Published : 17 Jul 2026, 06:45 PM
কেমন হতো, যদি এই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের জার্সিতে খেলতেন লিওনেল মেসি? এই ভাবনাই এখন অবান্তর। তবে একসময় মেসিকে নিজেদের করে পেতে স্পেন যে অনেক চেষ্টা করেছে, গোটা ফুটবল বিশ্বেরই তা জানা। সেই চেষ্টার মূল দায়িতত্ব যার, তিনি এবার শোনালেন ওই সময়ের গল্প। নাম তার হিনেস মেলেন্দেস।
বিশ্ব ফুটবলে এমন পরিচিত কেউ নন মেলেন্দেস। তবে স্প্যানিশ ফুটবলে তিনি দারুণ শ্রদ্ধেয় ও গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র। স্পেনের যুব দলগুলির কোচ ছিলেন তিনি, পরে হয়েছে সমন্বয়ক। তাকে বলা হয় স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল যুব দলের সমন্বয়কারী। বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা এই স্পেন দল, এর আগে বিশ্বকাপ ও ইউরোতে শিরোপাজয়ী দলটির অনেকট ফুটবলার গড়ে উঠেছেন তার হাত ধরে।
ফাইনালের আগে স্প্যানিশ ক্রীড়া পত্রিকা এএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৭৬ বছর বয়সী সাবেক এই কোচ ফিরে গেলেন দুই যুগ আগের সেই সময়টায়। পাশাপাশি তার কণ্ঠে উঠে এলো বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লিওনেল স্কালোনিকে নিয়ে স্মৃতিচারণাও।
মেসিকে স্পেনের হয়ে খেলানোর জন্য আলোচনা করেছিলেন আপনি, সেটা কিভাবে হয়েছিল?
হিনেস মেলেন্দেস: বার্সেলোনায় আমার একজন বন্ধু ছিল, আলেক্স গার্সিয়া, তার কোচ। সে সম্ভাব্য সব উপায়ে আমাকে বলতে থাকল, “আরে, আমাদের এই আর্জেন্টাইনকে তোমার সাথে খেলতে রাজি করাতে হবে।” সে ছিল '৮৭-এর প্রজন্মের, জেরার্দ পিকে এবং সেস্ক ফাব্রেগাসদের একই প্রজন্মের। জাতীয় দলে আমার বার্সেলোনার আটজন খেলোয়াড় ছিল। তারা আমাকে তার সঙ্গে কথা বলতে, তাকে আমাদের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সে (মেসি) কখনোই রাজি হয়নি।
পিকে ও ফাব্রেগাস কি মেসিকে জোরাজুরি করেছিল?
মেলেন্দেস: ওরা একই প্রজন্মের, '৮৭-এর ব্যাচের। কিন্তু মেসির বয়স যখন ১৩, তখনও আমি চেয়েছিলাম ও আমাদের হয়ে খেলুক। বার্সার কোচ অালেক্স গার্সিয়া ওকে রাজি করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। আলবাসেতে শহরে স্প্যানিশ ক্যাডেট চ্যাম্পিয়নশিপ নামে একটা টুর্নামেন্ট চলছিল। সেখানে, যখন ওর বয়স ১৪, আমি ওকে আবার বললাম: “দয়া করে, তোমাকে আমাদের হয়ে খেলতেই হবে...।”
আর আর্জেন্টিনা?
মেলেন্দেস: আর্জেন্টিনা ব্যাপারটা জানতে পারে, কারণ আমি তাদের মুখপাত্র ছিলাম। ওরাসিও নামের তাদের এক মধ্যস্থতাকারী একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, আমি বুয়েনস আইরেসের সংবাদপত্র ‘এল গ্রাফিকো’-কে একটি সাক্ষাৎকার দেব কি না। সেই সাক্ষাৎকারে আমি উল্লেখ করেছিলাম, বার্সার একজন অসাধারণ আর্জেন্টাইন ফুটবলার আছে।
কিন্তু আসলে আমি তাদের সতর্ক করেছিলাম যে, বার্সার একজন অসাধারণ ফুটবলার আছে, ২০০৩ সালে ফিনল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে। তারা এর আগে তাকে কখনও ডাকেনি এবং তাদের কোচ উগো তোকায়ি, যিনি আমার বন্ধু ছিলেন, আমাকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বললেন, ‘মিস্টার, এটা কি সত্যি যে বার্সেলোনায় একজন অসাধারণ ফুটবলার আছেন?’ আমি উত্তরে দিলাম, ‘হ্যাঁ, এবং যেহেতু তারা তাকে ডাকেনি, আমরা বিশ্বকাপ জিততে চলেছি।’
তিনি বললেন যে টুর্নামেন্টের পর তারা তাকে দলে নেওয়ার জন্য একটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করবে। পরে ঠিক তা-ই হয়েছিল। ২০০৩ সালের নভেম্বরে আর্জেন্টিনা অবশেষে তাকে চুক্তিবদ্ধ করে।
অন্য কথায়, স্পেনের পক্ষ থেকে জোরাল চেষ্টা করা হয়েছিল।
মেলেন্দেস: ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে এক সাক্ষাৎকারে সে স্বীকার করেছিল যে, তার কোচের কথা মাথায় রাখলে এই সম্ভাবনাটা (স্পেনের হয়ে খেলা) বাস্তব ছিল। পিকে এবং ফাব্রেগাস তাকে ক্রমাগত ফোন করত। তারা বার্সেলোনায় তার সতীর্থ ছিল এবং যেহেতু আমার দলে সাত-আটজন খেলোয়াড় ছিল এবং আমরা অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৬ দল নিয়ে পর্তুগালে খেলতে যাচ্ছিলাম, তাই তারা তাকে আমাদের সঙ্গে আসার জন্য চাপ দিয়েছিল।

সে কি কখনোই রাজি হয়নি?
