Published : 08 Jul 2026, 06:10 PM
দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সরকার ‘বদ্ধপরিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে পুঁজিবাজার নিয়ে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এসকে আজিজুল বারীর তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান এ কথা বলেন।
আজিজুল বারীর অনুপস্থিতিতে প্রশ্নটি সংসদে উত্থাপন করেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকার শেয়ার মার্কেটের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাসহ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য বদ্ধপরিকর। সরকার ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পণ্যের বৈচিত্রকরণের মাধ্যমে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার ইত্যাদির মাধ্যমে উন্নত ও টেকসই পুঁজিবাজার গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
“মাননীয় স্পিকার আপনি যদি গতকাল বা আজকের পত্র-পত্রিকা খেয়াল করে দেখেন, দেখবেন যে ধীরে ধীরে পুঁজিবাজার অবস্থার পরিবর্তন করছে এবং এটি ভালো করছে।”
এ সময় প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের নেওয়া অগ্রাধিকার ১৭ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন।
এগুলো হচ্ছে–বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে পুঁজিবাজার বিষয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনারকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নিয়োগ দেওয়া।
নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাজারে বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, লাভজনক সরকারি মালিকাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণে উদ্বুদ্ধ করা। বহুজাতিক কোম্পানিসহ উচ্চ মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারও স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা।
এসএমই কোম্পানিসহ ভাল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা। পুঁজিবাজার কারসাজি বন্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও প্রদানকারীর প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও উৎসাহ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব নিরীক্ষা, উপযুক্ত অডিটরের মাধ্যমে নিরীক্ষার নিমিত্তে নীতিমালা প্রণয়ন করা, ফরেন পোর্টফলিও ইনভেস্টমেন্ট অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সংস্কার, ওয়ান স্টপ সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান সার্ভিস চালু, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স হ্রাসকরণ, লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল এবং বিও অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন প্রত্যাবসান প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা।
পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়ের সংক্রান্ত বিধান সিকিউরিটিজ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা। পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা। পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কেট ও পণ্য উভয়ই সম্প্রসারিত করা, ই-কেওয়াইসি এর মাধ্যমে অনলাইন ও মোবাইলভিত্তিক বিও হিসাব খোলা ও ট্রেডিং সুবিধা চালু।
বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসঙ্গত করনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া, ব্যাংক ও এমএফএসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে টাকা জমা এবং উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া। এআইভিত্তিক শক্তিশালী নজরদারির মাধ্যমে বাজারে অনিয়ম ও জালিয়াতিতে জড়িতদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রাখা। তালিকাভুক্ত ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোতে সুশাসন জোরদারকরণে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে অর্জিত সুদ আয়ের অংশ বিশেষ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা করার বিধান প্রণয়ন করা।
আইনকানুন যুগোপযোগী করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ আরও সুরক্ষিত করা এবং সরকারি সিকিউরিটিজগুলোর (ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুক) লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা।
এ দিন বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কর্মসূচিতে প্রথম ত্রিশ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী চার সংসদ সদস্য তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন এবং ৯ সংসদ সদস্যের সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজার ধসের কারণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের শেয়ার বাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ উদঘাটনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। পরিচালিত কার্যক্রমে শেয়ার বাজারের ধারাবাহিক পতনের পেছনে কারণগুলো ছিল- বাজার কারসাজি ও কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, কিছু কোম্পানির আইপিও, বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী দুর্বল তদারকি এবং সময়মত ব্যবস্থা না নেওয়া।
“করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি ও আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং বাজারে আস্থার সংকট, নীতিগত অসঙ্গতি ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও পুঁজিবাজারবান্ধব করনীতির অভাব ইত্যাদি।”
এ ব্যাপারে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “শেয়ার মার্কেটের ধারাবাহিক পতন ঘটিয়ে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করার জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারীর অভিযোগ দুদক কর্তৃক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে কতিপয় ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে মামলাসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
“শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারীর সঙ্গে আরো অন্যান্য ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান জড়িত কিনা তা উদঘাটনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে শেয়ার মার্কেট কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া দায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণে তদন্ত কমিটির গঠন ও প্রদত্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রেরণ করা হয়েছে।”