ব্রাজিলিয়ান ক্লাবের চমকপ্রদ জয়, সিলভার ‘ডাবল’ খুশি
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রানার্স আপ ইন্টার মিলানকে বিদায় করে দারুণ বিস্ময় উপহার দিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছে গেছে ব্রাজিলের ক্লাব ফ্লুমিনেসি।
বর্ণাঢ্য ক্লাব ক্যারিয়ারে সাফল্য কম পাননি চিয়াগো সিলভা। ট্রফিই জিতেছেন ৩০টি। পিএসজির হয়ে শিরোপার পর শিরোপা জিতেছেন, এসি মিলানের হয়ে জিতেছেন সেরি আ, চেলসির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। এখন এই ৪০ বছর বয়সে এসে এমন এক জয়ের স্বাদ পেলেন, তার ঝলমলে ক্যারিয়ারে যা আলাদা মাইলফলক হয়ে থাকবে। নাহ, শিরোপা জেতেননি। তবে তার দল ফ্লুমিনেসি হারিয়ে দিয়েছে ইন্টার মিলানকে!
ক্লাব বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্মরণীয় এই জয় পেয়েছে ফ্লুমিনেসি। এবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রানার্স আপ, ইউরোপের পরাশক্তি ইন্টার মিলানকে ২-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছে গেছে ব্রাজিলের ক্লাবটি।
নর্থ ক্যারাইলোনার শার্লটে ব্যাংক অব আমেরিকা স্টেডিয়ামে সোমবার বল নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াইয়ে ইন্টার ছিল যোজন যোজন এগিয়ে (৬৯ শতাংশ)। কিন্তু দুই দলই লক্ষ্যে শট রাখে সমান চারটি করে। এর দুটি কাজে লাগিয়ে আসল কাজটি করে ফ্লুমিনেসি, ব্যর্থ হয় ইন্টার।
ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই জন আরিয়াসের ক্রসে খুব কাছ থেকে হেড করে ফ্লুমিনেসিকে এগিয়ে দেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হের্মান কানো। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে দলকে মাতিয়ে তোলেন এহকুলেস।
গ্রুপ পর্বে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে রুখে দিয়েই বেশ চমক দিয়েছিল ফ্লুমিনেসি। পরে অপরাজিত থেকে গ্রুপ পর্ব পেরোয় তারা। এবার ইন্টার মিলানের বিপক্ষে পারফরম্যান্সে দলটি প্রমাণ করল নিজেদের সামর্থ্য।
দলটি এগিয়ে চলেছে অভিজ্ঞতার ভেলায়। এসি মিলান, পিএসজি ও চেলসির মতো ক্লাবে বছরের পর বছর রাঙিয়ে এখন এই ৪০ বছর বয়সেও রক্ষণভাগের দেয়াল হয়ে আছেন সিলভা। এই টুর্নামেন্টে এখনও পর্যন্ত তার পারফরম্যান্স অসাধারণ।
দলটি চার ম্যাচে গোল হজম করেছে স্রেফ দুটি। রক্ষণভাগে আস্থার প্রতিশব্দ হয়ে আছেন ৪৪ বছর বয়সী গোলকিপার ফাবিও।
দুর্দান্ত খেলেছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হের্মান কানো। দলের সেরা ফুটবলার অবশ্য জন আরিয়াস। কলম্বিয়ান এই উইঙ্গারকে মনে করা হচ্ছে এখনও পর্যন্ত আসরের সেরা ফুটবলার। এই ম্যাচেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল।
তারকাখ্যাতির বিচারে সিলভার ওপর আলো বেশি পড়ছে স্বাভাবিকভাবেই। এই ম্যাচে তার প্রাপ্তিও ছিল একটু বেশি। অধিনায়ক হিসেবে দলের জয় তা আছেই। সঙ্গে আছে পুরোনো শত্রুর বিপক্ষে জয়ের আনন্দও। ২০০৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এসি মিলানে খেলেছেন তিনি। তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব ইন্টার মিলান!
