Published : 06 Jul 2026, 11:49 AM
দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ঢাকার বাইরে আরো মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিজামউদ্দিন হাসান রশিদ।
এক্ষেত্রে ইউনাইটেড গ্রুপেরও জেলা পর্যায়ে তিন-চারটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছেন তিনি।
নিজামউদ্দিন হাসান মনে করেন, যত দিন না জেলা পর্যায়ে ভালো মানের হাসপাতাল হচ্ছে, ততদিন ঢাকায় রোগীর চাপ কমবে না।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’-এ এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
এতে স্বাস্থ্য খাতের জায়গা থেকে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন তিনি; কথা বলেন ইউনাইটেড গ্রুপের নানা কর্মকাণ্ড নিয়েও।
নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করে নিজামউদ্দিন রশিদ বলেন, ‘‘এবার বাজেট যেভাবে করা হয়েছে, আমি মনে করি, এটা স্বাস্থ্য খাতের জন্য খুবই ভালো হয়েছে।
“কারণ স্বাস্থ্যখাতে অনেক মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন কতটুক বাস্তবান হয়, সেটার ওপর নির্ভর করবে। বরাদ্দের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য খুবই ভালো ফল নিয়ে আসবে।’’
দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা ভালোর দিকে রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের যতগুলা ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, সেগুলো সব ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী— এরকম বড় শহরকেন্দ্রিক। আমাদের কিন্তু বাকি জায়গাগুলোয় ওরকম ভালো মানের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র এখনো তৈরি হয়নি।
“যতদিন পর্যন্ত এটা তৈরি না হবে, যতদিন পর্যন্ত আমরা এসব শহরের বাইরে ভালো স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত ভিড়টা থাকবেই। আমাদের ঢাকার বাইরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে আরো বেশি মনযোগ দেওয়া উচিত।”
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে কী ধরনের সেবার ব্যবস্থা রয়েছে জানতে চাইলে নিজামউদ্দিন বলেন, “আমাদের এখানে ১৫০ শয্যার ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড আছে। আর আমাদের এখানে কিন্তু সাধারণ রোগীর চেয়ে জটিল রোগী বেশি আসে।”
রোগী ও স্বজনরা যদি পরিচিত কিছু হাসপাতালের বাইরে যান, তাহলে জরুরি সেবার মান বাড়বে বলে মনে করেন ইউনাইটেড গ্রুপের এই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি)।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “সব হাসপাতালে জটিল রোগীদের শয্যার এক ধরনের সীমা রয়েছে, এটা বাংলাদেশে এবং সব জায়গায় আছে। আমাদের ভালো একটি দিক হলো, আমরা চাইলে হাসপাতালের সব শয্যা জটিল রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য যেকোনো সময় খুব সহজে প্রস্তুত করতে পারব।
“আমাদের এখন পর্যন্ত ৪৫০ শয্যায় রোগীদের সেবা কার্যক্রম চলছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে, এটিকে ৬৫০ শয্যা করার। এখানের শয্যাগুলো হেপা ফিল্টারের আন্ডারে।”
তিনি বলেন, “আইসিইউতে তিনটা অক্সিজেন লাইন লাগে— সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন, ভ্যাকিউম ও মেডিকেল গ্যাস। এসব কিছু আমাদের প্রত্যেকটা শয্যার সঙ্গেই রয়েছে। ফলে আমরা প্রয়োজন অনুসারে দ্রুতই এবং সহজে শয্যাগুলোকে জটিল রোগীর জন্য প্রস্তুত করতে পারব।”
ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের সেবায় সমন্বিত উদ্যোগ থাকার কথা তুলে ধরে নিজামউদ্দিন বলেন, “ক্যান্সারের যেমন ধরন রয়েছে, চিকিৎসাতেও ধরন রয়েছে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি আর অনকোলজি যেটা মেডিসিন, ওরাল বা স্যালাইনের মাধ্যমে অনকোলজি কেমোথেরাপিটা যেটা দেওয়া হয়।
“রেডিয়েশনের ক্ষেত্রেও আমরা প্রথাগত লিন্যাক ব্যবহার করি। বাংলাদেশে শুধু সিএমএইচ আর আমাদের এখানে রেডিঅ্যাক্ট যেটা টোমোথেরাপি, ওইটা ইন্সটল করা হয়েছে। আমরা দেশের প্রথম সাইবার নাইফ নিয়ে এসেছি, তার সঙ্গে আমাদের ট্রেডিশনাল লিন্যাকও আছে।’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেছি নিউক্লিয়ার মেডিসিন। নিউক্লিয়ার মেডিসিন বলতে যেটা বুঝাচ্ছি আমি, সেটা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা ইন্ডিয়াতে লুটেসিয়াম, আইসোটোপস, ওটা দিয়ে মিক্স করে যেই জায়গায় ক্যান্সার সেলটা আছে ওই জায়গায় ডিরেক্ট টার্গেটেড থেরাপি দেয়।
“যে ধরনের ক্যান্সার, সেটা যদি লিভার ক্যান্সার হয়, লিভার ক্যান্সারের জন্য একটা ট্রিটমেন্ট আছে, কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের জন্য একটা মেথড আছে, তো ওইভাবে করে বাইরে দেওয়া হয়। এটা দেশে প্রথম আমরা চালু করার চেষ্টা করছি।’’
ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, “বিশ্বমানের একাধিক ভালো ওষুধ কোম্পানি আমাদের দেশে রয়েছে। তবে মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানি বলতে সত্যি একটাও নেই। আমার খুব বড় ইচ্ছা, জার্মানিতে একটা মেলা হয় ‘মেডিকা’ নামে। আমি চাইব, বাংলাদেশের একটা তৈরি পণ্য যেন ওখানে তুলে ধরতে পারি।”
তাদের কোম্পানির স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জামালপুর আমাদের গ্রামের বাড়ি। আমাদের পরিবার এবং সেখানের সাধারণ মানুষের চিন্তা করে একটি হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। ময়মনসিংহসহ ওই অঞ্চলে আমাদের হাসপাতালই হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউসহ সব ধরনের সেবা রয়েছে।
“সরকারি ছাড়া বেসরকারি কোনো হাসপাতালে ওই অঞ্চেলে এসব সেবা নাই। তাই ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যার আরো তিন-চারটা হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালের খরচ ব্যয়বহুল কিনা, সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল নিজামউদ্দিনকে।
জবাবে তিনি বলেন, “অনেকে আমাদের হাসপাতালের ভবন দেখে ব্যয়বহুলের বিষয়টি ভেবে নেয়। কিন্তু আমি বলব, আমাদের সেবা নিয়ে যদি কেউ দেখেন, যেমন, আমাদের এখানে ওপিডি চার্জ মাত্র ৫০০ টাকা থেকে শুরু।
“হাসপাতালে ৪০টি বিনামূল্যের শয্যা রয়েছে। আমরা সব সময় চেষ্টা করি যেন কোনো রোগীর ফিরে যেতে না হয়।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অদূর ভবিষ্যতে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালকে দেশের ‘এক নম্বর শীর্ষ রেফারেল সেন্টার’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যেন মানুষ শতভাগ ডায়াগনসিস সেবা পায়।”