Published : 24 Jun 2026, 10:13 AM
চীনের প্রাচীরেও তাহলে ফাটল ধরে! কঙ্গোর গোলবারে দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়েছিলেন লিওনেল এমপাসি। ম্যাচের ৭৫ মিনিট পর্যন্ত কলম্বিয়ার আক্রমণের স্রোত আছড়ে পড়ে সেই দেয়ালে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটু ফাঁক খুঁজে নিলেন দারউইন মুনিয়স। ব্যস, এক মুহূর্তের সেই ঝলকই যথেষ্ট হলো জয়ের জন্য। কলম্বিয়া পৌঁছে গেল নকআউট পর্বে। গোলকিপারের বিরোচিত পারফরম্যান্সেও শেষ রক্ষা হলো না কঙ্গোর।
বিশ্বকাপের ‘কে’ গ্রুপের ম্যাচে ডিআর কঙ্গোকে ১-০ গোলে গোলে হারিয়ে পরের ধাপে পা রাখা নিশ্চিত করে ফেলল কলম্বিয়া।
গুয়াদালাহারায় ৭৬তম মিনিটে মুনিয়সের গোল গড়ে দেয় ম্যাচের ভাগ্য।
গোল করা ছাড়াও ম্যাচজুড়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন ক্রিস্টাল প্যালেসের এই রাইট ব্যাক। রক্ষণের চেয়ে আক্রমণেই তিনি ছিলেন বেশি সক্রিয়, কঙ্গোর বক্সের আশেপাশেই তার ছিল বেশি আনাগোনা। ম্যাচের সেরাও তিনিই।
আগের ম্যাচেও উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কলম্বিয়ার জয়ে প্রথম গোলটি করেছিলেন মুনিয়স।
ম্যাচের ৬৬ শতাংশ সময় বল নিজেদের কাছে রেখে গোলে ২০টি শট নেয় কলম্বিয়া। এরপর ৯টি ছিল লক্ষ্যে। এমপাসি সেভ করেন ৮টি।
কঙ্গোর জালে বল ঢুকেছিল আরও তিন দফায়। এর দুটিই ছিল লুইস দিয়াসের। কিন্তু অফসাইড ও ফাউলের কারণে গোল হয়নি কোনোটিই।
ম্যাচের প্রথম আক্রমণটি করে কঙ্গো। বক্সের বাইরে থেকে জায়গা পেয়ে জোরাল শট নেন এদো কায়েম্বে। তবে বল চলে যায় ওপর দিয়ে।
এরপরই আক্রমণের সুনামি বইয়ে দেয় কলম্বিয়া। চতুর্থ মিনিটে বাঁদিক থেকে বিপজ্জনকভাবে বল নিয়ে ঢুকে পড়ে তারা। হামেস রদ্রিগেসের কাছ থেকে বল পেয়ে শট নেন জন আরিয়াস। দারুণ রিফ্লেক্সে ঠেকিয়ে দেন এমপাসি। ফিরতি বলে দারউইন মুনিয়সের শট পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়।
দুই মিনিট পর ফাঁকায় থেকে মুনিয়সের হেড লাফিয়ে রক্ষা করেন এমপাসি। তবে বিপদমুক্ত হয়নি তখনও। মুনিয়স এগিয়ে গিয়ে আবার হেডের চেষ্টা করেন, এমপাসির হাতে লেগে বল চলে যায় জালে। তার উল্লাস দ্রুতই থেমে যায় অফসাইডের বাঁশিতে। পরে অটোমেটেড রিপ্লেতে দেখা যায়, ক্রিস্টাল প্যালেসের এই উইং ব্যাকের প্রসারিত হাতের সামান্য অংশ ছিল অফসাইড!
