Published : 04 May 2026, 01:15 AM
হাম নিয়ে স্মরণকালে এমন ‘বিপর্যয়কর’ পরিস্থিতিতে পড়েনি বাংলাদেশ; বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত ও মৃত্যুর জন্য বিগত দুই সরকারকে দায় দিয়ে নিজেদের কাঁধে দোষ রাখছে না বিএনপি সরকার। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘যে ধরনের ব্যবস্থাপনা’ দরকার, সেদিকে সরকার কতটা মনোযোগী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
হাসপাতালের চিকিৎসক, পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও একধরনের সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে আসছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে দেড় মাসে ২৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার তিনশর বেশি শিশুর শরীরে ছোঁয়াচে রোগটি শনাক্ত হয়েছে আর সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হলেও এক অর্থে মহামারী হিসেবে বর্তমান বাস্তবতাকে বর্ণনা করতে চান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
এ অবস্থায় গত মাসের শুরুতে বৈঠকে বসে ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন (এনভিসি)। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত এই কমিটির কাজ হচ্ছে- দেশের হাম–রুবেলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিশনকে অবহিত করা।
ওই বৈঠক থেকে কোনো এলাকায় রোগটি শনাক্ত হলে সেখানে আপাতত আর পরীক্ষা করার দরকার নেই বলে সুপারিশ করা হয়। কারো উপসর্গ দেখা দিলেই আইসোলেশনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এর পরপরই বৈঠক করে টিকাবিষয়ক দেশের সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ)। এনভিসির সুপারিশের সঙ্গে নাইট্যাগ একমত প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে আরেক সুপারিশে তারা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের তাগিদ দেয়। সম্প্রতি সেই কমিটি গঠন করা হলেও তা ‘কার্যকর’ হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দেশে গ্রামের অনেক মানুষ আছে, যারা আইসোলেশন সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না; একটু লক্ষণ দেখা দিলেই হাসপাতালে চলে আসছেন৷ তাই প্রতিটি হাসপাতালের মধ্যে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার নির্দেশনা দিয়েছি৷
“এমনিতে দেশের যে ঘনবসতি, তাতে কোনো শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে আলাদা রাখতে হবে৷ এসব কথা ওয়ান টু ওয়ান বলা কঠিন। তবে সেবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টাই করছি।”
এদিকে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চলার মধ্যে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) প্রধানকেই সরিয়ে (ওএসডি) দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্তরে জনবল ঘাটতি থাকাতও এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানামুখী জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আর প্রাদুর্ভাব হয়ে দেখা দেওয়া রোগটি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তুলে ধরেছেন সৎশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতা বাস্তবে এক ধরনের মহামারীরই ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে আরো আগেই ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করা দরকার ছিল, কিন্তু সরকার সেটি করেনি। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামের এই অবস্থায় দেশে স্বাস্থ্যের বিষয়ে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা প্রয়োজন, যাতে সবাই সবার মতো স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সরকারের অনেকে মনে করেন, এটি করলে হয়তো কারো কারো ক্ষমতা কমে যাবে, তাই এটি না করে অলিখিত জরুরিভাবে সব কাজ করছে।
“মোটাদাগে আগুন লাগার পর নেভানোর কাজ যেভাবে হয়, সেভাবে হচ্ছে। তবে কোভিড পরবর্তী সময়েও আমরা মহামারীতে কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটি শিখলাম না।”

হামের এই পরিস্থিতি যেভাবে
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগটি নিয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্যউপাত্ত সংরক্ষণ শুরু করে। এর মধ্যে হাম ও উপসর্গ রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এর আগে গত ২০ বছরে হামে এতো আক্রান্ত দেখেনি বাংলাদেশ।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে, ২০০৫ সালে ২৫ হাজারের বেশি শিশু রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর আর এত বেশি শিশু কোনো বছরই আক্রান্ত হয়নি।
ইপিআই কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্যবিদ ও চিকিৎসকরা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়া, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান না করানো ও অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এ প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