মেলেন্দেস: না, না, কখনোই না। কখনোই না। আমার একবারের কথা মনে আছে, তখন আমি খুব ছোট ছিলাম...এমন বড় কিছু নয়। তবে সত্যিই সেটা হলে ইতিহাসটা কিছুটা বদলে যেত। একদিন ভিসেন্তে দেল বস্ক (স্পেনের ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরোজয়ী কোচ) আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি তাকে আমাদের হয়ে খেলাতে পারতে, আমরা আরও দুই-তিনটি বিশ্বকাপ জিততাম।’
আফসোস!
মেলেন্দেস: এটাই আমাদের কাজ ছিল। লামিন যখন ৯ বছর বয়সী ছিল, তখন আমরা তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলাম, এবং আমরা চাইনি মরক্কো তা জানতে পারুক। তারপর আমি চলে যাই, এবং জুলেন গেরেরো তাকে ডেকে পাঠান।
লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে কীভাবে চুক্তিবদ্ধ করলেন আপনি?
মেলেন্দেস: আমি তাকে তিন মাসের জন্য এনেছিলাম, সে এখনও পর্যন্ত এখানেই আছে। লন্ডন অলিম্পিকসের (২০১২) পর জুলেন লোপেতেগিকে অনূর্ধ্ব-২১ দলে পাঠিয়ে দেওয়ায় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে একটি পদ খালি হয়েছিল। একজন কোচের প্রয়োজন ছিল। আমাকে তখন কোচ হিসেবে রাখতে চাইছিল না, কারণ মিটিংয়ের জন্য আমাকে সুইজারল্যান্ডে যেতে হতো, উয়েফাতে থাকতে হতো, ফিফাতেও ছিলাম, সবকিছু সামলানো অসম্ভব ছিল। কী করব, তা বুঝতে পারছিলাম না।
লিথুয়ানিয়ায় আমাদের একটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বের ম্যাচ ছিল এবং আমি ইনিয়াকি সায়েথকে (সাবেক ফুটবলার ও কোচ) ফোন করে বললাম, ‘বিরাট সমস্যায় পড়েছি, কাকে দায়িত্ব দেব তা বুঝতে পারছি না..।’ মনে নেই, তিনি এক বা দুই ঘণ্টা পরে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আরে, তুমি লুইসিতোকে (লুইস দে লা ফুয়েন্তে) বলছো না কেন? ওর তো আপাতত কোনো কাজ নেই”
সেটা আজ পর্যন্ত রয়ে গেছে!
মেলেন্দেস: আমি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম এবং সাক্ষাৎকারের পর তাকে বলেছিলাম, ‘শোনো, আমি তোমাকে তিন মাসের চুক্তির প্রস্তাব দেব।’ আমরা ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, তার থেকে যাওয়া উচিত।
সে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে রয়ে গেল এবং পরের বছর জার্মানি আমাদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিল। বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু তার পরের বছরই তিনি আসেন্সিও, ভায়েহো, মেরিনো, পেদ্রাসারদের প্রজন্মকে নিয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন... তিনি একটি অসাধারণ দল গড়ে তুলেছিলেন, কারণ রদ্রিকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যাকে আতলেতিকো মাদ্রিদ ছেড়ে দিয়েছিল এবং সে ভিয়ারেয়ালে চলে গিয়েছিল। সে মেরিনো, রদ্রি এবং সেবাইয়োসের সাথে খেলেছিল। আক্রমণভাগে ছিল আসেন্সিও, বোর্হা মায়োরাল এবং পেদ্রাসা।
ধীরে ধীরে তিনি কোচিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করলেন।
মেলেন্দেস: হ্যাঁ, আমিই তাকে কোচিং স্কুলে নিয়ে এসেছিলাম। সেখানেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি হোর্হে ভিল্ডার সাথে ট্যাকটিক্সের অধ্যাপক ছিলেন।
এবং তিনি স্কালোনির সাথে একমত হয়েছিলেন, তাকে একটি পাঠ দিয়েছিলেন।
মেলেন্দেস: ঠিক তা-ই। স্কালোনির কোর্সটি হলো ২০১৭ সালের কোর্স, যেটিতে ফের্নান্দো রেদন্দো, মন্তসে তুমে, লিও ফ্রাঙ্কো, ফার্নান্দো আন্দোনি ইরাওলা... ছিলেন। সেই কোর্সটি একটি অসাধারণ কোর্স ছিল।
স্কালোনি সম্পর্কে আপনার কতটুকু মনে পড়ে?
মেলেন্দেস: আমার মনে আছে, তিনি একেবারে প্রথম দিন থেকেই সামনের সারিতে বসতেন। সেখানে ছিলেন তিনি, লিও ফ্রাঙ্কো এবং মন্তসে তুমে। এরপর আমার মনে আছে, ব্যবহারিক ক্লাসগুলোতে তিনি একজন ভালো ছাত্র ছিলেন; তিনি খুব ভালো করতেন, সবসময় খুব মনোযোগী থাকতেন। তাকে নিয়ে আমার মধুর স্মৃতি রয়েছে।