দ্বাদশ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে রদ্রিসের দুর্দান্ত বাঁকানো শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে রক্ষা করেন এমপাসি। পরমুহূর্তে আরেকটি আক্রমণ করে কলম্বিয়া। কিন্তু দিয়াসের দিকে বাড়ানো রদ্রিগেসের বলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বাইরে চলে যায়।
কলম্বিয়া সুযোগ তৈরি করতেই থাকে। অষ্টাদশ মিনিটে বক্সের ভেতরে একটি চিপ করা পাস পেয়ে দারুণ স্থিরতার পরিচয় দেন দিয়াস। শরীর ঘুরিয়ে সামান্য ফাঁকা জায়গায় ঢুকে শট নেন বায়ার্ন মিউনিখের উইঙ্গার। এমপাসি যথারীতি ছিলেন তৎপর। তার পায়ে লেগে বল বাইরে চলে যায়।
এমপাসি যেন শ্বাস নেওয়ার সময়টুকু পাচ্ছিলেন না। ২০তম মিনিটে ৩০ গজ দূর থেকে গুস্তাভো পুয়ের্তার শট দারুণভাবে আটকে দেন কঙ্গোর গোলকিপার।
প্রথম ২০ মিনিটেই গোলে ৫টি শট নেয় কলম্বিয়া, এবারের আসরে এখনও পর্যন্ত যা সর্বোচ্চ। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে একুয়েডর নিয়েছিল ৪টি শট।
অন্য বেশির ভাগ ম্যাচের ধারা মেরে পানি পানের বিরতিতে দুয়ো দেন দর্শকেরা। তবে কঙ্গোর জন্য খুব জরুরি ছিল সেই বিরতি, একটু স্বস্তির শ্বাস নেওয়া ও গুছিয়ে ওঠার জন্য।
ছোট্ট ওই বিরতির পর তাদের খেলায় কিছুটা উন্নতিও চোখে পড়ে। ৩১তম মিনিটে ইয়োয়ান উইসার একটি আলগা ব্যাক পাসের সুযোগ প্রায় কাজে লাগিয়েই ফেলেছিলেন ইয়োয়ানে উইসা, কিন্তু কলম্বিয়ার গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস ছিলেন সতর্ক।
পরের মিনিটে দিয়াসের শট আটকে যায় কঙ্গোর রক্ষণ দেয়ালে।
৪৪তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে সুইঙ্গিং ক্রস করেন কঙ্গোর আহচুহ মাসুয়াকু। একটুর জন্য সেই বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি উইসা। কলম্বিয়ার গোলকিপার মুঠোয় জমান বল। প্রথমার্ধে কলম্বিয়ার গোলকিপার ভার্গাস ও মিডফিল্ডার জেফেরসন লের্মা ছাড়া বাকি ৯ জনই গোলে শট নেন। এরপর ৬টি ছিল লক্ষ্যে। কিন্তু আসল কাজ হয়নি।

দ্বিতীয়ার্ধের পঞ্চম মিনিটে আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ পায় কলম্বিয়া। মুনিয়সের ক্রস করার প্রচেষ্টা প্রতিহত হয়ে কর্নার হয়ে যায়। সেখান থেকে প্রথম ডেলিভারিটি ক্লিয়ার করা হলেও বল আবার ফিরে আসে এবং দিয়াসের জোরাল শট অবিশ্বাস্যভাবে আটকে যায় এমপাসির পায়ে লেগে। অনেকটা রিঅ্যাকশন সেভ ছিল সেটি। তবে বিপদ ছিল তখনও। ফিরে আসা বলে আরিয়াসের শট সামান্য একটু বাইরে চলে যায়। হতাশায় মাঠে শুয়ে পড়েন এই মিডফিল্ডার।
নতুন মাত্রা যোগ করার আশায় ৫৯তম মিনিটে হামেস রদ্রিগেস ও লুইস সুয়ারেসকে একসঙ্গে তুলে নেয় কলম্বিয়া। পরের মিনিটেই গোলমুখে দিয়াসের বিপজ্জনক ক্রস চমৎকারভাবে ফিস্ট করে দেন এমপাসি। কর্নারে উড়ে আসা বলও বিপদমুক্ত করেন কঙ্গোর গোলকিপার।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিটে ৭০ শতাংশ বল নিজেদের কাছে রেখেও গোলে কেবল একটি শট নিতে পারে কলম্বিয়া।
যখন মনে হচ্ছিল, একটু ঝিমিয়ে পড়েছে কলম্বিয়া, তখনই সেই গোল।
বক্সের বাইরে থেকে প্রতিপক্ষের দুজনের মাঝ দিয়ে বল বক্সে ঠেলেন বদলি নামা হুয়ান কিনতেরো। সেখানে কঙ্গোর এক ডিফেন্ডারকে ব্লক করে রাখেন জন কর্দোভা। ফাঁকায় থাকা মুনিয়সের শট গোলকিপার এমপাসিকে বিভ্রান্ত করে কাছের পোস্ট দিয়ে ঢুকে যায় জালে।
এরপরই দুই মিনিটের মধ্যে দিয়াস দুবার বল জালে পাঠিয়েও হতাশ হন। একটিতে তিনি আগুয়ান গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে চমৎকার চিপ করেন। কিন্তু এর আগ মুহূর্তেই সঙ্গে থাকা মার্কারকে ফাউল করায় গোল হয়নি। পরেরটিতে বক্সে ঢুকে দুজনকে এগিয়ে ডান পায়ের জোরাল শটে বল জালে জড়ান তিনি। কিন্তু এবার গোল হয় অফসাইডের কারণে। বল বলার সময় তার পায়ের সামনের ভাগ ছিল অফসাইডে!
শেষ সময়ে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ম্যাচ জমে ওঠে তুমুল। যোগ করা সময়ে নাথানেল এমবুকুর শট ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্ষা করেন কলম্বিয়ার গোলকিপার ভার্গাস। পরে কর্নারেও দলকে বিপদমুক্ত করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ওই একটি গোলই আলাদা করে দুই দলকে।
গ্রুপের শেষ রাউন্ডে কলম্বিয়া ও পর্তুগালের লড়াইয়ে চূড়ান্ত হবে গ্রুপের শীর্ষস্থান।