০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

নির্বাচনী জুয়ায় মাস্কের হার: ঝুঁকিতে গোটা এআই ও প্রযুক্তি সাম্রাজ্য

ভরাডুবির ফলে কংগ্রেসে মাস্কের মিত্রের সংখ্যা এখন নামমাত্র, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর কঠোর তদন্ত ঝুলিয়ে দিতে পারে।

নির্বাচনী জুয়ায় মাস্কের হার: ঝুঁকিতে গোটা এআই ও প্রযুক্তি সাম্রাজ্য

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছেন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 11:20 AM

Updated : 05 Nov 2026, 11:19 AM

ইলন মাস্কের রেকর্ড অংকের নির্বাচনী জুয়া শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবির মধ্য দিয়ে প্রমাণ হল, ধনকুবেরদের রাজনৈতিক প্রভাব ও ঋণনির্ভর এআই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রযুক্তি মিত্রদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জোরালো বিরোধিতার ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও ঋণনির্ভর ডেটা সেন্টার নির্মাণ কার্যক্রম এখন কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

সংবাদমাধ্যমটির ‘ক্যাম্পেইন ফাইন্যান্স’ রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছেন মাস্ক। যার মধ্যে কেবল টেক্সাসেই তিনি ঢেলেছিলেন ২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা তার মোট নির্বাচনী খরচের প্রায় অর্ধেক।

তবে ডেমোক্রেটিক ঝড়ে মাস্কের সমর্থিত দুই হেভিওয়েট প্রার্থী রিপাবলিকান সেনেট মনোনীত প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন।

Image

রিপাবলিকানদের ব্যবসাবান্ধব নীতির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে ফুলেফেঁপে ওঠা স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের দরপতন ঘটেছে। ছবি: রয়টার্স

এই অপ্রত্যাশিত পরাজয় রাতারাতি শেয়ারবাজারে আলোড়ন তুলেছে। অ্যাবটের ব্যবসাবান্ধব নীতির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে ফুলেফেঁপে ওঠা স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারে দরপতন ঘটেছে।

পাশাপাশি ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সার্বিক প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন শেয়ারও বড় চাপের মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভোটাররা ধনকুবেরদের প্রভাব ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারা এআই শিল্পের কড়া সমালোচকদের বিজয়ী করার পাশাপাশি এর প্রসারে সহায়ক ডেটা সেন্টারগুলোর ওপর নানা বিধিনিষেধ অনুমোদন করেছেন।

বিজয়ী ডেমোক্রেটিক সেনেটর জেমস তাড়ারিকো তার বিজয় ভাষণে মাস্কের নাম উল্লেখ না করেই বলেছেন, “আমাদের রাজনীতি থেকে বড় অংকের অর্থ সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে কোনো ট্রিলিয়নেয়ার আমাদের নির্বাচন কিনে নিতে না পারে।

“আমাদের এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা বর্তমানে কেবল শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষেরই উপকারে আসে, একে ঢেলে সাজাতে হবে।”

মাস্কের বিপুল ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে জার্মান ‘মার্শাল ফান্ড’-এর ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো জে. সি. লিন্ডজেনিক বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফলের মানে হল ‘ট্রাম্পের বলয়ে মাস্কের যে প্রভাব তৈরি হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে বাতিল হয়েছে’।

টেক্সাস বর্তমানে মাস্কের সাম্রাজ্যের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।

Image

টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা খোদ মাস্কের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

অস্টিনের বাইরে টেসলা তাদের সবচেয়ে বড় মার্কিন কারখানা পরিচালনা করছে। দক্ষিণ টেক্সাসের স্টারবেইস কমপ্লেক্স থেকে স্পেসএক্সের রকেট উৎক্ষেপণ এবং মাস্ক এআই ও চিপ উৎপাদনেও নতুন বিনিয়োগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এসব কার্যক্রম বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অবকাঠামো ও কর প্রণোদনার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে অঙ্গরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্রেটিক গভর্নর জিনা হিনোজোসা কর ভর্তুকি ও খোদ মাস্কের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন। ফলে মাস্কের ব্যবসায়িক বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর তিনি প্রভাব ফেলবেন।

হিনোজোসা নতুন ডেটা সেন্টারের ওপর স্থগিতাদেশ, শিল্প খাতের কর ছাড় বাতিল ও ডেভেলপারদের তাদের সম্পূর্ণ বিদ্যুতের খরচ নিজেদের বহন করার দাবি জানিয়েছেন।

মঙ্গলবারের বিজয় ভাষণে তিনি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা ‘সেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার’ শপথ নেন যারা আরামের সঙ্গেই অঙ্গরাজ্যটি পরিচালনা করেছেন।

অঙ্গরাজ্য আইনসভা এখনও রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় হিনোসার পক্ষে নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনা বেশ কঠিন হবে। তবে লাইসেন্স দেওয়া ও ব্যবসায়িক প্রণোদনার ক্ষেত্রে তার প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেওয়ায় মাস্কের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বেশ জটিলতার মুখে পড়তে পারে।

Image

নির্বাচনে মোটা অংকের অর্থ ঢেলে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা মাস্কের জন্য এবারই প্রথম নয়। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বড় ধরনের পরাজয়

‘ফেডারেল ইলেকশন কমিশন’ বা এফইসি নথি অনুসারে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশজুড়ে মোট ৪৪টি ফেডারেল প্রতিযোগিতায় মাস্কের গঠিত ‘আমেরিকা প্যাক’ প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল।

