Published : 18 Jul 2026, 05:15 PM
লড়াইটি আর্জেন্টিনা ও স্পেনের। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচ। দুটি দেশ, দুটি জাতীয় দলের গৌরব ও মর্যাদার উপলক্ষ। তবে এ মঞ্চেই ক্লাবের পতাকা উড়তে দেখছেন শাভি এর্নান্দেস ও হাভিয়ের মাসচেরানো। বার্সেলোনার সাবেক দুই তারকা এই ফাইনালেও দেখছেন তাদের প্রিয় ক্লাবের ছায়া। সেটি শুধু স্পেন দলেই নয়, আর্জেন্টিনাতেও দেখছেন তারা সেই একই আভা।
লা মাজিয়ায় বেড়ে ওঠা দুর্দান্ত সব প্রতিভা তো আছেই স্পেন দলটিতে। তবে বার্সেলোনার এই বিখ্যাত একাডেমির উজ্জ্বলতম প্রতিভা আর শ্রেষ্ঠতম ‘গ্র্যাজুয়েট’ আছে প্রতিপক্ষ দলে। এই ৩৯ বছর বয়সেও যিনি ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন তার জাদুতে। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দলে তো বার্সেলোনার প্রভাব থাকবেই!
বার্সেলোনার এই ফুটবলই একসময় সৌন্দর্যের ফুল হয়ে ফুটেছে শাভির পায়ে। ২০০৮ ও ২০১২ ইউরো এবং ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের স্তম্ভ ছিলেন তিনি। ‘তিতি-তাকা’ খেলে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে স্পেনকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেওয়ার নায়কদের একজন। বার্সেলোনায় তিনি মহানায়ক।
সেই নান্দনিক ঘরানার ফুটবলার ছিলেন না মাসচেরানো। তবে ছিলেন দারুণ কার্যকর। এজন্যই দীর্ঘদিন বার্সেলোনার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড ও রক্ষণভাগে তিনি ছিলেন আস্থার নাম। আট বছরে জিতেছেন সেখানে ১৯টি শিরোপা। ক্লাব ছাড়াও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সঙ্গে খেলেছেন তিনি ১৩ বছর। কয়েক মাস আগেও ছিলেন ইন্টার মায়ামিতে মেসির কোচ।
বার্সেলোনার সাবেক দুই তারকা নিউ ইয়র্কে রয়টার্সের মুখোমুখি হয়ে বললেন, ফাইনালটি তাদের কাছে বার্সেলোনাময় বলেই মনে হচ্ছে।
স্পেনের আক্রমণ ও রক্ষণের বড় দুই ভরসা, বয়সের তুলনায় দারুণ পরিণত দুই তরুণ লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবার্সি বার্সেলোনার হয়ে সিনিয়র ফুটবলে সুযোগ করে নিয়েছিলেন শাভি কোচ থাকার সময়ই।
কিশোর বয়সে কাছ থেকে ইয়ামাল ও কুবার্সিকে দেখেছেন শাভি। তাদের প্রাথমিক পথচলায় সহায় হয়েছেন। এখন এত দ্রুত তাদেরকে বিশ্বকাপ দেখে উচ্ছ্বসিত তিনি।
“আমি অবশ্যই খুব গর্বিত ওদেরকে। ওদেরকে যখন দেখেছিলাম, তখন লামিনের বয়স ছিল ১৫, কুবার্সির ১৬। ওদের মধ্যে ছিল দৃঢ় মানসিকতা ও তীব্র তাড়না।
"আমার মনে আছে, ওরা নিজেরাই আমাকে বলেছিল, ‘চিন্তা করবেন না কোচ, আমি প্রস্তুত। কোনো চিন্তা নেই।' আমি কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম যে, ১৫- ১৬ বছর বয়সে হয়তো তারা প্রস্তুত ছিল না, হয়তো চাপ অনুভব করবে। কিন্তু তা একেবারেই দেখিনি।”
মাসচেরানো যখন আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার খেলেন, তখন একের পর এক ফাইনাল হেরেছে আর্জেন্টিনা, ট্রফির দেখা নেই অনেক বছর ধরে। মেসির হাত ধরে গত কয়েক বছরে ট্রফির পর ট্রফি জিতেছে সেই দল। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ঘুচিয়ে গত বিশ্বকাপে পূর্ণতার তৃপ্তি পেয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। তবু প্রবল ক্ষুধা নিয়ে ছুটছেন আরও একটি শিরোপায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে।
