Published : 05 Feb 2026, 10:39 AM
প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতে এক নীরব পরিবর্তনের ঢেউ শুরু হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে নারী কর্মীদের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও অটোমেশনের কারণে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন– এমনই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।
যুক্তরাজ্যের ‘সিটি অফ লন্ডন কর্পোরেশন’-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা খাতে কর্মরত পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় এআই ও অটোমেশনের কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে বেশি আছেন নারীরা। পাশাপাশি ‘কঠোর নিয়োগ প্রক্রিয়ার’ কারণে অভিজ্ঞ নারীরাও কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাওয়ালা ‘মিড-ক্যারিয়ার’ বা কর্মজীবনের মাঝপথে থাকা নারীরা প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন ডিজিটাল পদগুলোতে অবহেলার শিকার হচ্ছেন। এসব খাতে এমনিতেই নারীদের অংশগ্রহণ কম।
লন্ডনের বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা ‘স্কয়ার মাইল’ পরিচালনাকারী এ সংস্থাটি বলেছে, নারী আবেদনকারীরা এমন এক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, যেখানে সিভি বাছাইয়ের সময় কঠোর ও অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার কারণে তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। এসব সিস্টেম সন্তান লালন-পালন বা পরিবারের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ক্যারিয়ার গ্যাপ’ বা কর্মবিরতিকে ইতিবাচকভাবে দেখে না বা তাদের পেশাদার অভিজ্ঞতাকে খুব সংকীর্ণভাবে বিচার করছে।
এ পরিস্থিতি বদলাতে নিয়োগকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটি বলেছে, তারা যেন বর্তমান নারী কর্মীদের নতুন কারিগরি দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করেন, বিশেষ করে যেসব নারী দাপ্তরিক বা ক্লারিক্যাল পদে আছেন তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ অটোমেশনের ফলে এসব পদই সবচেয়ে বেশি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তথ্য অনুসারে, আগামী এক দশকে প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা খাতের প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার দাপ্তরিক পদ অটোমেশনের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, যার বড় একটি অংশই নারী। তবে এসব কর্মীকে ছাঁটাই না করে নতুন দক্ষতা শেখালে কোম্পানিগুলোর প্রায় ৭৫ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ বা ছাঁটাই বাবদ খরচ সাশ্রয় হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখালে নিয়োগকর্তারা প্রার্থীর অতীত অভিজ্ঞতার চেয়ে তাদের আগামীর সম্ভাবনার ওপর বেশি নজর দিতে পারবেন।
তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রতি বছর প্রায় ৬০ হাজার নারী পদোন্নতির অভাব, অবমূল্যায়ন ও পর্যাপ্ত বেতন না পাওয়ার কারণে প্রযুক্তি খাতের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন।
সিটি অফ লন্ডন-এর মেয়র ডেম সুসান ল্যাংলি বলেছেন, “কর্মীদের পেছনে বিনিয়োগ ও তাদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তার মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা বিশাল এক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং আরও শক্তিশালী ও সহনশীল দল গঠন করতে পারবেন।
“মেধা, অভিযোজন সক্ষমতা ও সুযোগের ওপর গুরুত্ব দিলে যুক্তরাজ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বজায় রাখতে পারবে এবং ডিজিটাল উৎকর্ষের গ্লোবাল হাব হিসেবে টিকে থাকবে।”
আন্তর্জাতিক রিক্রুটমেন্ট কোম্পানি ‘র্যান্ডস্ট্যাড’-এর এক জরিপ অনুসারে, যুক্তরাজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী শঙ্কিত যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে তাদের চাকরি হারাতে হতে পারে। এমন অবস্থায় বিভিন্ন কোম্পানিকে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা।
‘সিটি অফ লন্ডন কর্পোরেশন’-এর তথ্যমতে, এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে একদিকে দক্ষ কর্মীর অভাবে ২০২৪ সালে এই খাতে ১২ হাজারের বেশি ডিজিটাল পদ শূন্য পড়ে ছিল, অন্যদিকে যোগ্য নারী প্রার্থীদের অবহেলা করা হচ্ছিল।
কর্মী সংকট মেটাতে বিভিন্ন কোম্পানি জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি বেতন দিয়ে কর্মী আগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, কেবল বেতন বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
‘ডিজিটাল ট্যালেন্ট গ্যাপ’ বা দক্ষ কর্মীর অভাব অন্তত ২০৩৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এমনটি হলে প্রায় ১০ হাজার কোটি পাউন্ডের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হারাবে যুক্তরাজ্য।