এই ৫ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ এনভিডিয়ার হাতে
অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানির মতো অধিগ্রহণ করা কোম্পানিকে আলাদা সত্তা হিসেবে চালিয়ে যাওয়ার বদলে এনভিডিয়া সেগুলোকে নিজেদের মূল কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গীভূত করেছে।
এনভিডিয়া নামটি শুনলেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে উন্নত মানের গেইমিং গ্রাফিক্স কার্ড তৈরির শীর্ষ এক কোম্পানির ছবি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ডেটা সেন্টার জায়ান্ট এনভিডিয়া।
২০২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুসারে, কোম্পানিটির মোট ২১ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার রাজস্বের মধ্যে গেইমিং খাতের অবদান ছিল কেবল ৭ শতাংশের কাছাকাছি।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানি হিসেবে এনভিডিয়ার বাজারমূল্য ৫.১ থেকে ৫.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা গুগল, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন বা মেটার মতো টেক জায়ান্টদের চেয়েও বেশি বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
অন্যান্য বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মতো অধিগ্রহণ করা কোম্পানিকে আলাদা সত্তা হিসেবে চালিয়ে যাওয়ার বদলে এনভিডিয়া সাধারণত সেগুলোকে নিজেদের মূল কাঠামোর সঙ্গে একেবারে অঙ্গীভূত করেছে।
মেটার অধীনে ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ যেমন স্বতন্ত্র সত্তা ধরে রেখেছে এনভিডিয়ার অধিগ্রহণ করা বিভিন্ন কোম্পানির ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। ফলে বড় চুক্তি হলেও এগুলো মানুষের চোখের আড়ালেই থেকেছে। এমনই অধিগ্রহণ ছিল ‘মেলানক্স টেকনোলজিস’।
মেলানক্স টেকনোলজিস অধিগ্রহণ
২০২০ সালের শুরুতে মেলানক্সকে কিনেছে এনভিডিয়া। এই চুক্তির ওপর ভর করেই এনভিডিয়া কেবল দ্রুতগতির গ্রাফিক্স কার্ড বিক্রেতা কোম্পানি থেকে এক লাফেই ডেটা সেন্টার খাতের টেক জায়ান্টে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, একটি গ্রাফিক্স কার্ড নির্মাতা কোম্পানির সঙ্গে মেলানক্সের মতো হাই-এন্ড নেটওয়ার্কিং কোম্পানির সম্পর্ক কী?
এআইভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন তৈরি ও চালনার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব প্রসেসরের (জিপিইউ) ভূমিকা কেমন ও এসব জিপিইউ থেকে উৎপাদিত বিপুল ডেটা সার্ভারগুলোর মধ্যে কীভাবে আদান-প্রদান হবে তা এনভিডিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন।
জটিল এআই কাজ সমাধানের মতো শক্তিশালী জিপিইউ এনভিডিয়ার হাতে থাকলেও সেই ডেটা দ্রুত আদান-প্রদানের মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো তাদের ছিল না। ঠিক এই জায়গাতেই সক্ষম ছিল মেলানক্স।
কোম্পানিটি ‘ইনফিনিব্যান্ড’ নামের একটি উচ্চ ব্যান্ডউইথ ও কম ল্যাটেন্সির নেটওয়ার্ক প্রোটোকল তৈরি করেছিল, যা সার্ভার, ডেটা সেন্টার ও উচ্চসক্ষমতাওয়ালা কম্পিউটার সিস্টেমে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত, যা ছিল প্রযুক্তির এক লাভজনক ক্ষেত্র।
ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টারগুলোতে এআই প্রযুক্তির জটিল বিভিন্ন অনুরোধ প্রক্রিয়াকরণে মেলানক্সের আধুনিক নেটওয়ার্ক প্রোটোকলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে ২০২০ সালে ৬৯০ কোটি ডলারে কোম্পানিটি কিনেছে এনভিডিয়া।
