Published : 18 Jun 2026, 12:11 AM
দেশজুড়ে ছয় থেকে পাঁচ বছর বয়সি শতভাগ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার সরকারি দাবির প্রায় চার সপ্তাহ পরেও সংক্রমণ কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতির দিকে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের চার সপ্তাহ পর শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তাতে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে কমার কথা থাকলেও সেটি হয়নি।

তাদের দাবি, টিকার ‘কাভারেজ’ শতভাগ হলে অবশ্যই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতো। সেটি যেহেতু হয়নি, তাই টিকা ‘কাভারেজে’ ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে কোন বয়সি শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বিষয়ে সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং হাম মোকাবিলায় গাইডলাইন না থাকায় এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির (এনভিসি) চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বিডিনিউজ টোন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টিকা কাভারেজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার পর যে হারে হাম সংক্রমণ কমার কথা ছিল, তেমনটা আমরা দেখছি না। তবে এখন দেখার বিষয় হাম আক্রন্ত শিশুদের বয়স। আসলে কোন বয়সের শিশুরা এখন আক্রন্ত হচ্ছে। হাম রোগীদের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকা খুবই জরুরি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারাদেশের হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর সমন্বিত তথ্য দিয়ে আসছে গেল ১৫ মার্চ থেকে। সরকারি এই তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৬৬১ শিশুর। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজারের কাছাকাছি। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬৩৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে সরকার প্রথম দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকাদান শুরু হয় ৫ এপ্রিল। এরপর চারটি সিটি করপোরেশনে টিকাদান শুরু হয় ১২ এপ্রিল। আর ২০ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে শেষ হয় দেশব্যাপী হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি।
গেল ১০ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লক্ষ্যের ৯৯ শতাংশ ‘কাভারেজ’ বা শিশুকে টিকাদান সম্পন্ন হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়। আর টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শেষ করার পর ১০৩ শতাংশ ‘কাভারেজের’ তথ্য দেওয়া হয়।

সংক্রমণ কী কমল?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গেল ৫ এপ্রিল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৭৪। বিভাগওয়ারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ৩৯২ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ২৬৯ জন। রাজশাহীতে ১২৪ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৭৭ জন। সিলেটে ৪৬ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩৫ জন। বরিশালে ৪৯ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৩৫ জন। চট্টগ্রামে ১৯৫ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৩১ জন। ময়মনসিংহে ৪৯ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ২৩ জন; খুলনায় ৮২ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৭৩ জন। রংপুরে ৩৭ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১১ জন।
সেদিন সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৯০ জন রোগী থাকার তথ্য দেওয়া হয় বুলেটিনে।
৫ মে এর বুলেটিন অনুসারে, একদিনে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮৬। ঢাকা বিভাগে ৫৪৫ জন রোগীর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪১৭ জন; রাজশাহীতে ১৭৪ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৮২ জন; সিলেটে ৬৭ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৬৩ জন; বরিশালে ৫৯ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৯৭ জন; চট্টগ্রামে ২০৪ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৯৭ জন; ময়মনসিংহে ১৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৩ জন; খুলনায় ১১৫ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ১১৫ জন; রংপুরে ৯ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৫ জন।
সেদিন সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৪৬৩ জন রোগী ভর্তি ছিল।
