Published : 17 Jun 2026, 07:31 PM
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি নারীদের ওপর হামাসের নির্মম যৌন নির্যাতনের পর, ইসরায়েলের সমর্থকরা একটি অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট দাবি তোলেন। তাদের বক্তব্য ছিল— মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে যার যে অবস্থানই থাকুক না কেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এমনকি ডনাল্ড ট্রাম্প, জো বাইডেন এবং মার্কো রুবিওসহ মার্কিন সিনেটরগণ হামাসের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও জোরালো দাবি তোলেন যে, বিশ্বের সকল সভ্য নেতৃত্বেরই এই যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত।
তবে এবার ইতিহাসের অন্য একটি দিকের প্রতিও আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। সম্প্রতি আমি এমন বেশ কিছু হৃদয়বিদারক সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলিদের যৌন সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই নির্মম নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে ইসরায়েলি সেনা, অবৈধ বসতি স্থাপনকারী (সেটলার), গোয়েন্দা সংস্থা 'শিন বেত'-এর জিজ্ঞাসাবাদকারী এবং বন্দিশালার কারারক্ষীরাও।
যদিও ইসরায়েলি শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে সরাসরি ধর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই, তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা রীতিনীতি গড়ে তুলেছে যা পরোক্ষভাবে যৌন সহিংসতাকে উসকে দেয়। জেনিভাভিত্তিক মানবাধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর’ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের এই কার্যক্রমের ওপর কড়া নজর রাখছে। গত মাসে প্রকাশিত সংস্থাটির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে বন্দিদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা চালানো হয়, যা মূলত দেশটির একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবেই চর্চা হয়ে আসছে।
ইসরায়েলের সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা রীতিনীতির রূপ আসলে কেমন? এর একটি নির্মম উদাহরণ মেলে ৪৬ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সামি আল-সাইকের অভিজ্ঞতায়। ২০২৪ সালে যখন তাকে বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন প্রথমে তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা সবাই মিলে আমাকে বেদম মারধর করতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে আমার মাথা ও নাকে প্রচণ্ড ঘুষি মারে। এরপর একজন আমার প্যান্ট খুলে ফেলে, এমনকি আমার অন্তর্বাসও খুলে ফেলতে বাকি রাখে না।” ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকজন কারারক্ষী তাকে পেটানোর জন্য রাবারের লাঠি বের করে আনে।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা বর্ণনা করে বলেন, “তারা জোরপূর্বক লাঠিটি আমার মলদ্বারে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, আর আমি প্রাণপণ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তাদের শক্তির সঙ্গে আমি কোনোভাবেই পেরে উঠিনি। সেই অভিজ্ঞতা ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক। সবচেয়ে নৃশংস বিষয় ছিল, কারারক্ষীরা তখন আমার দিকে তাকিয়ে উপহাসের হাসি হাসছিল। আমি শুনতে পেলাম তাদের মধ্যে একজন বলছিল, ‘আমাকে গাজরগুলো দাও।’ এরপর তারা আমার মলদ্বারে গাজর ঢুকিয়ে দেয়, যা ছিল আরও অনেক বেশি বীভৎস। সেই মুহূর্তে যন্ত্রণার তীব্রতায় আমি আল্লাহর কাছে নিজের মৃত্যু কামনা করছিলাম।”
নির্যাতনের ওই সময়ে আল-সাইয়ের চোখ বাঁধা ছিল। তবে তিনি বুঝতে পারেন, কেউ একজন হিব্রু ভাষায় বলছিল, “ছবি তোলো না।” এতে তিনি অনুমান করেন যে সেখানে ক্যামেরা হাতে অন্য কেউ উপস্থিত ছিল। এরপর এক নারী কারারক্ষী তার যৌনাঙ্গ চেপে ধরে উপহাসের ছলে বলে ওঠে, “এগুলো এখন আমার।” ব্যথার তীব্রতায় তিনি যতক্ষণ না চিৎকার করে উঠছিলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই কারারক্ষী তা একইভাবে চেপে ধরে রেখেছিল।
এরপর তাকে হাতকড়া পরিয়ে মাটিতে ফেলে রাখা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সিগারেটের গন্ধ পান। সেই মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম, তারা তখন নির্যাতন থামিয়ে সিগারেট পানের বিরতি নিচ্ছে।”