এত বছর পর এসি মিলানের সমর্থকদের আনন্দের উপলক্ষ হতে পারা সিলভার জন্য ছিল বাড়তি তৃপ্তির।
“এই কথাটি আমি ভাবছিলাম, এখানে বসে মিলানের কথা ভাবছিলাম। আমি নিশ্চিত, মিলানের সমর্থকেরা খুশি হবেন ইন্টারের এই পরাজয় ও আমাদের দারুণ জয়ে।”
চিয়াগো সিলভা বললেন, নিজেদের সামর্থ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইন্টার মিলানকে হারাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তারা।
“আমাদের জন্য দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ফল এটি। আমরা জানতাম, খুব সহজ ম্যাচ হবে না এটি। এক মাসও হয়নি, তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে খেলেছে। তবে আমরা আজকে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ খেলেছি। জিততে হলে এমন পারফরম্যান্সই জরুরি ছিল, এমন কিছু অর্জন করতে হলে আর কোনো পথ ছিল না।”
“আমরা সবসময়ই একতাবদ্ধ ছিলাম মাঠে, রক্ষণভাগে আমরা অসাধারণ একটি ম্যাচ খেলেছি। তারাও আমাদের কাজ কঠিন করে তুলেছে। কখনও কখনও অবশ্য কিছু ঘাটতি ছিল আমাদের, তবে এরকম একটি প্রতিপক্ষের সঙ্গে তা খুবই স্বাভাবিক।”
ফ্লুমিনেসির সাফল্যের নেপথ্য কারিগর কোচ হেনাতো গাউচো। অভিজ্ঞ এই কোচ একসময় এই ক্লাবে খেলেছেন। পরে খেলোয়াড়ি জীবন শেষে অল্প বয়সেই নাম লিখিয়েছেন কোচিংয়ে। প্রায় ৩০ বছরের কোচি ক্যারিয়ারে ফ্লুমিনে ক্লাবের দায়িত্বেই ছিলেন নানা সময়ে আগে সাত দফায়!
অষ্টমবারের মতো দায়িত্ব নেন তিনি এই মাস তিনেক আগে। এত দ্রুত দলকে বদলে দেওয়ার পেছনে ফুটবলারদেরই কৃতিত্ব দিলেন ৬২ বছর বয়সী কোচ।
“যদিও সময় খুব কম ছিল, তারপরও ফুটবলাররা যেভাবে নতুন পরিকল্পনাকে আলিঙ্গন করে নিয়েছে, তাদের প্রশংসা করতেই হবে। তাদেরকে আমি বোঝাতে পেরেছি যে, এটা কার্যকর হবে।”
নাম ও শক্তির ধারে-ভারে ইন্টার অনেক এগিয়ে থাকলেও দলকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছিলেন ফ্লুমিনেসি কোচ।
“আমরা আজকে আর দশটি দলের মতো কোনো দলের সঙ্গে লড়িনি। ইউরোপিয়ান ফুটবলের বড় দলগুলির একটি, যারা কিছুদিন আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলেছে, তাদের সঙ্গে লড়েছি।”
“ইন্টার অবশ্যই দুর্দান্ত দল। আমাদের চেয়ে তাদের টাকা আছে অনেক বেশি। তবে মাঠে তো লড়াইটা ১১ জনের সঙ্গে ১১ জনেরই। আমাদের দল বিশ্বাস হারায়নি, কঠিন লড়াই করেছে এবং ৯০ মিনিট মনোযোগ ধরে রেখেছে।”
ফ্লুমিনেসির এই চমকের পর দিনের আরেক ম্যাচে ম্যানচেস্টার সিটিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে বিস্ময় উপহার দিয়েছে আল হিলাল।
ব্রাজিলের ফ্লুমিনেসি ও সৌদি আরবের আল হিলালের সামনে এখন সেমি-ফাইনালের হাতছানি। আগামী শনিবার সেই লক্ষ্যে লড়বে এই দুই দল।