১৭ জুন, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ৯৬৬, তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৭২ জন।
বিভাগওয়ারি হিসাবে, ঢাকা বিভাগে ৪০৬ জন রোগীর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩১৫ জন; রাজশাহীতে ৪৮ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৫০ জন; সিলেটে ৫৬ জনের মধ্যে সবাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; বরিশালে ১১০ জনের সবাই এবং চট্টগ্রামে ২১৩ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১০ জন; ময়মনসিংহে ৫২ জনের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫২ জন; খুলনায় ৫৪ জনের সবাই এবং রংপুরে ২৭ জনের মধ্যে ২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময় সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩ হাজার ৫৮৯ জন রোগী।
তিনটি ভিন্ন সময়ের চিত্র:
|
৫ এপ্রিল |
৫ মে |
১৭ জুন |
||||
|
|
হাসপাতালে রোগী |
ভর্তির সংখ্যা |
হাসপাতালে রোগী |
ভর্তির সংখ্যা |
হাসপাতালে রোগী |
ভর্তির সংখ্যা |
|
ঢাকা |
৩৯২ |
২৬৯ |
৫৪৫ |
৪১৭ |
৪০৬ |
৩১৫ |
|
রাজশাহী |
১২৪ |
৭৭ |
১৭৪ |
৮২ |
৪৮ |
৫০ |
|
সিলেট |
৪৬ |
৩৫ |
৬৭ |
৬৩ |
৫৬ |
৫৬ |
|
বরিশাল |
৪৯ |
৩৫ |
৫৯ |
৯৭ |
১১০ |
১১০ |
|
চট্টগ্রাম |
১৯৫ |
১৩১ |
২০৪ |
১৯৭ |
২১৩ |
২১০ |
|
মংমনসিংহ |
৪৯ |
২৩ |
১৩ |
১৩ |
৫২ |
৫২ |
|
খুলনা |
৮২ |
৭৩ |
১১৫ |
১১৫ |
৫৪ |
৫৪ |
|
রংপুর |
৩৭ |
১১ |
৯ |
৫ |
২৭ |
২৫ |
প্রথম ২১ দিনে অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন ৩৬২ জন সংক্রমিত হয়, মৃত্যু হয় গড়ে ৬ জনের বেশি। এরপর ৫১ দিনে অর্থাৎ ৫ মে পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৮৪২ জন সংক্রমিত হয় এবং মারা যায় ৬ জনের বেশি। আর ১৭ জুন, বুধবার পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৯৩৬ জন সংক্রমিত এবং প্রায় ৭ জন করে মারা যায়।

চলতি মাসের শুরু থেকে দিনের হিসাবে নিশ্চিত হাম রোগীর মৃত্যু কমলেও এর রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু কমেনি। হাম শনাক্তের সংখ্যা কমে এলেও হাসপাতালে রোগী আসা কমেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, টিকা ‘কাভারেজ’ ৯৯ শতাংশ হয়ে যাওয়ার পর চার সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে।
যে কারণে হাম নিয়ন্ত্রণে না আসায় ‘কাভারেজ’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের দাবি, “হামের সংক্রমণ রোধে আমরা সর্বোচ্চ কাজ করেছি। যার ফলে জুন মাসের শুরু থেকে হামের ‘পিক কার্ভ’ থেকে সব কিছু নিচের দিকে আসছে।”
গত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে নিশ্চিত হামে মৃত্যু নেই দাবি করে তিনি বলেন, হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা আগে এক দিনে প্রায় ১৫শ’র মতো ছিল, যেটা বর্তমানে ১ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। সার্বিক মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে।
তার দপ্তরের বুলেটিন বলছে, ১ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের, ‘সন্দেহজনক’ হামে মারা গেছে ৬৯ শিশু। তার আগের ১৫ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ১০৮ জন শিশু, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয় ১৪ শিশুর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ডব্লিউএইচও এর তথ্য অনুসারে, ২০০৫ সালে ২৫ হাজারের বেশি শিশু রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর আর এত বেশি শিশু কোনো বছরই আক্রান্ত হয়নি।
গেল ১২ এপ্রিল ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) এবং ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির (এনভিসি) যৌথ সভায় বিশেষজ্ঞরা হামের মৃত্যুর বিষয়ে সবাই একমত হন যে, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় হামের উপসর্গ থাকলে সবই হাম রোগে মৃত্যু।
এনভিসির চেয়ারপারসন মাহমুদুর রহমান বলেন, “দেশে হামের যে পরিস্থিতি তাতে আর উপসর্গে নয় বরং যাদের শরীরে ন্যূনতম হামের উপসর্গ দেখা দিয়ে মারা যাচ্ছে তারাও ‘নিশ্চিত’ হাম রোগে মারা যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেন ‘সন্দেহজনক’ মৃত্যু বলছে, সেটা জানা নেই।”

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সরকারের তরফে টিকা ‘কাভারেজ’ ৯৯ শতাংশ হওয়ার দাবি আসার ১০ দিনের মাথায় আবার বুলেটিনে বলা হয়, দেশের আট বিভাগে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন ‘টার্গেট’ শিশুর বিপরীতে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪২ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ টিকার ‘কাভারেজ’ ১০৩ শতাংশ।