যে কক্ষটিতে তাকে রাখা হয়েছিল, তার মেঝেতে অন্য মানুষের বমি, রক্ত এবং ভাঙা দাঁত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। চারপাশের এই নারকীয় পরিস্থিতি দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, কক্ষটি এর আগেও ঠিক একই ধরনের নির্যাতনকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। করা হতো।
আল-সাইক জানান, তাকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার বিশ্বাস, এই প্রস্তাবটি মানাতে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই মূলত তাকে গ্রেপ্তার করে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। তবে সাংবাদিকতার পেশাগত সততা ও আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থাকায় তিনি সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আরও যোগ করেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, গণহত্যা এবং ধর্ষণের মতো ভয়াবহ নৃশংসতার খবর সংগ্রহ করে আসছি। পেশাগত কারণে অনেক সময় আমাকে এমন সব জায়গায় যেতে হয়েছে, যেখানে যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা হামাস বা ইসরায়েলি বাহিনী কিংবা ইসরায়েলি সেটলারদের চালানো বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। যেমন, বেশ কিছু বছর আগে ইথিওপিয়ার টাইগ্রে সংঘাতের সময় হয়তো প্রায় এক লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন; আর বর্তমানে সুদানে চলছে গণধর্ষণের মতো চরম নারকীয় উৎসব।”
অথচ ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাকে আমাদের মতো আমেরিকানদের করের টাকা দিয়ে ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে এটি এমন এক যৌন সহিংসতা, যার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বর্তায়।

ইসা আমরু একজন অহিংস আন্দোলনকারী, যাকে ফিলিস্তিনের 'গান্ধী' বলা হয়ে থাকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমার কাছে প্রকাশ করেন যে, তিনিও ইসরায়েলি সৈন্যদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তার বিশ্বাস, ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত নিয়মিত বা স্বাভাবিক বিষয় হলেও, সামাজিক লজ্জার কারণে সংবাদমাধ্যমে এই বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন বা খবর প্রকাশিত হয় না। মূলত তার সঙ্গে এই আলাপের পর থেকেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরিতে আমার আগ্রহ জন্মে।
একটি হিসাব অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল কেবল পশ্চিম তীর থেকেই প্রায় ২০ হাজার ফিলিস্তিনিকে বন্দি করেছিল; যার মধ্যে এখনও নয় হাজারেরও বেশি মানুষ কারাবন্দি রয়েছেন। এদের অনেকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের ছিটেফোঁটাও ছিল না, বরং কেবল ‘নিরাপত্তাঝুঁকি’র অজুহাত দেখিয়ে তাদের রহস্যজনকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বন্দিদের বড় একটি অংশ ২০২৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আইনজীবী কিংবা আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার ন্যূনতম সুযোগও পায়নি।
‘ইউরো-মেড’ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও অপমানিত করতে ইসরায়েলি বাহিনী পদ্ধতিগতভাবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।” এই প্রতিবেদনে ৪২ বছর বয়সী এক ভুক্তভোগী নারীর লোমহর্ষক জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় একটি ধাতব টেবিলের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। এরপর ইসরায়েলি সৈন্যরা টানা দুই দিন ধরে তাকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। এই বর্বরতার সময়ে অন্য কিছু সৈন্য সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ ও ছবি তুলে রাখে। পরবর্তীতে, সেই ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হয় যে—ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য না করলে সেগুলো ইন্টারনেটে ভাইরাল করে দেওয়া হবে।
ফিলিস্তিনিদের ওপর ঘটে যাওয়া এই পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতনের প্রকৃত ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি সম্পূর্ণরূপে উদঘাটন করা অসম্ভব। তবে আমার এই প্রতিবেদনটি মূলত ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী ও পুরুষের প্রত্যক্ষ জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যারা প্রত্যেকেই ইসরায়েলি সেটলার কিংবা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কোনো না কোনোভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তথ্যের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে আমি কেবল এই ভুক্তভোগীদের সঙ্গেই নয়, বরং তাদের পরিবারের সদস্য, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তকারী, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবগত আরও অনেকের সঙ্গেই বিস্তারিত কথা বলেছি।
