Published : 16 Apr 2026, 01:01 PM
আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা তাদের ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযানে পৃথিবী ও চাঁদের যেসব অপূর্ব ছবি তুলেছেন, তার পেছনে ছিল নাসার প্রশিক্ষকদের বিশেষ ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ।
আধুনিক নিকন ক্যামেরা থেকে শুরু করে ‘লেইটেস্ট’ আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স ব্যবহারের মাধ্যমে নভোচারীরা মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে বিজ্ঞানের সঙ্গে নান্দনিকতার মিশেল ঘটিয়েছেন, যা বিশ্ববাসীকে চাঁদ ও পৃথিবীর অভাবনীয় ছবি দেখার অভিজ্ঞতা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
নাসার ফটোগ্রাফি ও ভিডিও প্রশিক্ষক পল রাইকার্ট ও ক্যাটরিনা উইলোবি বলেছেন, ১ এপ্রিল মিশনটি শুরু হওয়ার আগে তারা আর্টেমিস টু ক্রু সদস্যদের প্রায় ২০ ঘণ্টার বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
এ অভিযানের মাধ্যমেই দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী পর মানুষ আবারও চাঁদের আঙিনা ঘরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।
উইলোবি ও রাইকার্ট উভয়েই মর্যাদাপূর্ণ ‘রচেস্টার ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’র ‘ফটোগ্রাফিক সায়েন্সেস’ প্রোগ্রাম থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
উইলোবি বলেছেন, বেশিরভাগ মানুষই ক্যামেরা ব্যবহার করে মোটামুটি মানের ছবি তুলতে পারেন।
“তবে বৈজ্ঞানিক কাজের জন্য ‘মোটামুটি মানের’ ছবি আমাদের লক্ষ্য নয়।”

মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, তাদের প্রশিক্ষণের মধ্যে ভূমিতে থাকাবস্থায় করা কিছু বিশেষ অনুশীলনও ছিল। প্রশিক্ষণ নিতে অন্ধকার এক ঘরে ঝুলন্ত বড় আকারের কৃত্রিম চাঁদের গ্লোব ব্যবহৃত হয়েছিল এবং নভোচারীরা ওরিয়ন ক্যাপসুলের এক ডামি বা রেপ্লিকার ভেতর থেকে সেই চাঁদের ছবি তোলার চর্চা করেছিলেন।
এ মিশনের সাফল্যের পেছনে অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি ছিল কাজের জন্য সঠিক সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি বেছে নেওয়া।
২০১৬ সালে বাজারে আসা ‘নিকন ডি৫’ মডেলের ডিজিটাল ক্যামেরাটিই ছিল এ মিশনের প্রধান ভরসা।
রাইকার্ট বলেছেন, ক্যামেরাটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএসে অনেক বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ক্যামেরাটি প্রমাণ করেছে, মহাকাশের বিকিরণ ও অন্যান্য প্রতিকূল পরিবেশেও এটি কাজ করতে পারে।
“এ ক্যামেরা ব্যবহার করে আমাদের উৎক্ষেপণের অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা জানতাম, ক্যামেরাটি বিকিরণ সহ্য করতে পারে। কম করে হলেও মহাকাশ স্টেশনে কয়েক বছরের বিকিরণ ক্যামেরাটি অনায়াসেই সামলে নিয়েছে এবং এতে কোনো সমস্যাই হয়নি।”
‘নিকন ডি৫’ ক্যামেরার আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে অল্প আলোতেও এর চমৎকার ছবি তোলার সক্ষমতা। মহাকাশের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে স্পষ্ট ও নিখুঁত ছবি তোলার জন্য ক্যামেরাটি খুব জরুরি।
আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীদের ব্যবহৃত ক্যামেরার একটি আমাদের অনেকের কাছেই খুব পরিচিত। সেটি হচ্ছে, আইফোন।
উইলোবি বলেছেন, অ্যাপলের ‘আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স’ একদম শেষ মূহুর্তে আর্টেমিসের সরঞ্জামের তালিকায় যোগ হয়েছিল। হাতে ধরে সহজেই ছবি তোলা যায় বলে ফোনটি বেশ কার্যকর হলেও এ ফোনের ছবির ফাইলের আকার অনেক বড় হয়। ফলে, সেগুলো পৃথিবীতে পাঠানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
“মহাকাশযানে আমাদের একটি বিষয় নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হয় যে, বিভিন্ন ফাইল পৃথিবীতে পাঠানোর প্রক্রিয়াটি কেমন হবে? দুর্ভাগ্যবশত, মহাকাশে আমাদের ইন্টারনেটের গতি বা ব্যান্ডউইথ ততটা নেই। অথচ পৃথিবীর মানুষ এখন মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু পাঠিয়ে দিতে অভ্যস্ত।”

চমৎকার সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ
আর্টেমিস ক্রুদের তোলা সবচেয়ে চমৎকার ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছিল চাঁদের উল্টো পিঠ বা ‘ফার সাইড’ থেকে তোলা সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। সেই ছবিতে দেখা যায় চাঁদ সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলেছে এবং সেই কালো গোলকটির আশপাশে হালকা এক আভা খেলা করছে। সেই আভা এতই মৃদু ছিল যে, অন্ধকারের মধ্যে থেকেও দূরের বিভিন্ন তারার মিটিমিটি আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
ছবির তালিকায় আরও ছিল চাঁদের গর্তে ভরা দূরবর্তী অংশের সুক্ষ্ম সব দৃশ্য। সেইসঙ্গে ছিল এমন কিছু মুহূর্ত, যেখানে পৃথিবী থেকে রেকর্ড দূরত্বে থাকা নভোচারীদের চোখে আমাদের গ্রহটিকে অনেক ছোট দেখাচ্ছিল এবং চাঁদকে প্রদক্ষিণের সময় তাদের মনে হচ্ছিল পৃথিবীর যেন চন্দ্রদিগন্তে উদয় ও অস্ত ঘটছে।
৫০ বছরেরও বেশি সময় আগের অ্যাপোলো আমলের চন্দ্রাভিযানের তুলনায় আর্টেমিস টু মিশনের নভোচারীরা একটি বড় সুবিধা পেয়েছিলেন। ডিজিটাল ছবি তোলার পর পরই তা দেখে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন নভোচারীরা।
আগের দিনে ফিল্ম ব্যবহার করা হত, যা ডেভেলপ বা প্রসেস করে ছবি দেখতে অনেক সময় লাগত। তবে এখনকার ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।
এছাড়া, গোপ্রো অ্যাকশন ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের ফলে বর্তমানের সাধারণ মানুষ মহাকাশ অভিযানের বিভিন্ন দৃশ্য রিয়াল-টাইমে বা সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছে।
উইলোবি বলেছেন, ৬ এপ্রিল যখন মহাকাশযানটি চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল রুমে উপস্থিত সবার মধ্যে এক অভাবনীয় উত্তেজনা ও আনন্দ কাজ করছিল।
“এসব ছবি দেখানোর সময় কন্ট্রোল রুমের সামনের ও পেছনের সব সারির মানুষের মধ্যেই এক দারুণ উত্তেজনা কাজ করছিল। আমরা সবাই খুব রোমাঞ্চিত ছিলাম।”
‘নিকন ডি৫’ ছাড়াও ক্রু সদস্যরা একটি ‘নিকন জেড৯ মিররলেস’ ক্যামেরা ও বেশ কয়েকটি লেন্স ব্যবহার করেছিলেন। এসব লেন্সের মধ্যে ছিল ১৪ থেকে ২৪ মিলিমিটার ওয়াইড, ৮০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার টেলিফটো ও একটি স্ট্যান্ডার্ড ৩৫ মিলিমিটার লেন্স।