তবে এই ‘কাভারেজ’ সঠিক বলে মানছে না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টিকা পাওয়ার উপযুক্ত সব শিশু ‘টার্গেটের’ আওতায় নাও আসতে পারে। কারণ কোনো এলাকায় ৯৫ শতাংশ টিকা ‘কাভারেজ’ হলে সেখানে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারি যে টার্গেট শিশু তারা ‘কাভারেজের’ অংশ হয়েছে। সেখানে দেশের সব শিশু অন্তর্ভুক্ত নাও থাকতে পারে।
“সর্বশেষ ক্যাম্পেইনের আগে পর্যাপ্ত সময় পায়নি, তাই হয়তো ‘মাইক্রোপ্ল্যানে’ অনেক শিশু বাদ পড়েছে। কিন্তু মহামারী মোকাবিলায় সবাইকে টিকা দেওয়া জরুরি।”
সরকারি টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে বলছেন আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটি এলাকায় টিকার কাভারেজ যদি ৯৫ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে সেই এলাকায় হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
সরকারের ১০০ শতাংশের বেশি ‘কাভারেজের’ দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, “টিকার কাভারেজ সরকার যা বলছে তা হয়তো সঠিক নয়। কারণ শতভাগ টিকা কাভারেজ হলে এত সময় পর অবশ্যই হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতো, যেটি হয়নি। এটি থেকে বোঝা যায়, টিকার ‘কাভারেজে’ সমস্যা আছে।”
টিকার কার্যকারিতা বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে দুই ধরনের IgG (ইমিউনোগ্লোবুলিন জি) ও IgA (ইমিউনোগ্লোবুলিন এ) নামে অ্যান্টিবডি পরোক্ষভাবে পায়। IgG গর্ভকালীন সময়ে শিশু মায়ের কাছ থেকে অমরা বা ‘প্লাসেন্টার’ মাধ্যমে পায়। আর IgA জন্মের পর মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যায়।
তিনি বলছেন, “এই মাতৃপ্রদত্ত অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর জীবনের শুরুর দিকে টিকার কার্যকারিতায় কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাম টিকার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।”
এর ব্যাখ্যায় এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুর ছয় মাসে বয়সে টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৫০ শতাংশ, নয় মাসে প্রায় ৮৫ শতাংশ, ১২ মাসে প্রায় ৯০ শতাংশ, ১৫ মাসের বেশি বয়সে প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ৪–৬ বছর (প্রাক-প্রাথমিক স্কুলগামী বয়স) এ টিকা প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কাজ করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের দাবি, টিকার ‘কাভারেজ’ খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
“যার ফলে বর্তমানে হামের সংক্রমণ, নিশ্চিত হাম রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। আর হাম একবারে কমে যাবে না। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। আশা করি, জুন মাসের শেষে একেবারে কমে যাবে।”

‘তথ্য-উপাত্তের ঘাটতিও দায়ী’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাম শনাক্ত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাম উপসর্গের রোগী দেখা যায়। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায়। এরপর গত ১৫ মার্চ থেকে সরকারি ভাবে হামের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকাশ করা শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তবে অধিদপ্তর বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করছে না, যার ফলে হামের সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “বর্তমানে আসলে কোন বয়সি শিশু এবং কোন এলাকার শিশুরা বেশি হামে আক্রান্ত হচ্ছে, সেটির তথ্য নেই। এটি থাকলে মহামারী পরিস্থিতি বোঝা যেত।
“কারণ যদি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হয়, তাহলে আমাদের ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ তাদের টিকা দেওয়া হয়নি। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আরো বিস্তারিত ‘স্টাডি’ হওয়া প্রয়োজন।”
অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “হামের বর্তমান রোগীদের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার ফলে আরো কঠিন হচ্ছে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে। কারণ সঠিক তথ্য থাকলে, কোন এলাকা থেকে রোগী আসছে সেটি জানা থাকলে, ওই এলাকায় আবার টিকার কাভারেজ চেক করা, কোন বয়সিরা আক্রান্ত হচ্ছে এসব দেখা যেত।
“সব মিলিয়ে তথ্যগত ঘাটতির কারণে মহামারী দীর্ঘ হচ্ছে। আর এসব তথ্য থাকলে ভবিষ্যতেও কাজ করা সহজ হতো।”

জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা কতদূর?