মূলত আইনজীবী, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, মানবিক সহায়তা কর্মী এবং ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই আমি এই ভুক্তভোগীদের সন্ধান পাই। অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে কিংবা ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও সমাজকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমি তাদের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার সত্যতা আংশিকভাবে যাচাই করে নিয়েছি। তবে সব ঘটনার ক্ষেত্রে এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর বড় কারণ সম্ভবত সামাজিক লজ্জা ও মানসিক ট্রমা, যার ফলে অনেক ভুক্তভোগীই তাদের অতি আপনজনদের কাছেও এই চরম নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশ করতে চাননি।
‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ পরিচালিত গত বছরের একটি জরিপে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ছিল এমন ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ওপর চালানো নির্যাতনের লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে। সেই জরিপ অনুযায়ী, অর্ধেকেরও বেশি শিশু বন্দিশালায় নিজে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে অথবা অন্য কোনো শিশুকে এই নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে যে, প্রকৃত চিত্রটি সম্ভবত আরও অনেক বেশি ভয়াবহ; কারণ সামাজিক লোকলজ্জা ও নিন্দার ভয়ে অনেক শিশুই তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নের বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে গেছে। একইভাবে, সাংবাদিকদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়োজিত আমেরিকার আরেকটি মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনও একটি জরিপ পরিচালনা করে। ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের বন্দিশালা থেকে মুক্তি পাওয়া ৫৯ জন সাংবাদিকের ওপর চালানো জরিপে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৩ শতাংশ সরাসরি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ২৯ শতাংশ সাংবাদিক নানাবিধ বীভৎস যৌন নিপীড়ন ও পাশবিক আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন।
কিন্তু হামাসের মতো ইসরায়েলি সরকারও ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। হামাস কর্তৃক ইসরায়েলি নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতাকে জাতিসংঘ যখন দালিলিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত করে, ইসরায়েল তখন সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল। অথচ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর একই ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের যে কোনো আন্তর্জাতিক আহ্বান তারা বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা এই যৌন সহিংসতার অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে এর তীব্র নিন্দাও করেছেন।
আমার এই প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর সব ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরও দাবি করেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখেছে। তা সত্ত্বেও, যৌন নিপীড়নের দায়ে এ পর্যন্ত কোনো কারারক্ষীকে কখনো চাকরি থেকে বরখাস্ত কিংবা বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কি না— সেই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দিতে ওই মুখপাত্র অস্বীকার করেন।
ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতে কেবল ধর্ষণ নয়, এর বাইরেও নানাবিধ নির্যাতনের বিবরণ পাওয়া যায়। অনেকেই জানিয়েছেন যে, নির্যাতনকারীরা প্রায়শই তাদের যৌনাঙ্গ ধরে নির্দয়ভাবে টান দিত কিংবা অণ্ডকোষে প্রচণ্ড আঘাত করত। পুরুষ বন্দিদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে দুই পায়ের মাঝখানে ‘মেটাল ডিটেক্টর’ দিয়ে পরীক্ষা করা হতো এবং এক পর্যায়ে সেই ধাতব যন্ত্রটি দিয়েই তাদের গোপনাঙ্গে নির্মমভাবে আঘাত করা হতো। ‘ইউরো-মেড মনিটর’ অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর এমন ভয়াবহ মারধরের ফলে পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিছু ফিলিস্তিনি পুরুষের অণ্ডকোষ কেটে ফেলে দিতে হয়েছে।
মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের মতে, এসব ভয়াবহ নির্যাতন আড়ালে থেকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত হুমকি। কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার সময় এবং পরবর্তী সময়েও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বন্দিদের এই বিষয়ে সম্পূর্ণ মুখ বন্ধ রাখতে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেয়। এর পাশাপাশি, ফিলিস্তিনি বা সামগ্রিক আরব সমাজেও এই সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে আলোচনাকে একপ্রকার নিরুৎসাহিত করা হয়। এর পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক কারণ রয়েছে; তা হলো— নির্যাতনের এই বিবরণগুলো প্রকাশ্যে এলে বন্দিদের পরিবারের মনোবল ভেঙে পড়তে পারে এবং ফিলিস্তিনিদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের যে বয়ান রয়েছে, তা দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
এর বাইরে, রক্ষণশীল সামাজিক রীতিনীতিও এই বিষয়ে প্রকাশ্য আলোচনায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। দুজন ভুক্তভোগী আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, কোনো বন্দি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন— এমন কথা সমাজে জানাজানি হয়ে গেলে, তার বোন কিংবা মেয়ের বিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আমার এই প্রতিবেদনে একজন কৃষক নিজের নাম ব্যবহারের অনুমতি দেন। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই মাসের পর মাস তাকে ইসরায়েলি বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছিল। এ বছরের শুরুর দিকে তিনি মুক্তি পান। গত বছরের এক ভয়াবহ দিনের স্মৃতি চারণ করে তিনি বলেন, ছয়জন কারারক্ষী মিলে তার হাত-পা চেপে ধরে এমনভাবে মারধর করে যে, তিনি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে তিনি পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাকে কারাগারের ক্লিনিকে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু অবর্ণনীয় নৃশংসতার এখানেই শেষ ছিল না; জ্ঞান ফেরার পর সেখানে একই ধাতব লাঠি দিয়ে একইভাবে তাকে পুনরায় ধর্ষণ করা হয়। সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমার শরীর থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম এবং কেবলই কাঁদছিলাম।”
কক্ষে ফিরে আসার পর তিনি এক কারারক্ষীর কাছে খাতা ও কলম চান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দাখিল করবেন বলে। কিন্তু তার সেই অনুরোধ রাখা হয়নি। উল্টো একই দিন সন্ধ্যায় কারারক্ষীদের একটি দল তার কক্ষে চড়াও হয়। তাদের মধ্যে একজন চিৎকার করে বারবার প্রশ্ন করতে থাকে, “এখানে এমন কে আছে, যে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চায়?” ঠিক তখনই অন্য এক রক্ষী তাকে দেখিয়ে দেয়। এরপর, একই দিনে তৃতীয়বারের মতো তাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতন করার সময় তিনি এক কারারক্ষীকে উপহাসের ছলে বলতে শোনেন, “যাও, এবার তোমার অভিযোগনামায় লেখার জন্য আরও কিছু নতুন লাইন পেয়ে গেলে!”
কয়েকদিন পর আমি আবারও সেই কৃষকের সাক্ষাৎকার নিতে যাই। এবার তিনি আমার প্রতিবেদনে তার নাম গোপন রাখার অনুরোধ করেন। কারণ, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ মাত্রই তার বাড়িতে এসে তাকে চরম সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে। এছাড়া তিনি এ নিয়েও শঙ্কিত ছিলেন যে, তার নাম যদি জনসমক্ষে প্রকাশ পায়, তবে সামাজিক কারণে তার নিজের পরিবারও তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
ইসরায়েলি-আমেরিকান মানবাধিকার আইনজীবী এবং ইসরায়েলের ‘পাবলিক কমিটি এগেইনস্ট টর্চার’ নামে একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক সারি বাশি এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “ফিলিস্তিনি বন্দিদের এমন বীভৎস যৌন নির্যাতন চালানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা এবং এটি সেখানে প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই পরিচিত।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই ধরনের বর্বরতার পেছনে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা রয়েছে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না পেলেও পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যে, উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ সবকিছু খুব ভালোভাবে জানা সত্ত্বেও এই সব বর্বরতা বন্ধ করার জন্য কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না।”
