বান্দরবান থেকে উঠে এসে টেবিল টেনিসে দেশের সেরা হওয়ার পর এই তরুণের স্বপ্ন এখন বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের উজ্জ্বল প্রতিনিধি হয়ে ওঠা।
Published : 14 Aug 2023, 10:16 AM
নাম তার রামহিম লিয়ান বম। জন্ম পাহাড়ের কোলে। পাহাড়ের আলো-বাতাসে, রোদ-ঝড়ে, আর বন্ধুর পথে হেঁটে-ছুটে তার বেড়ে ওঠা। সমতলের জীবনের মতো একসময় টেবিল টেনিসও ছিল তার জন্য অজানা ও অচেনা এক খেলা। কিন্তু এই খেলাটিই এখন রামহিমের নেশা, পেশা ও জীবন। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ায় ওঠার পর তার স্বপ্ন এখন নতুন উচ্চতায় পা রাখার। বিশ্ব আঙিনায় সগৌরবে উঁচিয়ে ধরতে চান তিনি দেশের পতাকা।
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে চট্টগ্রামের রাইফেলস ক্লাবে জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে বালক এককের পর সিনিয়রদের এককেও সেরার মুকুট জিতে নেন রামহিম। মেয়েদের এককে সেরা হন সাদিয়া রহমান মৌ।
এই দুই চ্যাম্পিয়নের পাশাপাশি ফেডারেশনের কর্তা ও কোচদের কথা শুনেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। প্রথম পর্বে ছিল মৌয়ের গল্প। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে রামহিমের পাহাড়ী শৈশব, টেবিল টেনিসে আসা, ভবিষ্যৎ লক্ষ্যসহ আরও অনেক কিছু।
পাহাড়ের মতোই শান্ত শৈশব
‘রামহিম নামের অর্থ কি?’ প্রশ্নটা করতেই স্মিত হাসিতে উত্তর দিলেন- ‘বম ভাষায় রাম অর্থ বড় বা মহা আর হিম অর্থ শান্তি; আমার নামের অর্থ ‘বড় শান্তি।’ পুরোহিত বাবা জুয়ামডো বমের ছেলে রামহিমও পাহাড়ের মতোই শান্ত, স্থির। শৈশবে দুরন্তপনার স্মৃতি তার নেই বললেই চলে।
“শৈশবে এত দুষ্টু ছিলাম না, কিন্তু বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। ঝর্ণা, ঝিল… শুক্রবার হলে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মাছ ধরতে যেতাম, ঝিলে কাকঁড়া ধরতে যেতাম। এভাবেই কেটেছে শৈশব। ফল-টল চুরি সেভাবে করিনি। যখন কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে পড়তাম, তখন একবার আম চুরি করেছিলাম, একটা আম-ই চুরি করেছিলাম, পরে দারোয়ানের তাড়া খেয়ে সেটাও ফেলে রেখে চলে এসেছিলাম!”
পরিবারেরও ছিল অভাবের তাড়া। বান্দরবনের বগা লেকের পাশের বমপাড়া থেকে তাই লামার অবৈতনিক স্কুল কোয়ান্টাম কসমোতে ভর্তি হয়েছিলেন রামহিম। ২০১২ সালে ওই স্কুলে গিয়েছিলেন টেবিল টেনিসের কিংবদন্তি জোবেরা রহমান লিনু। ফেডারেশনের ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ চলছিল। তখনই ছোট-ছোট ব্যাটের এই খেলা সম্পর্কে একটু জানাশোনা রামহিমের।
তবে এই খেলার তার আগ্রহ জন্মানোর গল্পটি বেশ চমকপ্রদ।
“জ্যাকি চ্যানের কারাতে কিড একটা মুভি দেখেছিলাম, ওই মুভিতে একটা অংশ ছিল, একটা চাইনিজ যুবকের সঙ্গে সে টিটি খেলে, ওইটা দেখে আমার টিটি প্রথম ভালো লাগে। কিভাবে টিটিতে প্রতিষ্ঠিত হলাম, সেটা বলতে পারব না। তবে টিটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমার এখন ভালো লাগে।”
যেভাবে ‘প্রতিষ্ঠিত’ হওয়ার শুরু
২০১২ সাল থেকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে টেবিল টেনিস শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। রামহিমেরও হাতেখড়ি হয়ে যায়। দ্রুত রপ্ত করে নেন খেলাটি। ২০১৪ সালে জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে পেয়ে যান ব্রোঞ্জ, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-বিকেএসপি কাপে হন সেরা। এগিয়ে যাওয়ার সেই পথ ধরে এ বছর পেয়ে গেলেন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রেষ্ঠত্বের অনির্বচনীয় স্বাদ।
এই প্রাপ্তির আনন্দ তার কাছে আরও বেশি আরেকটি কারণে। ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের কোনো আসরে বালক ও সিনিয়র এককে অতীতে কেউ সেরা হয়নি কখনও। ১৮ বছর বয়সী রামহিম তাই গড়ে ফেলেছেন তাই অনন্য এক কীর্তি।
আদিবাসী বম জনগোষ্ঠি থেকে আসা প্রথম টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ও তিনি। যদিও অর্জনের আনন্দ প্রকাশে খুব স্বতঃস্ফূর্ত নন এই তরুণ। ভাঙা-ভাঙা বাংলায় যা বললেন, তা জোড়া দিলে এমনটি দাঁড়ায়।
“সিনিয়র পর্যায়ে ২০১৯ সালে প্রথম খেলি ওপেন র্যাঙ্কিং চ্যাম্পিয়নশিপ। এবারই প্রথম সিনিয়র পর্যায়ে সেরা হলাম। ৪-০ সেটের জয় অনেক আনন্দের ছিল; পরিশ্রম করে এটা অর্জন করতে পেরেছি।”
সাফল্যের গল্প লিখেছেন আগেই
কঠোর পরিশ্রমের ফল রামহিম পাচ্ছেন বেশ কিছু দিন ধরেই। গত বছর বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ছেলেদের দলগত বিভাগে কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। ফিজিকে ৩-০ সেটে এবং গায়ানাকে ৩-২ সেটে হারিয়ে ওঠেন শেষ আটের মঞ্চে। সেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে পথচলা থামলেও দারুণ কীর্তি গড়া এই দলে মুহতাসিন আহমেদ হৃদয়, রিফাত সাব্বিরের সঙ্গী ছিলেন রামহিম।
গত বছরেই মে মাসে বাংলাদেশের আরেক ইতিহাস গড়ার সঙ্গে জড়িয়ে তার নাম। মালদ্বীপে সাউথ এশিয়ান জুনিয়র অ্যান্ড ক্যাডেট টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে বালক অনূর্ধ্ব-১৯ বিভাগের দলগত ইভেন্টে শ্রীলঙ্কাকে ৩-২ সেটে হারিয়ে সোনা জেতে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে ঢাকায় এই প্রতিযোগিতায় সোনাম সুলতানা সোমা ও মৌমিতা আলম রুমি জিতেছিলেন বালিকা দ্বৈতের রূপা। এতদিন সেটিই ছিল দেশের সেরা সাফল্য। এবার সেটি ছাপিয়ে প্রথমবারের মতো সোনালি হাসি মেখে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা।
জাতীয় পর্যায়ে এবার তার পারফরম্যান্স আরও দুর্বার। বালক এককে ফাইনালে নাফিস ইকবালকে উড়িয়ে দেন ৪-০ সেটে। সিনিয়র এককেও ইমরুল কায়েস ইমনকে গুঁড়িয়ে দেন একই ব্যবধানে। জয়ের ধরনের ছাড়িয়ে গেছেন তিনি এমনকি নিজের প্রত্যাশাকেও।
“বালক এককে যখন জিতলাম, তখন মনে হচ্ছিল সিনিয়রদের এককেও পারব। তেমন একটা চাপ অনুভব করিনি, আমি শুধু নিজের চেষ্টা করে গেছি। তবে ফাইনালে ৪-০ সেটের জয় পাব, এতটা ভাবিনি।”
ভাবনায় এখন এসএ গেমস
টেবিল টেনিসের ভেলায় চেপে এর মধ্যেই অনেকগুলো দেশ ভ্রমণ করেছেন রামহিম-কাতার, ওমান, ইংল্যান্ড, তুরস্ক, লাওস, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভারত। সাফল্যও পেয়েছেন বেশ। ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ দলের নামকরা খেলোয়াড় অভিনন্দনকে হারানোর তৃপ্তিও আছে রামহিমের।
এখন তার ভাবনায় দক্ষিণ এশিয়ান গেমস, যে আসরে এখনও পর্যন্ত রুপাও জেতা হয়নি বাংলাদেশের। এ পর্যন্ত পাওয়া ১০টি পদকই ব্রোঞ্জ। সেই গেরো আগে ছোটাতে চান রামহিম।
“এসএ গেমসে আমরা বরাবরই ব্রোঞ্জ পেয়ে থাকি। সামনে যদি রুপা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সোনার পদকের জন্য লড়ব। ভারত কত পদক পায়! আমার মনে হয়, ওরা যদি পারে, আমরাও কেন পারব না…।”
সেই লক্ষ্য পূরণের পথে এগোতে ফেডারেশনের কাছে কিছু চাওয়াও জানিয়ে রাখলেন রামহিম।
“আমাদের আরও সুবিধা দিতে হবে, তাহলে আমরা আরও ভালো করতে পারি। আরও উন্নতমানের কোচ, প্র্যাকটিস পার্টনার, আরও ঘরোয়া বেশি টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ, তাহলে আমরা নিজেদের গুছিয়ে রাখতে পারব, বাইরের টুর্নামেন্টগুলো খেলতে হবে নিয়মিত।”
পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে একদিন বিশ্বমঞ্চেও দেশের গৌরবগাঁথা রচনা করতে পারবেন বলে বিশ্বাস তার।
“ভালো মানের প্র্যাকটিস পার্টনার থাকলে আমরা আরও বেশি প্রস্তুতি নিতে পারি। আগে এটা ছিল বলেই আমরা ভালো প্রস্তুতি নিতে পেরেছি। যে কারণে গত সাউথ এশিয়ান টিটি চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো করতে পেরেছি। আমার লক্ষ্য প্রথমে আঞ্চলিক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভালো করা, এরপর এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ।”