মেসিকে তো কম দেখলেন না মাসচেরানো। ‘বিস্ময়ের আর কিছু বাকি নেই’, বলছিলেন তিনি, কিন্তু পরমুহূর্তেই যোগ করেন, “তারপরও বিস্মিত হতে হয়।”
এবারের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখেও সেই কথাই আবার বললেন ৪২ বছর বয়সী সাবেক এই ফুটবলার।
“সে স্পেশাল এক ফুটবলার, তাই না? তার তুলনা আর কারও সঙ্গে করা যায় না। সে আলাদা, সম্পূর্ণ আলাদা।
“যখনই আমরা তাকে দেখি, আমরা অবাক হই, কারণ সে এমন অনেক কিছু করে, যা আমরা অন্য কোনো ফুটবলারের মধ্যে কখনও দেখব না। তাই আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে তার মতো ফুটবলার খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আমার তো মনে হয়, অসম্ভব। আর আসবে না।”
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের জয়টি একসঙ্গেই দেখেছেন শাভি ও মাসচেরানো। তখনও মেসিকে নিয়ে আলোচনা হয় তাদের, জানালেন শাভি।
“আমরা একসঙ্গে খেলা দেখছিলাম। সে আমাকে বলল, ‘৩৯ বছর (বয়স), আর সে কী করছে এসব! এটা অবিশ্বাস্য।
"আমার মতে, সে ইতিহাসের সেরা। এবং সে এখনও মাঠে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার মনোভাব… সব মিলিয়ে সে একজন যোদ্ধা। সে নিঃসন্দেহে সেরা।”
মাসচেরানো আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখনও মেসির হাতেই।
“আমার মনে হয়, সে এখনও দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই খেলার রাজা সে-ই। বল তার কাছে থাকে এবং সে মাঝে মাঝে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যা তাকে খেলা জেতাতে পারে এবং সে তা করতে পারে অনায়াসেই।”
শাভির মতে, বার্সেলোনার ফুটবলীয় ঘরানা ও ছাপ বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দলের মধ্যেই আছে। মাসচেরানো যদিও বলছিলেন, আর্জেন্টিনা এই দলে বার্সেলোনার এখনকার ফুটবলার খুব বেশি নেই। তবে শাভি তবু দেখছেন বার্সেলোনার ছায়া।
“এই দর্শন, এই ঘরানা নিয়ে আমাদের গর্বিত হতে হবে। এটা একটা ঘরানা, যা এখনও সফলভাবে চলছে। আমরা এই পদ্ধতিতেই ফাইনালে উঠেছি, এমনকি আর্জেন্টিনাও।”
মাসচেরানোরও সেখানে একমত। দর্শন একই বলে ফাইনাল নিয়ে দারুণ রোমাঞ্চিত ৪২ বছর বয়সী কোচ।
“আমাদের দলে বার্সার খুব বেশি ফুটবলার নেই, কিন্তু খেলার ধরণটা অনেকটাই তাদের মতো।
"আমার মতে, তারাই এই টুর্নামেন্টের সেরা দুটি দল। এমন দুটি দল, যারা একই রকমভাবে খেলে। তারা বল পায়ে রেখে খেলতে পছন্দ করে এবং বল তাদের দখলে না থাকলে তারা স্বস্তি বোধ করে না। সম্ভবত যে দলের কাছে বলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তারাই খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করবে। এর চেয়ে ভালো ফাইনাল আমরা আর পেতে পারতাম না।”
শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে কোন দল?
এখানে সরাসরি উত্তর দিলেন না কেউই। মাসচেরানোর মতে, “এসব কখনোই আগে থেকে বলা যায় না।” শাভির কণ্ঠেও একই সুর, “ভবিষ্যদ্বাণী করাটা খুব কঠিন।”
মাসচেরানোর শেষ কথা, “কী হতে চলেছে, তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। তবে যেটাই হোক, দিনশেষে এটা কেবল একটি খেলাই!”