অধিগ্রহণের কিছুদিন আগে মেলানক্সের বার্ষিক রাজস্ব ছিল প্রায় ১৩০ কোটি ডলার। ২০২৬ সালে এসে প্রধানত মেলানক্সের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এনভিডিয়ার নিজস্ব নেটওয়ার্কিং বিভাগের রাজস্বই ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
এর মধ্যে কেবল এক প্রান্তিক থেকেই এসেছে ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে নেটওয়ার্কিং খাতের প্রচলিত জায়ান্ট সিসকো ও আরিস্টা নেটওয়ার্কসকেও ছাড়িয়ে গেছে এনভিডিয়া।
রান:এআই
২০২৪ সালে এনভিডিয়া ‘রান:এআই’ অধিগ্রহণ করেছে। এ সময় রান:এআই ছিল নতুন একটি স্টার্টআপ, যা ২০১৮ সালে ‘তেল আবিব ইউনিভার্সিটি’র দুই প্রকৌশল শিক্ষার্থী ওমরি গেলার ও রোনেন দার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
জিপিইউচালিত এআই কাজের জন্য তৈরি এন্টারপ্রাইজ-গ্রেড সফটওয়্যার ও ভার্চুয়ালাইজেশন প্ল্যাটফর্মের জন্য পরিচিতি পায় স্টার্টআপটি, যা বিভিন্ন কোম্পানিকে তাদের ব্যবহৃত জিপিইউ রিসোর্স বণ্টন করতে সাহায্য করে।
যেসব কোম্পানি এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেয় তাদের জিপিইউ সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। তবে সব এআই কাজ সমান রিসোর্স ব্যবহার করে না। যেমন, একটি বড় এআই ট্রেনিং কাজের তুলনায় একটি ‘ডিব্যাগিং’ বা ত্রুটি সংশোধনের অনুরোধে খুব সামান্য জিপিইউ সক্ষমতা লাগে।
এখানেই কাজ করে রান:এআই-এর প্ল্যাটফর্ম। তাদের টুলটি নিশ্চিত করে যেন ছোটখাটো কাজের পেছনে মূল্যবান জিপিইউ সক্ষমতার অপচয় না ঘটে। প্রতিটি কাজের চাহিদা অনুসারে ঠিক ততটুকুই জিপিইউ বরাদ্দ দিয়ে এটা অপেক্ষাকৃত জটিল প্রক্রিয়ার জন্য বড় কম্পিউটিং সক্ষমতা খালি রাখে।
রান:এআই কেনার মাধ্যমে এনভিডিয়া এমন এক প্রযুক্তি নিজেদের দখলে নিয়েছে, যা তাদের কর্পোরেট গ্রাহকদের বড় জিপিইউ ফ্ল্যাট খুব সহজে পরিচালনা করতে সাহায্য করে।
এতে করে বর্তমানে থাকা হার্ডওয়্যার দিয়েই আগের চেয়ে বেশি এআই কাজ করা সম্ভব হয়। অধিগ্রহণের পর রান:এআই’কে নতুন করে এনভিডিয়ার নিজস্ব পণ্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়, যা এনভিডিয়ার ওয়েবসাইটে তাদের ডেডিকেটেড রান:এআই পোর্টালে দৃশ্যমান।
এক্সেলরো
কেবল দুই বছরের ব্যবধানে এনভিডিয়ার অধিগ্রহণ করা দ্বিতীয় ইসরায়েলি স্টার্টআপ ছিল রান:এআই। এর আগে ২০২২ সালে এনভিডিয়া ‘এক্সেলরো’ কেনে এবং এর অধিগ্রহণের গল্পটিও রান:এআই-এর মতোই।
এক্সেলরো তাদের ‘এনভিমেশ’ সফটওয়্যারের জন্য পরিচিত ছিল, যা একাধিক কম্পিউটারকে উচ্চগতির ‘এনভিএমই’ স্টোরেজ ড্রাইভ শেয়ার করার সুযোগ দিত।
এটা বিভিন্ন কোম্পানিকে তাদের স্টোরেজ সম্পদ একত্র করতে ও চাহিদা অনুসারে প্রয়োজনীয় ডেটা সহজে ব্যবহারের উপযোগী করতে সাহায্য করত।
সুবিধাটি এআই ও হাই-পারফর্মেন্স কম্পিউটিংয়ের মতো জটিল অ্যাপ্লিকেশনের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর ছিল, যেখানে খুব দ্রুত বিপুল পরিমাণ ডেটা অ্যাক্সেস করার প্রয়োজন পড়ে।
২০২২ সালে কেনার বেশ আগেই এক্সেলরোর প্রতি নজর পড়ে এনভিডিয়ার এবং কোম্পানিটির সঙ্গে কয়েক বছর ঘনিষ্ঠভাবে কাজও করেছিল তারা।
অধিগ্রহণের পর এক্সেলরোর ইঞ্জিনিয়ারিং টিম ও প্রযুক্তি নিজেদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে এনভিডিয়া।
এর মাধ্যমে এক্সেলরোর স্টোরেজ প্রযুক্তি এবং হাই-পারফর্মেন্স স্টোরেজ ও নেটওয়ার্কিং বিশেষজ্ঞদের শক্তিশালী এক টিমের মালিকানা পায় এনভিডিয়া।
