Published : 02 May 2026, 11:51 AM
কোনো আগ্নেয়গিরি ১০ হাজার বছর শান্ত থাকলেই একে বিলুপ্ত বলা যায় না, বরং এরও বেশি সময় সুপ্ত থেকেও তা পুনরায় জেগে উঠতে পারে– গ্রিসের মেথানা আগ্নেয়গিরি বিশ্লেষণ করে এমনই বলছেন বিজ্ঞানীরা।
তাদের দাবি, দীর্ঘ নীরবতার সময়টিতে আসলে ভূগর্ভে ম্যাগমা জমা হয়ে ভবিষ্যতে বড় অগ্নুৎপাতের প্রস্তুতি চালায়।
রয়টার্স লিখেছে, আগ্নেয়গিরির ছায়ায় বসবাসকারী মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের নীরবতা মনে হতে পারে, এ ভূতাত্ত্বিক দানবটি কেবল ঘুমিয়েই নেই বরং চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
তবে গ্রিসের অ্যাথেন্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেথানা আগ্নেয়গিরির জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে করা নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, একটি আগ্নেয়গিরি পুনরায় জেগে ওঠার আগে ১ লাখ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
প্রচলিত ধারণায়, কোনো আগ্নেয়গিরি ১০ হাজার বছর ধরে অগ্নুৎপাত না করলে একে ‘বিলুপ্ত’ বলা যায়।
বিজ্ঞানীরা মেথানার সাত লাখ বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে বলছেন, এর অগ্নুৎপাতগুলোর মধ্যে দীর্ঘ সময়ের বিরতি রয়েছে। মেথানার দীর্ঘতম শান্ত সময়টি ছিল প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার বছর আগে পর্যন্ত।
আর এ দীর্ঘ নীরবতা বিলুপ্তির লক্ষণ ছিল না, বরং তা ছিল ভূগর্ভে অনেক পরিমাণে ম্যাগমা বা গলিত পাথর জমা হওয়ার একটি পর্যায়।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ইটিএইচ জুরিখের আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপা বলেছেন, “মেথানার এ দীর্ঘ শান্ত সময়টি প্রাগৈতিহাসিক যুগে ঘটেছিল। ফলে, আমরা শিলা ও খনিজে সংরক্ষিত রাসায়নিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এর ইতিহাস সাজাচ্ছি।
“মেথানার নিচে আসলে কী ঘটেছিল তা বুঝতে হলে আমাদের আগ্নেয়গিরিটিকে এক হিমশৈলের চূড়া হিসেবে কল্পনা করতে হবে। কারণ মাটির ওপরে আমরা এর সামান্য অংশই দেখতে পাই, যেখানে এর আগ্নেয় ব্যবস্থার বেশিরভাগ অংশই ভূগর্ভে লুকিয়ে রয়েছে।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
পৃথিবী কয়েকটি স্তরে গঠিত, যার মধ্যে মানুষ যে বহিরাবরণে বাস করে সেটি ভূত্বক ও এর ঠিক নিচেই রয়েছে ম্যান্টল, যেখানে ম্যাগমা তৈরি হয়। বর্ধিত ম্যাগমা যখন ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠগুলোকে ভরিয়ে ফেলে এবং উপচে পড়া অংশ পৃষ্ঠের দিকে ঠেলে দেয় তখনই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটে।
অন্যদিকে, ম্যাগমার সরবরাহ না থাকলে আগ্নেয়গিরিগুলো শান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিভে যায়।
পোপা বলেছেন, “আমরা এখন খুঁজে পেয়েছি সাবডাকশন জোনে (যেখানে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায়) থাকা বিভিন্ন আগ্নেয়গিরি তখনও শান্ত থাকতে পারে যখন ম্যান্টলে অনেক ম্যাগমা তৈরি হয়।
“তবে এখানে একটি টুইস্ট আছে; এসব ম্যাগমা ‘সুপার-হাইড্রোস’ বা জলীয়সমৃদ্ধ। ফলে আগ্নেয়গিরিটি মরে যায় না, বরং সতেজ থাকে এবং দীর্ঘ সময় কেবল ঘুমিয়ে কাটায়।”
