Published : 27 Apr 2026, 12:26 AM
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম-উপসর্গের রোগীকে অন্যত্র ফেরত না পাঠাতে এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশনা দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
একাধিক হাসপাতালের প্রধানরা বলেছেন, হুট করেই শয্যা বাড়ানো সম্ভব হয় না। এর জন্য জনবলসহ অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। তবে তারা ‘চেষ্টা করছেন’ যাতে হামের রোগীদের ফেরত পাঠাতে না হয়।
আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে।
ছয় মাস বয়সী সিনথিয়াকে নিয়ে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে এসেছিলেন তার বাবা রুবেল। তিনি জানালেন, কয়েক দিন ধরে বাচ্চার জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও গায়ে র্যাশ উঠেছে।
হাসপাতাল থেকে ফিরে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “ডাক্তাররা দেখে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আর যদি র্যাশ না কমে, তাহলে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছে।”
হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে দেওয়া সিনথিয়ার ব্যবস্থাপত্রের নিচে লেখা দেখা যায় ‘রেফার্ড টু শিশু হসপিটাল’।
গত ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এক জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, দেশের কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম-উপসর্গের রোগীকে অন্যত্র ফেরত পাঠানো যাবে না। হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলেও রোগী ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে।
তারপরও কেন সিনথিয়াকে ফেরত পাঠানো হল জানতে ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তার কক্ষের বাইরে থাকা একজন কর্মী বলেন, পরিচালক শনিবার ছাড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি হামের রোগী ভর্তি আছে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ডিএনসিসি হাসপাতালে। কর্মকর্তারা বলছেন, সব হাসপাতালেই এখন ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি যে কোনোভাবে রোগীদের ভর্তি নিতে। বেড এবং বারান্দায় রোগী রয়েছে। বর্তমানে হামের ডেডিকেটেড বেড ২৫টি, কিন্তু এর দ্বিগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে।”
বেড বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বেড বাড়ানোর জন্য অক্সিজেন, স্পেসহ আরো কিছু জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয়। নতুন বেড বাড়ানো না গেলেও অন্য রোগের ডেডিকেটেড বেড হামের রোগীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার হচ্ছে।”
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, “নতুন শয্যা বাড়ানোর জন্য স্পেস দরকার, সেটা এই মুহূর্তে বা এত দ্রুত করা সম্ভব নয়।”
তিনি জানান, এ হাসপাতালে হামের জন্য ডেডিকেটেড ৭০টি শয্যার বিপরীতে ৮২ জন ভর্তি আছে।
“আমরা অন্য পেইং বেড হামের রোগীদের জন্য নতুন করে দেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে রোগী ফেরত পাঠাতে না হয়।”
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমরা এমনিতে হামের রোগীদের ফেরত পাঠাই না। তবে এখানে শিশু ওয়ার্ডের ক্যাপাসিটি ২০০ জনের। যার মধ্যে ১৪০ প্লাস হামে আক্রন্ত শিশু আছে। সব মিলিয়ে ক্যাপাসিটির চেয়ে বেশি রোগী প্রায় সব সময়ই ভর্তি থাকে।”

আইসিইউয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানে শিশুদের জন্য ১২টি আইসিইউ বেড ছিল, সেটা বর্তমানে ১৮ বেডে উন্নিত হয়েছে। এ ছাড়া আমরা ১০০ শয্যা আইসিইউ বেডের চাহিদা দিয়েছি মন্ত্রণালয়কে।”
এসব বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানকে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন অনুসারে দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫। যার মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১ লাখের বেশি শয্যা রয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে আইসিইউর সংখ্যা ১৬ শর বেশি। তবে ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ: আ প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা ২৮৫৬টি।
এদিকে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি প্রায় ৩০ লাখ। জনসংখ্যা বিবেচনায় দেশের ১ হাজারের বেশি মানুষের বিপরীতে একটি শয্যা (অর্থাৎ ০.০৯৯ শতাংশ) এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বিপরীতে একটি আইসিইউ (অর্থাৎ ০.০০১৬৫ শতাংশ) রয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর মেশিন ও এ সংক্রান্ত জরুরি সেবা রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার।
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে এক হাজার ৬২০টির মতো আইসিইউ শয্যা রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কোভিড পরবর্তী সময়ে দেশের জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বেড বৃদ্ধির একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি হাসপাতালে হওয়ার পর বিষয়টি আর এগোয়নি। বিভাগীয় পর্যায়ে ডেডিকেটেড শিশু হাসপাতাল নির্মাণ হলেও জনবল সংকটের কারণে চালু হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, শুধু হাসপাতালের বেড বাড়ালই চলবে না। সব ধরনের সুযোগ সুবিধাও বৃদ্ধি করতে হবে। আরো বেশি হাসপাতালে হামের রোগী ভর্তি ব্যবস্থা করতে হবে৷
হামের বিষয়ে সরকার ‘ঠেকা দেওয়ার মত’ জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ভালো ব্যবস্থা আছে, কিন্তু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নাই। জরুরি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কিছু কীভাবে ম্যানেজ করা যায়, টাকা খরচ করা যায় এবং দুর্নীতি ঠেকানো যায়–সব ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোভিডের পরও আমরা শিখতে পারিনি মহামারী কীভাবে ঠেকাতে হয়।”