অসংখ্য ফিলিস্তিনি বন্দির আইনি সহায়তায় কাজ করার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আরেক ইসরায়েলি আইনজীবী বেন মারমারেলে বলেন, বিভিন্ন ধরনের ধাতব বস্তু ব্যবহার করে বন্দিদের ওপর ধর্ষণ ও পাশবিক যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং এই অমানবিক ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। অন্যদিকে, মানবাধিকার আইনজীবী সারি বাশি উল্লেখ করেছেন যে— এসব লোমহর্ষক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে শত শত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছেন, কিন্তু সরকার কোনো অভিযোগপত্রই আমলে নেয়নি। এই বিচারহীনতা মূলত নির্যাতনকারীদের আরও বর্বর হওয়ার জন্য 'সবুজ সংকেত' হিসেবে কাজ করছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মলদ্বারে গুরুতর জখম, পাঁজরের হাড় ভাঙা এবং ফুসফুসে ক্ষত নিয়ে গাজার এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তকারীরা ওই বন্দিশালার গোপন ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করলে নির্যাতনের বিষয়টি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। এর জেরে বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়জন ইসরায়েলি রিজার্ভ সৈন্যকে আটক করে। এই আটকের ঘটনায় ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থীরা চরম ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এমনকি কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিবিদসহ একদল ক্রুদ্ধ বিক্ষোভকারী অভিযুক্ত কারারক্ষীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গেট ভেঙে সরাসরি সামরিক কারাগারে ঢুকে পড়ে। এই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল সরকার অভিযুক্ত সৈন্যদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের পুনরায় কাজে ফেরার অনুমতি দেয়। অভিযোগ প্রত্যাহারের এই ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর থেকে ‘অপবাদের অবসান’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী সুর চড়িয়ে বলেন, “শত্রুদের খুঁজে বের করে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে, ইসরায়েলের বীর সেনাদের নয়।” তবে মানবাধিকার আইনজীবী সারি বাশি এই পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, “আমি স্পষ্ট করেই বলব—অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়ার সোজা অর্থ হলো, সৈন্যদের আইনগতভাবেই ধর্ষণের ‘লাইসেন্স’ দিয়ে দেওয়া।”
পরে সেই বন্দিকে মুক্তি দিয়ে গাজায় ফেরত পাঠানো হয়। জানা গেছে, অমানুষিক নির্যাতনের কারণে তার শারীরিক অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে, হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীরের বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য কৃত্রিম উপায়ে একটি ‘স্টোমা ব্যাগ’ ব্যবহার করতে হয়েছিল। তার এক পরিচিত ব্যক্তি জানান, শারীরিক ও চরম মানসিক ট্রমা থেকে সেরে উঠতে তাকে কয়েক মাস হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। পরিচিত ব্যক্তিটি আরও জানান যে, মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত থাকায় ওই বন্দি এই বিষয়ে কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার দিতে চান না।
তবে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা এবং এই পাশবিক ঘটনাগুলো জনসমক্ষে নিয়ে আসাই পারে এমন বীভৎসতার ইতি ঘটাতে। এর একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ মেলে ১৯৯৭ সালে, যখন আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ কর্মকর্তারা আবনার লুইমা নামের এক হাইতিয়ান অভিবাসীকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে। পরে লাঠি দিয়ে তার ওপর এতটাই নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছিল যে, তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি এবং জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়। এই