Published : 03 Jul 2026, 04:41 PM
স্মার্টফোন থেকে শুরু করে শক্তিশালী ডেটা সেন্টার সব আধুনিক প্রযুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা ডিভাইসের অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া। এ সমস্যার এক বৈপ্লবিক সমাধান নিয়ে এসেছেন গবেষকরা।
এখন ডায়মন্ড বা হীরা দিয়ে নকশা করা এক বিশেষ সারফেস বা উপরিভাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা, যা ইলেকট্রনিক ডিভাইসকে ঠান্ডা রাখার সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, ল্যাবে শখের বসে তৈরি করা হীরা দিয়ে সাজানো একটি পেঁচা থেকে এ পদ্ধতি উদ্ভাবনের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন গবেষকরা।
হীরা পৃথিবীর অন্যতম সেরা তাপ পরিবাহী পদার্থ। যার মানে, হীরা খুব দ্রুত ও কার্যকরভাবে সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ থেকে তাপ শুষে নিয়ে বাইরে বের করে দিতে পারে।
এ গুণের কারণে হীরা উন্নত রেডার সিস্টেম, ফাইভজি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হার্ডওয়্যারের মতো উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা ইলেকট্রনিক্স ঠান্ডা রাখার জন্য একদম আদর্শ। তবে সমস্যা হচ্ছে, হীরা অত্যন্ত শক্ত পদার্থ। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে একে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া বা বিভিন্ন ডিভাইসের সঙ্গে যোগ করা কঠিন কাজ।
এ ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানী শিয়াং ঝাং ও অধ্যাপক পুলিকেল অজায়ানের নেতৃত্বে একটি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে ‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র গবেষণা দলটি, যেখানে একটি আস্ত হীরার স্তরকে কেটে নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার বদলে হয়। এটি ধীর ও জটিল প্রক্রিয়া।
শুরু থেকেই হীরাকে সরাসরি নির্দিষ্ট নকশা বা প্যাটার্নে বড় করেছেন গবেষকরা। এ ‘বটম আপ’ পদ্ধতিতে পরমাণুর পর পরমাণু সাজিয়ে উপাদানটি তৈরি হয়, যার ফলে বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন হীরাটি কোথায় তৈরি হবে ও কীভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
তাদের এ পদ্ধতিতে ‘মাইক্রোওয়েভ প্লাজমা কেমিক্যাল ভ্যাপার ডিপোজিশন’ ব্যবহৃত হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে কার্বনওয়ালা গ্যাসকে অতি উত্তপ্ত প্লাজমায় রূপান্তর করে।
এ পরিবেশে বিভিন্ন কার্বন পরমাণু বৃষ্টির মতো একটি তলের ওপর ঝরে পড়ে এবং হীরা বা ডায়মন্ড ক্রিস্টালে পরিণত হয়। তবে এসব ক্রিস্টাল বড় হওয়ার জন্য ‘সিড’ বা বীজের মতো ক্ষুদ্র কিছু শুরুর বিন্দু প্রয়োজন।
গবেষকরা এ কাজটির জন্য ‘ন্যানোডায়মন্ড’ বা হীরার অতি ক্ষুদ্র কণা ব্যবহার করেছেন। হীরা ঠিক কোথায় বড় হবে তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে গবেষক দলটি দুটি ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।
ছোট ও সূক্ষ্ম নকশার জন্য ‘ফটোলিথোগ্রাফি’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। এ প্রযুক্তি চিপ তৈরির কারখানায় ব্যবহৃত হয়, যেখানে আলোর সাহায্যে কোনো তলের ওপর অত্যন্ত নিখুঁত নকশা তৈরি করা যায়।
আরেকটি হচ্ছে লেজার কাটিং, যেখানে তুলনামূলক বড় জায়গার জন্য লেজার দিয়ে কাটা এক বিশেষ ফিল্ম ব্যবহার করেছেন গবেষকরা।
অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন অংশ সরিয়ে ফেলার পর বাকি থাকা ছাঁচটিই পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে, যা নির্ধারণ করে দেয় হীরাটি ঠিক কোথায় তৈরি হবে।
এ পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকরা দুই ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া ওয়েফার বা এক ধরনের পাতলা স্তরের ওপর সফলভাবে নকশা করা হীরার স্তর তৈরি করতে পেরেছেন। কতগুলো সিড ব্যবহার করা হবে তা পরিবর্তন করে প্রতিটি নকশার ভেতরে হীরার ক্রিস্টালের আকার এবং গঠনও নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।
পরীক্ষায় উঠে এসেছে, হীরার এ প্রলেপ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এ বড় এক সাফল্য, যা বিভিন্ন ডিভাইসকে আরও দ্রুত কাজ করতে ও দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করবে।
তাপমাত্রা কম থাকার মানে, যন্ত্রাংশ কম ক্ষয় হবে, কর্মসক্ষমতা বাড়বে ও ডিভাইসটি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হবে। বৈজ্ঞানিক এক শিল্পকর্ম হিসেবে এ প্রকল্পের শুরু হওয়াটা প্রমাণ করে, সৃজনশীলতা কীভাবে অপ্রত্যাশিতভাবে উদ্ভাবনের পথ দেখাতে পারে।
রাইস ইউনিভার্সিটির মাসকট হিসেবে হীরা দিয়ে তৈরি পেঁচার সূক্ষ্ম আকৃতি তৈরির প্রচেষ্টা থেকে যা শুরু হয়েছিল তা এখন আধুনিক প্রযুক্তির তাপ নিয়ন্ত্রণের এক বাস্তব সমাধানে পরিণত হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এ পদ্ধতিটি সিলিকন ও গ্যালিয়াম নাইট্রাইডের মতো ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব, যা উচ্চ সক্ষমতাওয়ালা ডিভাইসে সচরাচর দেখা যায়।
এর পরবর্তী ধাপ হচ্ছে, কীভাবে হীরার এসব স্তরকে অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে আরও উন্নতভাবে যোগ করা যায়, যাতে সেগুলো আগামী প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টরে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিষয়টি সফল হলে এ প্রযুক্তি আরও শীতল, দ্রুতগতি ও টেকসই ইলেকট্রনিক্সের পথ খুলে দেবে, যা মানুষের ব্যক্তিগত গ্যাজেট থেকে শুরু করে বড় কম্পিউটার সিস্টেম পর্যন্ত সবকিছুর কর্মসক্ষমতা ডিজিটাল যুগের ক্রমাগত চাহিদা অনুসারে বাড়িয়ে তুলবে।