নিজেদের ডেটা-সেন্টার প্রসেসরের জন্য তৈরি সফটওয়্যারসহ এন্টারপ্রাইজ, এআই ও এইচপিসি সফটওয়্যারে এ অভিজ্ঞতা যোগের পরিকল্পনা করে কোম্পানিটি।
অন্যান্য অধিকাংশ অধিগ্রহণের মতো এক্সেলরোও আর স্বাধীনভাবে টিকে নেই। এর টিম ও পণ্যগুলো এখন এনভিডিয়ার অফারিংয়ের সঙ্গে একীভূত।
ডিপম্যাপ
২০২১ সালে এনভিডিয়া ‘ডিপম্যাপ’ অধিগ্রহণ করে। প্রথম দর্শনে এটাকে সাধারণ এক ম্যাপিং বা মানচিত্র তৈরির কোম্পানি মনে হলেও মানুষের ব্যবহারের মানচিত্রের বদলে ডিপম্যাপের মূল মনোযোগ ছিল চালকবিহীন যানবাহনের দিকে।
চালকবিহীন গাড়ির চলাচলের জন্য সাধারণ মানচিত্রের চেয়ে বেশি ও সূক্ষ্ম তথ্যের প্রয়োজন হয়। যেমন, একদম সেন্টিমিটার স্কেলে লেন ও রাস্তার সীমানা, ট্রাফিক লাইট, সাইনবোর্ড ও অন্যান্য বস্তুর সঠিক অবস্থান।
পাশাপাশি এসব মানচিত্রকে সর্বদা আপডেটেড থাকতে ও রাস্তার যে কোনো পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে হয়।
বিশেষ সেন্সরওয়ালা যানবাহনের সাহায্যে বিস্তারিত মানচিত্র তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিল ডিপম্যাপ।
অধিগ্রহণের পর এনভিডিয়া এ প্রযুক্তিকে তাদের বিস্তৃত অটোনমাস ড্রাইভিং প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করে, যা ২০২২ সালে ‘এনভিডিয়া ড্রাইভ ম্যাপ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
শক্তিশালী এআই চিপ দিয়েই যে চালকবিহীন গাড়ি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় সেই দূরদর্শিতা থেকেই এনভিডিয়া ডিপম্যাপকে অধিগ্রহণ করেছিল। কারণ এই ধরনের যানবাহনের জন্য বিশ্বের নিখুঁত ও আপডেটেড চিত্র প্রয়োজন, যা জোগাতে ডিপম্যাপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য কোম্পানির মতোই ডিপম্যাপের টিম ও প্রযুক্তি এখন এনভিডিয়ার মূল কর্পোরেট কাঠামোর অংশ।
হাগিং ফেইস
২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এনভিডিয়ার সঙ্গে যোগ হওয়া সাম্প্রতিক কোম্পানি হল হাগিং ফেইস। ১ হাজার ২৩০ কোটি ডলারেপ্ল্যাটফর্মটি অধিগ্রহণ করে প্রযুক্তি জায়ান্টটি, যা এনভিডিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় চুক্তি।
স্ক্র্যাচ থেকে নতুন এআই মডেল তৈরির বদলে ডেভেলপার ও গবেষকদের সহজে এআই মডেল খুঁজে পেতে, শেয়ার, পরিবর্তন ও প্রয়োগ করতে সাহায্য করে হাগিং ফেইস।
লাখ লাখ এআই মডেল ও ডেটাসেটের আশ্রয়স্থল এই প্ল্যাটফর্ম বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ডেভেলপার ও কোম্পানি কাছে জনপ্রিয়।
গ্রাফিক্স কার্ডের গণ্ডি পেরিয়ে এখন এনভিডিয়া যে ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলেছে তাতে হাগিং ফেইস মূল্যবান সংযোজন।
২০২৬ সালে এসে এনভিডিয়া কেবল এআই সিস্টেমের চালিকাশক্তি জিপিইউ তৈরি করছে না, বরং তারা নেটওয়ার্কিং হার্ডওয়্যার, এআই সফটওয়্যার এবং এআই তৈরি ও চালনার প্রয়োজনীয় টুলও সরবরাহ করছে।
হাগিং ফেইস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বড় এআই ডেভেলপার কমিউনিটির সরাসরি নাগাল পেয়েছে এনভিডিয়া। ফলে এআই তৈরির প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও এআই মডেল তৈরির মূল কর্মশালা দুটোই এখন কার্যকরভাবে তাদের হাতে।
অধিগ্রহণের পরও হাগিং ফেইস যথারীতি তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এনভিডিয়া তাদের এআই ও প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে এই প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে একীভূত করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