৯ থেকে ১৫ মাস বয়সি শিশুদের হামের দুটি টিকা দেওয়া হলেও অতিরিক্ত হিসাবে প্রতি চার বছর পরপর অতীতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার বছর ২০২৪ সালে তা হয়নি। এর আগে ২০২০ সালে কোভিডের কারণে ওই বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি। আর অস্থিরতার সময়ে ২০২৪ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও সেভাবে পরিচালিত হয়নি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, চলতি বছরের শুরুতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ও পরে ঢাকার বস্তিতে এই রোগে প্রথম শিশুদের আক্রান্তের কথা জানা যায়।
রাজশাহীতে আইসিইউ সংকটে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তা সবাইকে নাড়িয়ে দেয়। মৃতদের মধ্যে ১০ জনের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়। এরপর রাজশাহী অঞ্চলে এ রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার খবর আসে।

বিশেষ কমিটির সুপারিশ ‘উপেক্ষা’
হাম–রুবেলা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যে বিশেষ কমিটি রয়েছে, সেই ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশন (এনভিসি) সবশেষ গঠিত হয় ২০১৭ সালে। অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের এ কমিটি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল বৈঠক করে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই সভায় নেওয়া সুপারিশে বলা হয়, কোনো উপজেলায় রোগী শনাক্ত হলে সেখানে কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বরং হামের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি প্রাথমিকভাবে বাড়িতে এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে হবে।
এরপর ১২ এপ্রিল এনভিসির সঙ্গে যৌথসভা করে টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমুনাইজেশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইট্যাগ)। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, নাইট্যাগ চেয়ারপারসন ফিরদৌসী কাদরী।
সভায় নেওয়া দুই সুপারিশে বলা হয়, এনভিসির সুপারিশের সঙ্গে নাইট্যাগ একমত প্রকাশ করছে। অন্যটিতে বলা হয়, শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটির কাজ হবে রোগ শনাক্তের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দেওয়া।
এ সভার দুই সপ্তাহ পর গত ২৭ এপ্রিল বিশেষ কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে সদস্যদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির একজন সদস্য।
এনভিসির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান শুরু হয়েছে।
“তবে টিকাদানের পাশাপাশি হাম মোকাবিলার জনস্বাস্থ্যবিধির বহুল প্রচার দরকার ছিল, সেটা হয়নি।”
ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলায় সম্প্রতি একাধিক কর্মকর্তাকে ওএসডি হয়েছে। টিকা, স্বাস্থ্যসহ সব বিষয়ে কথা বলার বিষয়ে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
১২ এপ্রিলের সভায় অংশ নেওয়া একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, দেশে হাম মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো টিকাদান, সেটি শুরু হয়েছে। কিন্তু টিকাদানের বিষয়টি বাস্তবায়ন করে যে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), তার প্রধানকে গত ৯ এপ্রিল ওএসডি করা হয়েছে। সেখানে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তাছাড়া ইপিআইয়ের অন্যান্য জনবল পূরণেরও কোনো উদ্যোগ নেই।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা হচ্ছে কীভাবে?
গত ৮ এপ্রিল এনভিসির তরফে কিছু সুপারিশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইপিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়। এর মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলেই আইসোলেশনের ব্যবস্থা করার সুপারিশ বাস্তবায়নে বা জনসচেতনতা তৈরিতে বাস্তবসম্মত তেমন উদ্যোগ নিতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তবে দেশের সব হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসায় শয্যা বাড়ানো ও রোগীদের ফেরত না পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে অধিদপ্তর। জরুরি এ নির্দেশনায়, প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে কয়েকটি হাসপাতালের প্রধানরা বলছেন, এভাবে চাইলেই হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো যায় না। এজন্য অক্সিজেন, জায়গাসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার। তবে তেমন কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি।
তবে নতুন করে শয্যা বাড়ানো না গেলেও অন্য রোগের জন্য নির্ধারিত শয্যা হামের রোগীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল আলম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, রোগী ফেরত না পাঠাতেই এ ব্যবস্থা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, শুধু হাসপাতালে বেড বাড়ালেই চলবে না। সব ধরনের সুযোগ সুবিধাও বাড়াতে হবে। আরো বেশি হাসপাতালে হামের রোগী ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে শিশু হাসপাতালের পরিচালক মাহবুবুল বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করেই শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছি। শিশুদের ইমিউনিটি বাড়ানোর জন্য ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টসহ অন্যান্য কিছুই দিচ্ছি।”
