Published : 11 Jul 2026, 02:48 PM
‘নাসার সাবেক বিজ্ঞানীদের তৈরি’ ও ‘কেবল ৯০ সেকেন্ডে ঘর ঠান্ডা করার’ দাবি নিয়ে অনলাইনে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ভুয়া পোর্টেবল এসি।
বিবিসি লিখেছে, ফেইসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া এসব চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদ থেকে ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞাপনের মান নিয়ন্ত্রণকারী একটি সংগঠন।
‘অ্যাডভারটাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি’ বা এএসএ নামের সংগঠনটি এখন সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছে, এসব পণ্যের কার্যকারিতার দাবি প্রায়শই ‘বাস্তবের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে বলা ও অবিশ্বাস্য’।
অনলাইন দুনিয়ায় এ চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদ ধরতে এগিয়ে এসেছেন স্টুয়ার্ট ম্যাথিউস নামের এক ইউটিউবার। এজন্য তিনি নিজের ‘প্রোপার ডিআইওয়াই’ চ্যানেলে পরীক্ষার জন্য এ ধরনের বেশ কয়েকটি ডিভাইস কিনেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ম্যাথিউস বলেছেন, একটি যন্ত্রের পেছনে ৭০ পাউন্ড খরচ করার পরও দেখা গেল তা আসলে ‘ছোট ও সাধারণ একটি ফ্যান, যার বাজারমূল্য কেবল কয়েক পাউন্ড হতে পারে’।
বিতর্কিত এসব বিজ্ঞাপনের বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা ও ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব।
এএসএ বলেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অনলাইনে তারা যেসব বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণ করেছে সেগুলোতে অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলা হয়েছে, একটি ছোট ডিভাইস কেবল কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো বাড়ি ঠান্ডা করে ফেলতে পারে বা তা চালাতে সামান্য বিদ্যুৎ খরচ হয়।
সংগঠনটি বলেছে, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এসব বিজ্ঞাপনে বেশিরভাগই ভুয়া গ্রাহক রিভিউ বা মতামত ব্যবহৃত হচ্ছে। সেসব ভুয়া রিভিউতে ঘরোয়া তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়া বা যন্ত্রটির অসাধারণ ও অলৌকিক কার্যসক্ষমতার বিবরণ দেওয়া থাকে, যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই।
এসব বিজ্ঞাপন ক্রেতাদের এমন কিছু ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়, যেখানে এসব ডিভাইস সাধারণত ৭০ থেকে ১২০ পাউন্ডের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে।
বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব বিজ্ঞাপনের বড় অংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’দিয়ে তৈরি। ডিভাইসগুলোকে প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক বেশি উন্নত ও আকর্ষণীয় দেখাতে বিজ্ঞাপনে তামার কয়েল ও ধাতব বক্সের মতো ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্য উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।
পোর্টেবল এয়ার কন্ডিশনারের কোনো বিজ্ঞাপন বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া কি না তা সাধারণ ক্রেতারা কীভাবে বুঝবেন সে বিষয়ে বেশ কিছু উপায় বাতলে দিয়েছে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞাপনের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনটি।
তারা বলেছে, ক্রেতাদের নিচের বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত–
যেসব ক্রেতা এ ধরনের ডিভাইস কেনা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন সংগঠনটি তাদেরকে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা বা খুচরা বিক্রেতা কোম্পানি সম্পর্কে ভালোভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে। একইসঙ্গে ওই বিক্রেতা কোম্পানিটি কোনো আসল যোগাযোগের ঠিকানা ও ব্যবসায়িক ঠিকানা বলছে কি না তাও যাচাই করে নিতে বলেছে।
ক্রেতাদের কেবল বিক্রেতার নিজস্ব ওয়েবসাইটে থাকা রিভিউর ওপর ভরসা না করে এর বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো রিভিউ বা মতামত আছে কি না তা খুঁজে দেখা উচিত।
এএসএ বলেছে, কোনো এয়ার কন্ডিশনারের বিজ্ঞাপন নিয়ে যদি কারও মনে সন্দেহ বা উদ্বেগ তৈরি হয় তবে তারা সরাসরি ওই কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়ে সে বিষয়ে রিপোর্ট বা অভিযোগ জানাতে পারেন।
ভেতরের আসল রূপ
ইউটিউবার স্টুয়ার্ট ম্যাথিউস বলেছেন, বিজ্ঞাপন অনুসারে এসব ডিভাইস আসলেই কাজ করে কি না তা দেখার জন্যই তিনি বেশ কয়েকটি যন্ত্র কিনেছিলেন।
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ম্যাথিউস বলেছেন, ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে দেবে এমন কিছু কেনার বদলে তিনি ‘ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞানের’ ওপর ভিত্তি করে তৈরি কিছু ‘সাশ্রয়ী যন্ত্রাংশ’ হাতে পেয়েছেন।
একটি বিজ্ঞাপনে পণ্যটিকে ‘রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার্ড এয়ারকন ইউনিট’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যাতে ‘লিকুইড-কমপ্রেসড কুলিং কার্তুজ’ রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তবে ম্যাথিউস বলেছেন, ডিভাইসটির ভেতরে আসলে ‘কতগুলো কার্ডবোর্ডের পাখা বা ফিন রয়েছে, যেগুলোর ওপর দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার সময় সেগুলো কেবল ভিজে যায়’।
এগুলোকে ‘সোয়াম্প কুলার’ বা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাস ঠান্ডা করার যন্ত্র বলা চলে, যা শুষ্ক ও গরম আবহাওয়ায় মোটামুটি কাজ করলেও বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুক্তরাজ্যের মতো চরম আর্দ্র আবহাওয়ার দেশগুলোতে এগুলো একেবারেই কার্যকর নয়।
এ ছাড়া, এগুলো কোনো প্রচলিত বা সাধারণ এয়ার কন্ডিশনারও নয়। কারণ আসল এসি ‘এগজস্ট হোস’ বা গরম বাতাস বের করার পাইপ বা আউটডোর ইউনিটের মাধ্যমে ঘরের ভেতরের তাপ বাইরে বের করে দিয়ে ঘর ঠান্ডা করে।
নিজের হতাশা প্রকাশ করে ম্যাথিউস বলেছেন, “এ ধরনের আবর্জনা বা ভুয়া জিনিস কেনার ফাঁদে যারা পা দিয়েছেন, তাদের জন্য আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে।”
এএসএ বলেছে, তারা এ ধরনের ভুয়া বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে বিভিন্ন সাইট পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের ‘বিভিন্ন বিজ্ঞাপন নিয়মমাফিক সংশোধন করার নির্দেশ দিয়ে’ কঠোর নির্দেশনা জারি করছে। যেসব বিজ্ঞাপন নিয়ম লঙ্ঘন করছে বলে প্রমাণিত হচ্ছে সেগুলো নিষিদ্ধও করা হচ্ছে।
তবে সংগঠনটি ইউটিউব ও ফেইসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে দেওয়া বিভিন্ন বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের নিজেদের সরাসরি কোনো জরিমানা করার আইনি ক্ষমতা নেই।