Published : 16 Jun 2026, 05:07 PM
প্রবীণ বা হৃদরোগে আক্রান্ত প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করার সময় ব্যবহারকারীর সাধের হেডফোনটি এবার হয়ত দূরে সরিয়ে রাখতে হতে পারে।
কারণ, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, স্মার্টফোন ও এয়ারপডসের মতো গ্যাজেট থেকে নির্গত চৌম্বক ক্ষেত্র হার্টের পেসমেকার বা ডিফিব্রিলেটরের মতো জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকলাপে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
ফলে পরের বার কেউ যখন দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে দেখতে যাবেন তখন হয়ত হেডফোনটি একটু দূরেই সরিয়ে রাখাই ভাল হবে বলে প্রদিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
স্মার্টফোন, হেডফোন ও অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের দেহে থাকা ‘কার্ডিওভাসকুলার ইমপ্লান্টএবল ডিভাইস’ বা সিআইডি’র জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।
এসব উদ্বেগের মূল কারণ এ ধরনের ডিভাইস থেকে নির্গত চৌম্বক ক্ষেত্র, যা অসাবধানতাবশত ডিফিব্রিলেটর ও পেসমেকারের মতো সংবেদনশীল যন্ত্রগুলোতে ‘ম্যাগনেট-সেইফ মোড’ বা নিরাপত্তা মোড সচল করে দিতে পারে। এমনটা হলে এসব যন্ত্র রোগীর হৃদকম্পনের অস্বাভাবিক দ্রুত গতি বা হার্টের অন্যান্য অনিয়ম শনাক্ত করতে ব্যর্থ হতে পারে।
আধুনিক বিভিন্ন সিআইডি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে এমআরআইয়ের মতো উচ্চ চৌম্বকীয় চিকিৎসাকালীন প্রক্রিয়ার সময় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ নিরাপত্তা মোডে চলে যায়।
চৌম্বক ক্ষেত্রটি সরিয়ে নেওয়ার পর এসব ডিভাইস আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার কথা। তবে সাময়িক এ গোলযোগও রোগীর জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যাদের হৃৎপিণ্ড এখনও এমন ‘বায়োনিক’ বা কৃত্রিম যন্ত্রনির্ভর হয়ে ওঠেনি তাদের জন্য সাধারণত ১০ গাউস বা তার চেয়ে বেশি সক্ষমতার চৌম্বকীয় আবেশ ক্ষেত্রের সংস্পর্শে এলেই সিআইডি যন্ত্রগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ম্যাগনেট মোডে’ চলে যায়।
যেমন, পাম বিচ ভ্রমণ থেকে কারো আনা ফ্রিজের স্মারক চুম্বকটি সম্ভবত প্রায় ১০০ গাউস সক্ষমতার চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। সিআইডি প্রথম ডিজাইনের সময় তা তুলনামূলক সহজেই সামলানো যেত।
তবে বর্তমানে নিত্যব্যবহার্য ইলেকট্রনিক্সে ছোট আকৃতির ‘রেয়ার-আর্থ’ বা শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বকের ব্যাপক ব্যবহার চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসব ইমপ্লান্টের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
স্মার্ট ডিভাইসগুলো সিআইডির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বিজ্ঞানীরা এখন তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করতে শুরু করেছেন।
২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাপলের এয়ারপডসের চৌম্বক ক্ষেত্র এতটাই শক্তিশালী যে তা হৃৎপিণ্ডে প্রতিস্থাপিত কার্ডিওভাসকুলার ডিভাইসের ম্যাগনেট মোডকে সচল করে দিতে পারে।
‘সার্কুলেশন: অ্যারিথমিয়া অ্যান্ড ইলেক্ট্রোফিজিওলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, এয়ারপডস, আইফোন ১২ প্রো ম্যাক্স, অ্যাপল পেন্সিল ও মাইক্রোসফট সারফেস পেনের মতো ডিভাইসগুলোর চৌম্বক ক্ষেত্র ডিফিব্রিলেটর, পেসমেকার ও অন্যান্য সিআইডির স্বাভাবিক কার্যকলাপে বিঘ্ন ঘটায়।
গবেষণার এসব ফলাফল মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ ও ইসিগারেট বা ভেপের মতো অন্যান্য সমসাময়িক ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্ষেত্রেও একই রকম ঝুঁকির দেখা গেছে।
তবে মনে রাখা জরুরি, এসব গবেষণার মানে এই নয় যে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনোভাবেই এয়ারপডস ব্যবহার করতে পারবেন না। রোগীকে সবসময় নিজের কার্ডিওলজিস্ট বা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
পাশাপাশি অ্যাপলের নিজস্ব সহায়তা পেইজে গাইডলাইনও রয়েছে, যেখানে গ্রাহকদের এয়ারপডস ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস তাদের হার্টের ডিভাইস থেকে অন্তত ৬ ইঞ্চি দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে অ্যাপল।
কেউ হয়ত তার দাদি বা নানির বুকের স্পন্দন শোনার সময় কানে এয়ারপডস গুঁজে ফুল ভলিউমে গান শুনতে পারবেন না। তবে এয়ারপডস ব্যবহারকারী প্রবীণদের জন্য কোনো চরম বিপদের ঘণ্টা নয়।
অন্যদিকে, সিআইডি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছে মার্কিন ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন’ বা এফডিএ।
প্রথমত, এসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস সবসময় সিআইডি থেকে অন্তত ছয় ইঞ্চি দূরে রাখুন। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের স্মার্টফোন ও এয়ারপডস সামনের শার্টের পকেটে রাখা থেকে দূরে থাকবেন।
বর্তমানের শার্টের পকেটে গ্যাজেট রাখার ফ্যাশন বেশ জনপ্রিয় হলেও নিজের পেসমেকারের সেটিংস যেন ভুলবশত ওলটপালট না হয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে ওয়ারড্রোব বা পোশাকের ধরন থেকে এ ফ্যাশনটি বাদ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।