Published : 24 Aug 2025, 07:09 PM
ইনটেলে প্রায় নয়শ কোটি ডলারের সরকারি বিনিয়োগ এনে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর বিনিময়ে কোম্পানিটির ৯.৯ শতাংশের মালিকানা পাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই অর্থ মূলত ফেডারেল ফান্ডিং আইনের অধীনে ইনটেলের পাওয়ারই কথা ছিল। তবে এই অর্থ কোম্পানিটির চিপ তৈরির ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট সহায়তা নয়।
ইনটেলের প্রয়োজন এখন নিজেদের তথাকথিত সর্বাধুনিক ‘১৪এ’ নামের চিপ বানানোর জন্য বাইরের কোম্পানির অর্ডার, যা স্বল্পমেয়াদে বা এখনই পাওয়া কঠিন কাজ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
এ বছরের মার্চে নতুন সিইও হিসাবে কোম্পানিটির দায়িত্ব নিয়েছেন লিপ বু ট্যান। গত মাসে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বড় কোনো গ্রাহক না পেলে কোম্পানিটির হয়ত নিজেদের চিপ তৈরির চুক্তিভিত্তিক কাজ ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি বলেছেন, “ভবিষ্যতে ইনটেল ১৪এ চিপ প্রযুক্তিতে আমরা কেবল তখনই বিনিয়োগ করব যখন গ্রাহকরা আগাম অর্ডার দেবেন। অন্যথায় এই পথে আমরা হাঁটব না।”
ট্যানের বার্তার অর্থনৈতিক যুক্তি তুলে ধরে ‘সামিট ইনসাইটস’-এর বিশ্লেষক কিন্নগাই চ্যান বলেছেন, “ইনটেলের ১৮এ ও ১৪এ চিপ প্রযুক্তি নিয়ে উৎপাদনে যেতে হলে তাদের অবশ্যই যথেষ্ট পরিমাণে অর্ডার নিশ্চিত করতে হবে। তবেই তাদের ফাউন্ড্রি ব্যবসাটি টিকে থাকতে পারবে।
“আমাদের মনে হয় না যে, সরকারের কোনো ধরনের বিনিয়োগ ইনটেলের ফাউন্ড্রি ব্যবসার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারবে, যদি না তারা যথেষ্ট সংখ্যক গ্রাহক জোগাড় করতে পারে।”
রয়টার্স লিখেছে, একসময় আমেরিকান চিপশিল্পের গর্ব হিসেবে পরিচিত ছিল এ কোম্পানিটি। তবে বছরের পর বছর ব্যবস্থাপনার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পিছিয়ে পড়েছে ইনটেল। উৎপাদনে কোম্পানিটি নেতৃত্ব হারিয়েছে তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা টিএসএমসি’র কাছে এবং এআই চিপ প্রতিযোগিতায় আরেক মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়ার থেকেও পিছিয়ে পড়েছে তারা।
এখন সংকটের মুখে পড়া ইনটেলকে প্রমাণ করতে হবে, উন্নত প্রযুক্তির চিপ তৈরি করতে পারে তারা, যাতে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা যায়। রয়টার্স লিখেছে, ইনটেলের বর্তমানে ব্যবহৃত ১৮এ চিপ, যেটি ১৪এ এর থেকে কম উন্নত তা উৎপাদনে সমস্যার মুখে পড়েছে কোম্পানিটি, বিশেষ করে ‘ইল্ড’ বা চিপের কার্যকর হার কম হওয়ার কারণে।
বড় চিপ নির্মাতা বিভিন্ন কোম্পানি, যেমন টিএসএমসি বা অ্যাপলের মতো বড় গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করার সময় প্রাথমিক ধাপে কম চিপ উৎপাদন থেকে হওয়া ক্ষতিকে মেনে নেয় এবং নিজেরাই সেই খরচ বহন করে।
তবে ইনটেলের জন্য বিষয়টি কঠিন, কারণ টানা ছয় প্রান্তিকে নিট ক্ষতির মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটি। এমন অবস্থায় ইনটেলের জন্য উৎপাদন ক্ষতির খরচ সামলানো ও লাভ করা একসঙ্গে সম্ভব নয়।
ইনটেল শেয়ারে বিনিয়োগ করা ‘জাবেলি ফান্ডস’-এর বিশ্লেষক রিউতা মাকিনো বলেছেন, “যদি উৎপাদনের সাফল্য কাঙ্ক্ষিত মানের না হয় তবে নতুন গ্রাহকরা ইনটেল ফাউন্ড্রি ব্যবহার করবে না। এতে কোম্পানির প্রযুক্তিগত সমস্যারও সমাধান হবে না।”
মাকিনো বিশ্বাস করেন, ইনটেল শেষ পর্যন্ত চিপ উৎপাদনে কাঙ্ক্ষত মান অর্জন করতে পারবে। তবে এ চুক্তিকে ইনটেলের জন্য নেতিবাচক হিসাবেই দেখছেন তিনি।
তার মতে, বাইডেন প্রশাসনের সময় যে ‘চিপ অ্যাক্ট’-এর অধীনে ইনটেলকে সরাসরি অর্থ দেওয়ার কথা ছিল, এই নতুন চুক্তির চেয়ে বরং ওই অর্থ পাওয়াই ইনটেলের জন্য বেশি ভালো হত।
মাকিনো বলেছেন, “বিনামূল্যে দেওয়া অর্থ নয় এটি। ইনটেল যে অর্থ পাচ্ছে তা কেবল অনুদান নয় বা কোনো শর্ত ছাড়া দিচ্ছে না সরকার। এর বিনিময়ে শেয়ার ছাড়তে হচ্ছে ও কিছু দায়ও নিতে হচ্ছে কোম্পানিটিকে।”