তবে বুধবার সকালের মধ্যে দেখা যায়, তাদের সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থীরা ২৯টি আসনেই পরাজিত হয়েছেন ও জয় পেয়েছেন মাত্র তিনটিতে, যেখানে ১২টি আসনের ফল এখনও অঘোষিত, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৩ শতাংশের বেশি বা ৮ কোটি ডলারের বেশি গেছে হেরে যাওয়া প্রার্থীদের পেছনে।

এ ভরাডুবির ফলে ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে মাস্কের মিত্রের সংখ্যা এখন নামমাত্র, যা তার ফেডারেল চুক্তি, ট্রাম্প সরকারের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’তে তার অতীতের ভূমিকা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর কঠোর তদন্ত ঝুলিয়ে দিতে পারে।

কংগ্রেসের বাড়তি নজরদারির কারণে স্পেসএক্সের দ্রুত বাড়তে থাকা বিভিন্ন সরকারি চুক্তির গতিও ধীর হয়ে যেতে পারে।

তবে কার্যনির্বাহী সংস্থাগুলোর মূল নিয়ন্ত্রণ এখনও ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে এবং তার ভিটো দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে, যা মাস্কের ডিফেন্স-টেক ব্যবসার সুবিধা দেয় এমন নীতিগুলো বাতিলের ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটদের ক্ষমতাকে সীমিত রাখবে।

নির্বাচনে মোটা অংকের অর্থ ঢেলে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা মাস্কের জন্য এবারই প্রথম নয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘আমেরিকা প্যাক’ কংগ্রেসের যে আটজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিল, তারা সবাই হেরেছিলেন। গেল বছর উইসকনসিনে একজন রিপাবলিকান প্রার্থীকে জেতাতে ২ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছিলেন মাস্ক, সেই প্রার্থীও পরাজিত হন।

গত বছর রাজনীতিতে ‘অনেক কম’ খরচ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাস্ক। তবে বাস্তবে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত দাতা হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

টেসলার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারী রন ব্যারন ২০২৫ সালের মার্চে সতর্ক করে বলেছিলেন, মাস্কের এই রাজনৈতিক সক্রিয়তা গ্রাহকদের দূরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

“যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শত্রু বানিয়ে ফেলা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”

তবে অন্যান্য অনেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও রেগুলেশন থেকে শুরু করে পেন্টাগনের প্রযুক্তি বাজেট বরাদ্দের ওপর তার প্রভাবকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছিলেন।

প্রযুক্তি খাতের বিরুদ্ধে গণজোয়ার

বিপুল অর্থ ঢেলে বিপাকে পড়া একমাত্র প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব মাস্ক নন।

এফইসি’র নথি অনুসারে, এআই নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করা ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ নামের এক রাজনৈতিক সংস্থাকে আড়াই কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিলেন ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান ও তার স্ত্রী অ্যানা।

এ ছাড়া, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ‘অ্যান্ড্রেসেন হোরোউইৎস’ সেখানে আরও ৫ কোটি ডলার দিয়েছে।

কঠোর এআই সুরক্ষানীতির সমর্থক নিউ ইয়র্কের আইনপ্রণেতা অ্যালেক্স বোরেসকে ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসের প্রাইমারিতে পরাজিত করার মতো কিছু সাফল্য প্রযুক্তি খাত পেলেও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মন জয় করা তাদের জন্য কঠিন।

ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেট শ্যারড ব্রাউন রিপাবলিকান সেনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন ডেটা সেন্টারের প্রতি তার অন্ধ সমর্থনের বিষয়টি সামনে এনে।

‘অ্যাডইমপ্যাক্ট’-এর তথ্যমতে, ডেটা সেন্টারের কঠোর সমালোচনা করে নির্মাণ করা বিজ্ঞাপনে ডেমোক্রেটরা প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।

পাশাপাশি, সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্রেট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্রেহামকে পরাজিত করেন। সেখানে নতুন তৈরি হওয়া ডেটা সেন্টার শিল্পের সুপার প্যাক ‘বিল্ডিং দ্য ফিউচার’ তাদের প্রথম সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে গ্রেহামের সমর্থনে ১৫ লাখ ডলারের বিজ্ঞাপন বুক করেছিল।

অন্যদিকে, বিজয়ী প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ নতুন ডেটা সেন্টারের ওপর দুই বছরের স্থগিতাদেশ দেওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

অ্যাডইমপ্যাক্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারণামূলক গোষ্ঠী ও বাইরের সংগঠনগুলো ডেটা সেন্টার সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের পেছনে ১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে, যার প্রায় পুরোটাই ছিল নেতিবাচক প্রচার।

এই ব্যয়ের মধ্যে ১৪ কোটি ডলার এসেছে ডেমোক্র্যাটিক বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে। মঙ্গলবার ভোটাররা স্থানীয় পর্যায়ে ডেটা সেন্টার সংক্রান্ত ৪১টি প্রস্তাব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ১০টি এলাকায় এগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে রায় দেওয়া হয়েছে।

এই সংকটের ফলে প্রযুক্তি খাতে আর্থিক ঝুঁকি এখন আকাশচুম্বী।

‘জেপিমরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর অনুমান অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে, যার মধ্যে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার আসবে ইনভেস্টমেন্ট-গ্রেড ঋণ বাজার থেকে।

তবে ডেটা সেন্টারের মতো বিভিন্ন প্রকল্প পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত আয় নিশ্চিত করা যায় না। লাইসেন্স পেতে দেরি হলে প্রকল্পের কাজ ও রাজস্ব আয় পিছিয়ে যায়।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও ঋণের চড়া খরচের কারণে সার্বিক ব্যয় বেড়ে গিয়ে কাঙ্খিত মুনাফা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।