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফোকাল পারসন শঙ্কর কুমার বলেন, “আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন এবং এখানে শিশু ওয়ার্ডের ডাক্তারের নিয়ে একটা বিশেষ কমিটি রয়েছে, সবার নির্দেশনা অনুসারে সেবা দিচ্ছি। এছাড়া ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টসহ শিশুদের ইমিউনিটি বুস্ট করার জন্য বিভিন্ন খাবার বিনামূল্যে সরবরাহ করছি।”

একাধিক টিকার মজুদ শেষ
ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ হামের টিকা (এমআর) দিয়ে এবারের চলমান টিকাদান কর্মসূচি ‘ভালো ভাবেই’ শেষ হবে। কারণ ১ কোটি ৮০ লাখের কিছু বেশি সংখ্যক শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল রোববার বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ শিশু হামের টিকার আওতায় এসেছে। এখন এক্ষেত্রে কোনো ‘ঘাটতি’ বা ‘দুর্বলতা’ নেই।
তবে এর মধ্যে বেশ কিছু টিকার মজুদ ফুরিয়ে গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) গত ১৬ এপ্রিলের তথ্য অনুসারে, পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি বা ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন, পিসিভি বা নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন, এমআর বা মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা ভ্যাকসিন (৫ ডোজ), বিসিজি বা ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুয়েরিন টিকা ও টিডি বা টিটেনাস অ্যান্ড ডিপথেরিয়া—এই ছয় ধরনের টিকার মধ্যে প্রথম চারটির মজুদ শূন্য। শেষ দুটিরও মজুদ একেবারেই তলানিতে।
* পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা: ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি, টিটেনাস ও নিউমোনিয়া রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।
* ওপিভি: পোলিও ভাইরাস টাইপ ১ ও ৩ প্রতিরোধের মুখে খাওয়ার টিকা।
* পিসিভি: নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস ও রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করে।
* এমআর: হাম ও রুবেলা রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।
* বিসিজি: যক্ষা থেকে সুরক্ষা দেয়।
* টিডি: টিটেনাস (ধনুষ্টংকার) ও ডিপথেরিয়া রোগ সুরক্ষার একটি বুস্টার ডোজ।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ওই ছয় ধরনের টিকাসহ অন্তত ১০ ধরনের টিকার বড় চালান শিগগির আসছে। মঙ্গলবার একটি কার্গো ফ্লাইটে এসব টিকা আসার সম্ভবনা রয়েছে।
ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সারাদেশের চাহিদা অনুসারে টিকা দেওয়ার পরও তিন মাসের টিকা মজুদ রাখা হয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই মজুদ কাজে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনার পদ্ধতি নিয়ে ‘দ্বিধা-ধন্দের কারণে’ মজুদ শেষ হয়ে ‘নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে’।
কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে মজুদ শূন্যের কোঠায় নামলেও মাঠ পর্যায়ে চলার মত টিকা রয়েছে বলে জানান তারা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাম ও অন্যান্য রোগের টিকা ও সিরিঞ্জ কেনায় ‘অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির’ অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তের আবেদনও করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাশ সেই আবেদনে অন্তর্বর্তী সরকার ‘পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছিল’ বলে অভিযোগ করেছেন।
টিকা সংকটের সঙ্গে সঙ্গে জনবল সংকটের কথাও এখন সামনে আসছে।
ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের এখানে কয়েকটি ওপির (অপারেশন প্ল্যান বা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা) আন্ডারে টিকাদান ও ক্যাম্পেইন চলত; কিন্তু এখন সেসব বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই বন্ধ হয়েছে। তবে এপ্রিলের শুরুতে একজন উপ-পরিচালককে ওএসডি করা হয়েছে।
“নতুন ওপি চালু, লাইনম্যান, লাইন ডিরেক্টর, ডিডি—এসব কেউ নাই। এসব কর্মকর্তা না থাকলে কাজ করা কঠিন।”
তিনি ১৮ এপ্রিল বলেন, “আসলে টিকাদানের জন্য অপারেশন প্ল্যান (ওপি) দরকার হয়। সেটির জন্য অন্তত দু মাস সময় লাগে। এবারের ক্যাম্পেইন শুরুর কথা ছিল মে মাসের শুরু থেকে, কিন্তু মন্ত্রীর জরুরি নির্দেশনায় সেটি চলতি মাসের ২০ তারিখ থেকে চলছে।”
গত ১২ এপ্রিলের যৌথসভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ইপিআইয়ের একজন উপপরিচালককে ওএসডি করা হয়েছে। তিন সপ্তাহ হতে চললেও সেই পদে নতুন কাউকে দায়িত্বও দেওয়া হয়নি।
টিকা কেনা থেকে শুরু করে টিকাদান পর্যন্ত—সব কাজের জন্য ইপিআইয়ে পর্যাপ্ত জনবল থাকা ‘খুবই জরুরি’ বলে মত তাদের।
এনভিসি চেয়ারপারসন ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “টিকাদানের ক্ষেত্রে ইপিআইকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।”

সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হামের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনা নিয়ে গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা হামের এই ‘মহামারী’ ডেকে এনেছে।