সবশেষ ১৭ জুন, বুধবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৯৩৬ জন সংক্রমিত এবং প্রায় ৭ জন করে মারা যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে হাম মোকাবিলায় একটি জাতীয় নির্দেশিকা বা ‘গাইডলাইন’ থাকলে মৃত্যু এবং সংক্রমণের হার কম হতো বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, নির্দেশিকা থাকলে ‘একই ধরনের’ চিকিৎসাসেবা দেওয়া যেত, যার ফলে কমে আসত শিশুমৃত্যুর সংখ্যা।
নির্দেশিকায় মূলত কোনো রোগ প্রতিরোধ করা, শনাক্তকরণ বা চিকিৎসার বিষয়ে নির্দেশনা থাকে। এটি নানা গবেষণা, বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়।
হাম মোকাবিলায় গত ২৭ এপ্রিল একটি বিশেষ টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদকে প্রধান করে এই কমিটি গঠিত হয়।
ডা. হালিমুর রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত তিন সপ্তাহের কাজে আমরা একটি ‘গাইডলাইন’ তৈরি করেছি। এটি একটি ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন’ হওয়ায় বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে অনুমোদিত হওয়ার কথা, সেটি এখনো হয়নি। আমরা ‘গাইডলাইন’টি কমিটির কাছে পাঠিয়ে রেখেছি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বলেন, “আমাদের গাইডলাইন তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এটা অনুমোদন হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির বলেন, “একটা জাতীয় ‘গাইডলাইন’ এবং বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হলে অবশ্যই মৃত্যু আরো কম হতো।”
প্রতিদিন হামে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, এটি স্বাভাকি কোনো বিষয় নয় মন্তব্য করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “হাম মোকাবিলায় ‘গাইডলাইন’ জরুরি ছিল, যেটা এখনো হয়নি। এটি থাকলে এত শিশুর মৃত্যু হতো না এবং আরো আগে মৃত্যু ঠেকানো যেত।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
গত ১৫ মার্চ থেকে সরকার হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর সমন্বিত তথ্য প্রকাশ শুরু করে, সেই হিসাবে ৯৩ দিন পার হলেও এখনো হামের সংক্রমণ সেভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়নি।
সংক্রমণ এবং মৃত্যুর দায় এড়াতে বিগত সময়ের অব্যবস্থাপনাকে সব সময় সামনে আনা হচ্ছে। তবে হাম নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার দায় সরকার এড়াতে পারে না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেন, “যেসব রোগী মারা যাচ্ছে, এটার দায় বর্তমান সরকারের। কারণ সরকার একটা দীর্ঘ সময়ে মহামারী ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।”
কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে মরামারী ঠেকানো বা হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যেত? জবাবে তিনি বলেন, “একটা রিভিউ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন, যারা হামের সংক্রমণ থেকে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত সব কিছুর তদারকি করবে এবং যেসব জায়গায় দুর্বলতা আছে সেগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।”
হামের বর্তমান পরিস্থির জন্য সরকারের দায় দেখছেন মুশতাক হোসেনও।
স্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “হামে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু সরকার এখনো স্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছে না। বরং সবাই অতিরিক্ত দায়িত্ব বা কাজ বাড়িয়ে দিয়ে মহামারী ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এ কারণে এখনো মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসছে না।”
তার মতে, “স্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা হলে সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে পারতো। এতে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা সহজ এবং স্বল্প সময়ে সম্ভব হতো।”
জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা হামের তথ্য প্রকাশ করে শুরু থেকে সব কিছু জানিয়ে দিচ্ছি। বর্তমানে এটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আর জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ সবকিছু জানিয়েই আমরা সর্বোচ্চ কাজ করছি।”
আগের খবর:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য 'বিভ্রান্তিকর', হামে মৃত্যু আসলে কত?
‘জোড়াতালি’ দিয়ে চলছে হাম মোকাবিলা, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ‘উপেক্ষা’
হামের রোগী ফেরত না পাঠানোর নির্দেশনা কতটা মানতে পারছে হাসপাতালগুলো?