ইনটেল বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে কোনো আসন নেবে না এবং শেয়ারহোল্ডার অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে– এমন বিষয়ে কোম্পানির পর্ষদের সঙ্গে একমত হয়ে ভোট দেবে। তবে এ ভোট চুক্তির কিছু ‘সীমিত ব্যতিক্রম’ রয়েছে। এ ছাড়া, সরকার ইনটেলের শেয়ার পাচ্ছে শুক্রবারের বাজারমূল্যের চেয়ে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়ে, অর্থাৎ কম দামে।
এ বিনিয়োগের ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইনটেলের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হয়ে উঠবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা ইনটেল কেউই এই লেনদেন কবে সম্পন্ন হবে তা প্রকাশ করেননি বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

সরকারের শেয়ার কেনার খবর প্রকাশের পর শুক্রবার ইনটেলের শেয়ারমূল্য পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত জানানো হলে পরে শেয়ার মূল্য এক শতাংশ কমেও যায়।
এ বছর এখন পর্যন্ত ইনটেলের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ, যার পেছনে সিইও লিপ বু ট্যানের ঘোষণা করা বড় রকমের কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
মার্কিন সরকারের সহায়তা প্রদানে আগ্রহ সামান্য কমেছে
এ বিনিয়োগটি যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট খাতে হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ ব্যতিক্রমী হস্তক্ষেপের এমন এক উদাহরণ, যা দেশটির ভেতরে উৎপাদন বাড়ানো ও চাকরির বাজার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সাহায্য।
এর আগে ট্যানের চীনা বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে ‘অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করে তার পদত্যাগ দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তবে কিছুদিন পরেই নিজের মত বদলান তিনি। আর এরপরই ইনটেলে মার্কিন সরকারের বিনিয়োগের খবর এল বলে প্রতিদবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, সরকারি সহায়তা পেলে বিশেষ করে নতুন কারখানা নির্মাণে লাভবান হতে পারে ইনটেল।
কোম্পানিটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের কারখানা সম্প্রসারণে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে তারা এবং আশা করছে এ বছরের শেষ নাগাদ নিজেদের অ্যারিজোনা কারখানায় বড় আকারে চিপ উৎপাদন শুরু হবে তাদের।
‘চেজ ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল’-এর প্রেসিডেন্ট পিটার টাজ বলেছেন, “এমন অর্থায়নের ব্যবস্থা পাওয়া ও একজন নতুন অংশীদার পাওয়া, বিশেষ করে যিনি আপনার সফলতা দেখতে চান– এ দুটো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।”
এক বিবৃতিতে ইনটেল বলেছে, সরকারের আটশ ৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি এখন পর্যন্ত দুইশো ২০ কোটি ডলারের অনুদান পেয়েছে তারা। ফলে তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার একশ ১০ কোটি ডলারে।
‘ক্রেডিটসাইটস’-এর সিনিয়র বিশ্লেষক অ্যান্ডি লি বলেছেন, “একদিকে সরকারের শেয়ার অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে ইনটেল ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ প্রতিষ্ঠান, যাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে, অনেকেই উদ্বিগ্ন যে এর ফলে কোম্পানির পরিচালনায় সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে, যা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা ও কাজের সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
“এক্ষেত্রে কোম্পানিটি অতিরিক্ত কোনো সরকারি তহবিল পাচ্ছে না… যা থেকে ইঙ্গিত মেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা প্রদানে আগ্রহ সামান্য কমেছে।”
এদিকে, ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, “আমেরিকার জন্য এক চমৎকার চুক্তি এটি এবং একইসঙ্গে ইনটেলের জন্যও বড় সুযোগ। উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরি করে ইনটেল, যা আমাদের দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”