Published : 09 Dec 2025, 02:20 PM
মানুষ শহরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করলেও আমাদের দেহের গল্প একেবারেই আলাদা বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ জুরিখ’-এর বিবর্তন নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক কলিন শ এবং ‘লাফবোরো ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ড্যানিয়েল লংম্যান-এর নতুন গবেষণা বলছে, মানব বিবর্তনের চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়েছে আধুনিক জীবন।
তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানের অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ক্রমাগত মানসিক চাপ মূলত মানুষের বিবর্তনের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও আমাদের বর্তমান পরিবেশের মধ্যে গভীর ‘অমিলের’ কারণে তৈরি হচ্ছে।
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘বায়োলজিক্যাল রিভিউস’-এ।
কয়েক হাজার বছর ধরে শিকারী-সংগ্রাহক হিসেবে জীবনযাপন করেছে মানুষ। ওই সময় জীবনযাপন শারীরিকভাবে কঠোর হলেও তা গাছপালা, খোলা মাঠ, নির্মল বাতাস, সূর্যের আলো ও ঋতুভিত্তিক ছন্দে ভরা আনন্দময় এক প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটত।
চাপ বা স্ট্রেস থাকলেও তা সেই সময়ের জন্য অল্পই ছিল। কখনো কোনো বন্য প্রাণী হাজির হয়ে মানুষের মধ্যে ভয় ও অ্যাড্রিনালিন তৈরি করত। তবে বিপদ চলে গেলে শরীর আবার শান্ত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
সেই তুলনায় আধুনিক জীবন একেবারেই আলাদা। গত কয়েক শত বছরে মানুষ এমন শিল্পায়িত সমাজ গড়ে তুলেছে, যা ভরে গেছে শোরগোল, স্থায়ী আলো, দূষণ, রাসায়নিক, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্লাস্টিক, যানজট, ফোনের স্ক্রিন ও দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকায়।
এ ধরনের পরিবর্তন বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব দ্রুত ঘটেছে। আমাদের পরিবেশ দ্রুত বদলেছে। তবে প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে আমাদের দেহ।
সমস্যা হচ্ছে, আমাদের শরীর এখনও মানসিক চাপের প্রতি প্রাচীনভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায় বা সাড়া দেয়। কেউ জোরালো যানজটের শব্দ শুনলে, কাজের চাপের মুখোমুখি হলে বা সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত তথ্যে আতকে উঠলে তখন শরীর এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় যেন কোনো বিপজ্জনক প্রাণীর মুখে পড়েছে।
এ চাপের কারণে দেহে হরমোন নিঃসৃত হয় এবং স্নায়ুতন্ত্র অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় চলে আসে। তবে বনের সিংহ অবশেষে চলে গেলেও সেই ধরনের মুক্তি আধুনিক জীবনে নেই। আধুনিক জীবনে প্রকৃত বিশ্রামের সময় মেলে না। মাস ও বছরের পর মাস এই ধারাবাহিক জীবনযাপনের উত্তেজনা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
গবেষক শ ও লংম্যান বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, এ ‘অমিল’ আমাদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের নানা দেশে নারীদের প্রজনন সক্ষমতা কমছে এবং মানবদেহে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ, যেমন অটোইমিউন সমস্যার প্রকোপ বেড়েছে।
চোখে পড়ার মতো উদাহরণ হচ্ছে ১৯৫০-এর পর থেকে বিশ্বজুড়ে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমেছে। এই প্রবণতাকে পরিবেশগত কারণ, যেমন– কীটনাশক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক এবং খাদ্য ও পানির দূষণের সঙ্গে মিলিয়েছেন গবেষকরা।
বিবর্তনের পরিভাষায় কোনো স্বাস্থ্যবান প্রজাতি হচ্ছে যারা ঠিকভাবে বাঁচতে ও সফলভাবে প্রজনন করতে পারে। আধুনিক সমাজ মানুষকে অনেক আরাম, চিকিৎসা সুবিধা ও দীর্ঘায়ু দিলেও গবেষকরা বলছেন, আমাদের কিছু বড় সাফল্য আসলে চুপিসারে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মস্তিষ্ক, শরীর ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
মানুষ সহজে এ সমস্যা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। কারণ জৈবিক পরিবর্তনে হাজার হাজার বছর লাগে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের পরিবেশকে আমাদের শরীরের উপযোগী করে সাজাতে হবে। যেমন– প্রাকৃতিক জায়গা রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করা, ঘরের বাইরে আরও সময় কাটানো এবং এমন শহর তৈরি করা, যা নির্মল বাতাস, সবুজ জায়গা, শান্ত এলাকা এবং আরও প্রাকৃতিক আলো দিয়ে মানুষের সুস্থতার খেয়াল রাখবে।
পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান কীভাবে হার্টের গতি, রক্তচাপ ও দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে তা বোঝার মাধ্যমে শহর পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পথ দেখাতে পারেন গবেষকরা।
গবেষণার মূল বার্তাটি আসলে সহজ। আধুনিক জীবনে সুস্থ থাকতে মানুষকে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গেই পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যার জন্য আমাদের দেহ বিবর্তিত হয়েছে।