Published : 03 Mar 2026, 12:08 PM
জার্মানিতে আবিষ্কৃত ৪০ হাজার বছরের পুরানো কিছু নিদর্শনে এমন কিছু রহস্যময় চিহ্নের খোঁজ মিলেছে, যা আধুনিক লিখন পদ্ধতির আদি রূপ বা পূর্বসূরি হতে পারে বলে দাবি গবেষকদের।
রয়টার্স লিখেছে, ১৯৭৯ সালে জার্মানির এক গুহায় ‘অ্যাডোর্যান্ট ফিগারিন’ নামের ছোট এক বস্তু পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপে বসতি গড়া আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তৈরি করেছিলেন। হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি এ মূর্তিতে মানুষ ও সিংহের মিশ্র রূপ ফুটে উঠেছে এবং এর গায়ে বেশ কিছু রহস্যময় খাঁজ ও বিন্দুর সারি রয়েছে। এ একই সংস্কৃতির তৈরি আরও অনেক বস্তুতেও এমন চিহ্ন মিলেছে।
নতুন গবেষণা বলছে, এসব চিহ্ন কোনো পূর্ণাঙ্গ লিখিত ভাষা নয়। তবে এর চিহ্নগুলো যেভাবে ক্রমানুসারে ব্যবহৃত হয়েছে এর সঙ্গে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় উদ্ভূত একটি লিপির মিল রয়েছে। সেই লিপিটি ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখন পদ্ধতি ‘কিউনিফর্ম’-এর পূর্বসূরি।
যার মানে, সেই প্রাচীন মানুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এসব নিদর্শন এমন এক সময়ের, যখন মানুষের পূর্বপুরুষরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেই যাযাবর শিকারি দলগুলো পথিমধ্যে মানুষের নিকটাত্মীয় ‘নিয়ান্ডারথাল’দের মুখোমুখিও হয়েছিল।
গবেষকরা এসব চিহ্ন, যেমন খাঁজ, বিন্দু, রেখা, ক্রস বা তারকা চিহ্নকে ‘সাইন টাইপ’ বা চিহ্নের ধরন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসব চিহ্নের ‘ইনফরমেশন ডেনসিটি’ বা তথ্যের ঘনত্ব যাচাইয়ের জন্য গাণিতিক বিশ্লেষণ চালিয়েছেন তারা।
তথ্যের ঘনত্ব বলতে বোঝায় কোনো এক নির্দিষ্ট ভাষা বা চিহ্নের মাধ্যমে কতটুকু তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব তা, যেমন একটি বিশেষ চিহ্নের মাধ্যমে কতটুকু বার্তা দেওয়া হয়েছে এমনসব বিষয়।
জার্মানির ‘সারল্যান্ড ইউনিভার্সিটি’র ভাষাবিদ ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ক্রিশ্চিয়ান বেনজ বলেছেন, ‘আমাদের যুক্তি, এসব চিহ্নের ক্রম কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে সুন্দর দেখানোর জন্য করা কোনো সাজসজ্জা নয়, বরং আমাদের গাণিতিক বিভিন্ন ফলাফলে দেখা গেছে, এসব চিহ্ন সচেতনভাবে ও নির্দিষ্ট নিয়ম বা প্রথা মেনে ব্যবহৃত হয়েছিল।”

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ।
গবেষণায় উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ক্রস চিহ্নগুলো কেবল হাতিয়ার ও পশুর মূর্তিতে মিলেছে। তবে মানুষের মূর্তিতে এমন চিহ্ন দেখা যায়নি।
গবেষকরা প্রায় ৪৩ হাজার থেকে ৩৪ হাজার বছর আগের ২০০টিরও বেশি প্রস্তর যুগের নিদর্শন বিশ্লেষণ করেছেন। এসব বস্তুতে বিশেষ চিহ্ন খোদাই করা রয়েছে এবং এগুলো দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির চারটি গুহা থেকে মিলেছে, যা ‘অরিগনেসিয়ান’ নামের প্রাচীন সংস্কৃতির একটি অংশ।
‘অ্যাডোর্যান্ট ফিগারিন’ বা মূর্তিখানি জার্মানির বাডেন-ওয়ার্টেমবার্গ রাজ্যের গাইসেনক্লোস্টারলে গুহা থেকে পাওয়া গেছে, যেটি কেবল ১.৫ ইঞ্চি লম্বা ও আধা ইঞ্চি চওড়া।
ভাষাবিদ বেনজ বলেছেন, “নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর গায়ে কেবল নির্দিষ্ট ধরনের চিহ্ন খোদাই করার এ রীতিটি অবশ্যই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এসেছিল। এমনটি না হলে আমাদের সংগৃহীত তথ্যে এই সুশৃঙ্খল গাণিতিক ধরন বা প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যেত না।”
গবেষকদের লক্ষ্য এসব চিহ্নের মানে উদ্ধার করা নয়। এর মানে, আজও রহস্যই রয়ে গেছে।
‘অরিগনেসিয়ান’ সংস্কৃতি বিশ্বের প্রাচীনতম কিছু শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত। গবেষণায় বিশ্লেষণ করা এসব নিদর্শনের বেশিরভাগই ম্যামথের দাঁত দিয়ে তৈরি, তবে কিছু পশুর হাড় এবং শিং থেকেও তৈরি হয়েছে।
এসব মূর্তির মধ্যে ম্যামথ, গুহা সিংহ ও ঘোড়ার পাশাপাশি এমন কিছু জীবও ছিল, যেগুলোতে মানুষ ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিভিন্ন সরঞ্জাম, ব্যক্তিগত অলঙ্কার ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রও রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, তাদের বিশ্লেষণ করা এসব চিহ্নের ক্রমগুলো গাণিতিকভাবে আধুনিক লিখন পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন। এসব চিহ্নের ক্রমগুলোর তথ্যের ঘনত্ব প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার উরুক শহরের ‘প্রোটো কিউনিফর্ম’ নামের লিপির প্রাথমিক নিদর্শনের সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। এ প্রোটো কিউনিফর্ম থেকেই পরবর্তীতে ‘কিউনিফর্ম’ বা প্রাচীন কীলকাকার লিপির উদ্ভব হয়েছিল, যা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে হাজার বছর ধরে প্রচলিত ছিল।
এসব অরিগনেসিয়ান চিহ্নে লিখিত ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত রয়েছে, বিশেষ করে মানুষের মৌখিক ভাষার কাঠামোর সঙ্গে এসব চিহ্নের কোনো সরাসরি সংযোগ মেলেনি।
বার্লিনের ‘মিউজিয়াম অফ প্রিহিস্টোরি অ্যান্ড আর্লি হিস্ট্রি’র প্রত্নতত্ত্ববিদ ও এ গবেষণার সহ লেখক ইভা ডুটকিউইচ বলেছেন, “সে সময়কার মৌখিক ভাষাগুলোর অবস্থা কেমন ছিল তা নিয়ে আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি।
“তবে সাধারণ অর্থে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভাষাবিদরা নিশ্চিতভাবেই ধরে নেন, ৪০ হাজার বছর আগের আধুনিক মানুষদের মৌখিক ভাষার কাঠামো আজকের যুগে পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষাগুলোর মতোই ছিল।”