‘সুপার-হাইড্রোস’ ম্যাগমা পানিওয়ালা হয় এবং এসব ম্যাগমাই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে।
পোপা বলেছেন, “এ ম্যাগমা যখন ভূত্বক দিয়ে ওপরের দিকে ওঠে তখন তা কোনো কার্বোনেটেড পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকসের মতো বুদবুদ তৈরি করতে শুরু করে। এ গ্যাসীয় বুদবুদ স্ফটিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে, যা ম্যাগমাকে আঠালো ও ঘন করে তোলে। ফলে এর গতি একশ থেকে এক হাজার গুণ পর্যন্ত কমে যায় এবং এতটাই অলস হয়ে পড়ে যে ভূপৃষ্ঠের দিকে আর এগোতে পারে না।”
এ কারণে ম্যাগমাগুলো সেখানেই আটকা পড়ে যায় বলে উল্লেখ করেছেন পোপা।
“যেহেতু ম্যাগমা চেম্বার সেসব বাড়তি উপাদান বের করে দিতে পারে না। ফলে কোনো অগ্নুৎপাত ঘটে না। এ কারণে সেই জলাধারে স্ফটিকাকার ও আঠালো ম্যাগমা জমতে থাকে, যা আগ্নেয়গিরিটিকে আকারে বড় হতে সাহায্য করে।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনটি আরও বড় ও শক্তিশালী অগ্নুৎপাতের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য গবেষকরা আগ্নেয় শিলা থেকে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি জিরকন খনিজ স্ফটিকের বয়স নির্ধারণ করেছেন।
এক্ষেত্রে যেখানে জিরকন পাওয়া যায়নি সেখানে তারা ইলমেনাইটের মতো অন্যান্য খনিজ ব্যবহার করেছেন যাতে আগ্নেয়গিরির শান্ত সময়েও ম্যাগমা চেম্বারের গতিবিধি ট্র্যাক করা যায়।
পোপা বলেছেন, এ ধরনের ‘নীরব’ ম্যাগমা জমার বিষয়টি সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।
“গভীর স্তরে ম্যাগমা জমা হওয়ার ফলে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়, যা আমাদের অনুভবের জন্য ক্ষুদ্র হলেও সিসমোমিটার তা সহজেই রেকর্ড করতে পারে। মাটির উপরিভাগ বছরে কেবল কয়েক সেন্টিমিটার ফুলে উঠতে পারে, যা স্যাটেলাইট ও জিপিএস দিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব।
মেথানা গ্রিসের রাজধানীর খুব কাছাকাছি অবস্থিত হলেও পোপা বলেছেন, এ মুহূর্তে আগ্নেয়গিরিটি বড় ধরনের কোনো বিপদের কারণ হবে না। ভবিষ্যতে কোনো অগ্নুৎপাত হলেও তা সম্ভবত অতীতে দেখা যাওয়া সাধারণ লাভা প্রবাহের মতোই হবে।
তবে তিনি বলেছেন, এ প্রক্রিয়াটি আগের ধারণার চেয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে। গ্রিস, ইতালি, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং জাপানের মতো অঞ্চলগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে নিস্ক্রিয় মনে হওয়া অনেক আগ্নেয়গিরি হয়ত এখনও মাটির নিচে ম্যাগমা চেম্বার তৈরি করে চলেছে।
বিজ্ঞানীরা এখন ‘রোমানিয়ার ইস্টার্ন কার্পাথিয়ানস’ এর ‘সিওমাডুল’ আগ্নেয়গিরি নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করছেন। এ আগ্নেয়গিরিটি প্রায় ৩০ হাজার বছর ধরে শান্ত থাকলেও এর ভূগর্ভে এখনও সক্রিয় ম্যাগমা চেম্বার থাকতে পারে।
পোপা বলেছেন, “আমাদের সমাজের জন্য বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, আগ্নেয়গিরির ক্ষেত্রে শান্ত থাকার মানেই সবসময় নিরাপদ হওয়া নয়।”