১২ এপ্রিলের যৌথসভায় অংশগ্রহণকারী এক বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন হামের লক্ষণ দেখা দিলে বাসায় আইসোলশনে রোগীদের রাখতে হবে। খিচুনি, পাতলা পায়খানা ও অক্সিজেনের সংকট দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।
“সুপারিশ অনুসারে টেস্টের দরকার না হলেও এখন অজানা কারণে টেস্ট করা হচ্ছে। অন্যদিকে সেভাবে আইসোলেশনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না এবং এই সুবিধা বৃদ্ধির কাজ চলছে না।”
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, অবশ্যই বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুসারে কাজ করা দরকার।
“টিকা ও টাকা বিভিন্ন দাতা সংস্থা বরাদ্দ করেছে। এখন শুধু দেশে সবকিছু সুন্দরভাবে বণ্টন করা। এটির জন্য ভালোভাবে তদারকি করতে হবে।”
স্বল্প সময়ে ওপি (অপারেশন প্ল্যান) করে সারাদেশে টিকা দেওয়া কীভাবে সম্ভব হচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, টিকাদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্থানীয় পর্যায়ের টিকা কর্মীরা। তারা আসলে জানে, কাদের টিকা দিতে হবে।
“ওপি বন্ধ থাকায় অনেক দিন তারা টাকা পায়নি। ফলে তাদের বেতন-ভাতাসহ সকল দাবি পূরণ করে মাঠে কাজে লাগাতে হবে।”
যৌথসভার সুপারিশ অনুসারে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস গত ২৯ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “গত পরশু কমিটি গঠন হয়েছে। তারা কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করবে।”
কাদের পরামর্শে বা কীসের ভিত্তিতে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “নাইট্যাগের সুপারিশেই কাজ চলছে। নতুন এই কমিটি সভা করে আরো যেসব সুপারিশ করবে, সামনে সেভাবে কাজ করা হবে।”
তবে এই বিশেষ কমিটির সদস্যদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির একজন সদস্য।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বিদেশ সফরে ছিলেন। শুক্রবার বিকালে দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মার্চ মাসে নাইট্যাগকে চিঠি দিয়েছিলাম হামের পরিস্থিতি নিয়ে কী করা যায়। তারপর ৩১ মার্চ একটা বৈঠকের পর তারা জানায়, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকা দিতে হবে।
“এপ্রিলের ৫ তারিখ থেকে দেশের ৩০টি উপজেলায় টিকাদান শুরু করি। এরপর গত মাসের ১২ এপ্রিল একটি সভা হয়। সভার রেজুলেশন করা হয় ১৮ তারিখে। তবে আমি গত ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে থাকা অবস্থায় অফিসিয়ালভাবে পাইনি৷”
সভার সুপারিশের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা অফিসিয়ালভাবে পাইনি।”

সুপারিশ অনুসারে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটির কার্যকারিতা বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “আসলে নাইট্যাগই একটা বিশেষ কমিটি—যাদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের এবং দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আছেন। তাই নতুন করে কমিটি গঠনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবে কমিটির সুপারিশ হয়তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দিয়েছে।
“গত ২৭ তারিখ সুপারিশ অনুসারে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন হয়েছে, সেটা আপনার কাছেই শুনছি৷”
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা আছে তুল ধরে তিনি বলেন, “আগামীতে স্বাস্থ্য সেবার সবকিছু উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা পরিকল্পনা করছি।”
স্বল্প সময়ে ওপি করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আসলে অল্প সময়ে করা হয়েছে এমন নয়; অনেক আগে থেকেই এসব পরিকল্পনা থাকে। আর ক্যাম্পেইনের সময় রিভাইজ করে সঠিক হিসাব নিয়ে টিকাদান করা হয়।”
তিনি বলেন, “দেশের অনেক বাবা-মা চাকরিজীবী আছেন, যারা নির্ধারিত দিনে ব্যস্ত থাকায় বাচ্চাদের টিকা দিতে পারেন না। তবে পরের যেকোনো দিন যেকোনো সেন্টার থেকে টিকা নিতে পারবেন।
“আর জাতীয়ভাবে টিকার ক্যাম্পেইন এ জন্য করা হয় যে, কেউ টিকার কোনো ডোজ মিস করে থাকলেও যেনো ক্যাম্পেইনের সময় টিকা পান। তবে আগের সময় জাতীয়ভাবে একটা ক্যাম্পেইন মিস হয়েছিল।”
যৌথসভার সুপারিশ মন্ত্রণালয়কে জানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব থাকেন, তার মাধ্যমে সবকিছু জানাই। সেখানে জানানো হয়েছিল।”
সব শিশুকে টিকা দিতে অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ডা. প্রভাত বলেন, “এক হাসপাতালে গিয়ে পাঁচজন অভিভাবকদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের কারও সন্তানকেই প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়নি৷ আসলে দেশের কিছু অভিভাবকের অসচেতনাও এসব রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী।”
বিভিন্ন হাসপাতালের বেড ও আইসোলেশন সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “দেশের সব হাসপাতালে হাম ইউনিট করার নির্দেশনা দিয়েছি। সেখানে শুধু ডেডিকেটেড হাম রোগীই থাকবে; কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রমক রোগ। শিশুদের মৃত্যু ঠেকাতে স্বাস্থ্যের সবাই সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গেই কাজ করছে।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাদের সাড়া মেলেনি।