জেগে উঠছে এশিয়া, জমে উঠছে বিশ্বকাপ

আর্জেন্টিনা, জার্মানির মতো শক্তিশালী দলগুলোকে এবার শুরুতেই হারের তেতো স্বাদ দিয়েছে এশিয়ার দলগুলো।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Nov 2022, 04:56 PM
Updated : 24 Nov 2022, 04:56 PM

‘আর্জেন্টিনার হারে পৃথিবী বদলে যায়নি’, কথাটি রাফায়েল নাদালের। স্প্যানিশ এই টেনিস তারকা ভুল বলেননি। এরকম এক-দুই ম্যাচের ফলে হয়তো তেমন কিছু এসে যায় না, তবে বিশ্বকাপের গতিপথ কিছুটা বদলে তো যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্ব ফুটবলে দিন বদলের সুর তুলে দেওয়ার জন্য যে অতটুকই যথেষ্ট।

এবারের বিশ্বকাপে পরাশক্তি আর্জেন্টিনার ‘পুঁচকে’ সৌদি আরবের বিপক্ষে ধরাশায়ী হওয়া, জার্মানির বিপক্ষে জাপানের জিতে যাওয়া, উরুগুয়েকে গোলশূন্য ড্রয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রুখে দেওয়া- এসব দিচ্ছে এশিয়ার ফুটবলের বদলে যাওয়ার বার্তা। একটু একটু করে জমে উঠতে শুরু করেছে মরুর বুকে হওয়া কাতার বিশ্বকাপও। 

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে এখন শীতকাল হলেও বিকালের দিকে তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বলার অপেক্ষা রাখে না দুপরে গায়ে জ্বালা ধরানো গরম। ফলে তখন দোহার রাস্তার পাশে, পাবে, মোড়ে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে বিশ্বকাপ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের তুমুল আড্ডা দেওয়ার, তর্ক-বিতর্কের ঝড় তোলার সুযোগ নেই, এমন দৃশ্য দেখার উপায়ও নেই।

এই খচখচানিটুকু থাকলেও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সমর্থকরা ঠিকই তাপ-রোদ উপেক্ষা করে ছুটছেন লুসাইলে, আল বায়াত স্টেডিয়ামের পানে। কেউ ফিরছেন জয়ের উচ্ছ্বাস-উল্লাস নৃত্য করতে-করতে, কেউ ব্যস্ত প্রিয় দলের হারে চোখের পানি আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় এবং অশ্রু সংবরণের চেষ্টারতদের বেশিরভাগই এশিয়ার বাইরের দলগুলির সমর্থক! এই দৃশ্য আর যাই হোক, চেনা নয় মোটেও। 

বৈশ্বিক ফুটবলে এশিয়ার দেশগুলো পেছনের বেঞ্চের ছাত্র। লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর হাতেই মূলত এর ঝাণ্ডা। এর আগে মাঠে গড়িয়েছে ২১টি বিশ্বকাপ, কাতারে চলছে ২২তম আসর। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল গল্প উত্তর কোরিয়ার চতুর্থ হওয়া। ২০০২ সালে জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল তারা, সেবারই উঠেছিল সেমি-ফাইনালে। কিন্তু জার্মানির বিপক্ষে ১-০ গোলের হারে বেজেছিল কোরিয়ানদের বিদায় ঘণ্টা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও তারা হেরে যায় তুরস্কের কাছে। 

১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে পথচলা শুরুর ১৬টি আসর পর ২০০২ সালে এশিয়াতে প্রথম পা পড়ে বিশ্বকাপের। এরপর ২০ বছর বিরতি দিয়ে এশিয়ার আরেক দেশ কাতারে বসেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর। এবার গ্রুপ পর্ব থেকে ‘বড়দের’ শিকারের আনন্দে মেতেছে এই মহাদেশের দলগুলো। শুরুটা করেছে সৌদি আরব। জাপান এবং সবশেষ বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়া সেই রাশ টেনে নিয়েছে দারুণভাবে। 

আর্জেন্টিনা-সৌদি আরব ও জার্মানি-জাপান ম্যাচের চিত্রনাট্য একই। পেনাল্টি গোলে পিছিয়ে পড়া, কিন্তু হাল না ছেড়ে মাটি কামড়ে লড়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জয়ের রঙে রঙিন হওয়া। ‍দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, লিওনেল মেসি, আনহেল দি মারিয়াদের মতো তারকায় ঠাসা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুই গোল করে এগিয়ে যায় সৌদি। বাকিটা সময় ২-১ ব্যবধান ধরে রেখে বিশ্বকাপে প্রথম দেখায় আলবিসেস্তেদের বিপক্ষে জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ নেয় তারা। লুসাইল স্টেডিয়ামে আসা হাতে গোণা সৌদি সমর্থকরা মাঠ ছেড়েছেন অদ্ভূত এক ঘোরলাগা অনুভুতি নিয়ে। 

আল রায়ানে খলিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামেও জাপানের পিছিয়ে পড়া স্পট কিক থেকে গোল হজম করে। চারবারের বিশ্বচ্যা ম্পিয়ন জার্মানির জয়ের ব্যবধান কত হবে, হয়ত সে হিসেব কষতে ব্যস্ত ছিলেন অনেকে, কিন্তু আট মিনিটের ঝড়ে পাশার দান উল্টে দিলেন রিতসু দাওন ও তাকুমা আসানো। শেষ পর্যন্ত জয়োল্লাস জাপানের সমর্থকদের। 

আর্জেন্টিনা বা জার্মানির মতো পরাশক্তি নয় উরুগুয়ে, কিন্তু বিশ্বকাপে গল্প করার মতো অতীত, ঐতিহ্য সবই আছে তাদের। বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজক এবং মন্তেভিদিওর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৯৩০ বিশ্বকাপ উৎসব করেছিল তারা এবং ১৯৫০ সালে আরও একবার চ্যাম্পিয়ন। অস্কার মিগেজ, আলসিদেস ঘিগিয়াদের উত্তরসূরি লুইস সুয়ারেস-দারউইন নুনেসদের বৃহস্পতিবার পয়েন্ট ভাগাভাগির টেবিলে বসিয়ে ছাড়ল দক্ষিণ কোরিয়া। 

দোহার মিডিয়া সেন্টারে ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে স্পেনের আরইটিভির সাংবাদিক পাকোর সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এলো এশিয়ার দলগুলোর সাফল্যের বিষয়টি। বেশ উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনিও শোনালেন এশিয়ার দেশগুলোর আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠার কথা। 

“অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে এবার। স্পেন তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় পেয়েছে কাতারে এসে। আর্জেন্টিনাকে সৌদি, জার্মানিকে জাপান হারিয়ে দিয়েছে। এগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এশিয়ার ফুটবলের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক