিজুম্যাব’ বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের ওপর প্রয়োগ করেছেন।
পরীক্ষাটি খুব ছোট পরিসরে হওয়ায় এমনটা কতটা কার্যকর তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনও আসেনি। তবে রোগীদের বিষণ্নতা, ক্লান্তি, উদ্বেগ ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার ইতিবাচক আভাস দেখে গবেষকেরা বেশ আশাবাদী।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ইমিউনোথেরাপিগুলোর কিছু তৈরি হচ্ছে ‘রেগুলেটরি টি-সেল’ বা ‘ট্রেগস’-এর ওপর ভিত্তি করে, যার পেছনে রয়েছেন গত বছরের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী।
মানুষের দেহে ক্ষতিকর জীবাণুকে আক্রমণের জন্য অনেক ধরনের ইমিউন কোষ থাকে। তবে ‘ট্রেগস’ ব্যতিক্রমী। এর কাজ দেহের ওপর থেকে বিপদের হুমকি কেটে যাওয়ার পর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শান্ত করা বা যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেওয়া।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর ‘আইলা বায়োটেক’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আড্রিয়ান লিস্টন বর্তমানে ‘মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস’ রোগের জন্য ‘ট্রেগ’ থেরাপি তৈরি করছেন। এ রোগে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের স্নায়ুতন্ত্রকেই আক্রমণ করে বসে।
এ থেরাপির লক্ষ্য মস্তিষ্কে ট্রেগ কোষের সংখ্যা বাড়িয়ে সেই ভুল আক্রমণটি বন্ধ করা। তার মতে, একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরের ফোলা বা প্রদাহও কমানো সম্ভব।
চিকিৎসা শাস্ত্রে ‘ট্রেগস’-এর সম্ভাবনা অনেক। ডিমেনশিয়া ও টাইপ-১ ডায়াবেটিস, বাতের ব্যথা থেকে শুরু করে লুপাস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মতো অটোইমিউন রোগগুলোর চিকিৎসা এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
‘মোনাস ইউনিভার্সিটি’র পিটার এগেনহুইজেনের তৈরি এক থেরাপিতে ট্রেগস ব্যবহার করে ‘ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ’ বা পাকস্থলী ও অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা করা হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে অন্তত ৭০ লাখ মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে।
অধ্যাপক লিস্টন বলেছেন, “বিশ্বে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটে এমন সব কারণে, যার পেছনে কোনো না কোনোভাবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে।
“বয়স বেড়ে যাওয়া, অটোইমিউন রোগ, অ্যালার্জি, সংক্রামক রোগ বা ডায়াবেটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগ এসবকিছুর পেছনেই ইমিউন সিস্টেম জড়িয়ে আছে। তবে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে ভালো দিক, একে খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায়। আমরা একে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।”