ঘটনায় নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং তৎকালীন মেয়র রুডি জুলিয়ানি স্বয়ং লুইমাকে হাসপাতালে দেখতে যান। পরবর্তী সময়ে একটি যুগান্তকারী মামলার মাধ্যমে অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। সেই বিচার পুলিশ বাহিনীর কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল যে—বন্দিদের ওপর যেকোনো ধরনের নির্যাতন চালানো হলে আইনগতভাবে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। আর ঠিক বার্তা এখন ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া বড় বেশি প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসন যদি রেড ক্রসের মাধ্যমে ইসরায়েলি বন্দিশালাগুলো পুনরায় পরিদর্শনের ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করত, কিংবা মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজে ক্যামেরা ও সংবাদমাধ্যম কর্মী নিয়ে নিপীড়নের শিকার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেখা করতেন—তবে তা বিশ্বজুড়ে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারত। আমরা যদি ইসরায়েলকে সামরিক অস্ত্র ও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ‘যৌন সহিংসতা ও নির্যাতন সম্পূর্ণ বন্ধ করার’ মতো কঠোর শর্ত জুড়ে দিতাম, তাহলে বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হতো। আর সেই স্পষ্ট বার্তাটি হতো—ভুক্তভোগী মানুষের জাতিগত বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, যৌন সহিংসতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি, মার্কিন রাষ্ট্রদূত শুরুতেই অন্তত এতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতেন যে—যেসকল ফিলিস্তিনি সাহসিকতার সঙ্গে এই প্রতিবেদনে নিজেদের জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা যেন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতিশোধমূলক কোনো নৃশংসতার শিকার না হন।
কী করে এ ধরনের সহিংসতা ঘটে? সংঘাতের খবর সংগ্রহ করে গত কয়েক দশকে আমি শিখেছি যে, অমানবিকীকরণ বা মানুষের প্রতি নৃশংসতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তা থেকে দায়মুক্তি দেওয়া, মানুষকে টমাস হবস বর্ণিত এক প্রাকৃতিক অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। ইতিহাসের আদিদশার মতো মানুষের জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে। কঙ্গো হতে সুদান কিংবা মিয়ানমার পর্যন্ত আমি হত্যাযজ্ঞের সেই দৃষ্টান্তের মুখোমুখি হই। আমি মনে করি, অমানবিকীকরণ ও দায়মুক্তির সংযোগ দ্বারা অনেকটাই ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কীভাবে মার্কিন সেনারা ইরাকের আবু গারিবে বন্দিদের যৌন নির্যাতন করেছিল।
যখন আশু পরিণাম নেই, নিরেট সত্য হলো, আমরা সে সময় চরম পৈশাচিকতা প্রদর্শন করি। আর যাদের আমরা অমানুষ হিসেবে ঘৃণা করি, তাদের ওপরই পৈশাচিকতার বুলডোজার চালাই। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির তেমনি একজন, তিনি বন্দিদের নিকৃষ্ট এবং নাৎসি অভিহিত করেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য কারাগারে আরও কঠোর পরিস্থিতি তৈরির দম্ভ করেন। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ফিলিস্তিনিদের ওপর যন্ত্রণা ও অপমান চাপানোর আরেকটি হাতিয়ার। তবে আমি মন্তব্য চাইলে বেন-গাভির মুখপাত্রের বরাতে মন্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিৎসেলেম’ ফিলিস্তিনিদের প্রতি যৌন সহিংসতার এক গুরুতর ধারা নথিভুক্ত করে। সংস্থাটি গাজার এক বন্দি, তামার কারমুতের বিবরণ উদ্ধৃত করেছে। কারমুত বক্তব্য দেন যে তাকে লাঠি ব্যবহার করে ধর্ষণ করা হয়। আর বিৎসেলেম বলছে, যৌন নির্যাতন একটি স্বীকৃত ও স্বাভাবিক প্রথায় পরিণত হয়েছে।

কারা হাসপাতালে কর্মরত একজন প্রাক্তন ইসরায়েলি কর্মকর্তা ইসরায়েলি দল ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এ একটি ভাষ্য দেন। তিনি বর্ণনা করেন, “আপনি দেখবেন ঘটনাটা খুবই স্বাভাবিক। এমনকি সেটি কোনো জিজ্ঞাসাবাদ বা অন্য কিছুর জন্য নয়। অনেক সাধারণ মানুষও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, তারা আনন্দের জন্য অন্যদের নির্যাতন করে। বিষয়টি মজা করতে, নতুন কিছু শুনতে কিংবা নিরেট প্রতিশোধ নেওয়ার বেলাতেই শুধু সীমিত।”
বেশিরভাগ ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন সহিংসতায় পুরুষরাই লক্ষ্যবস্তু। কারণ ফিলিস্তিনি বন্দিদের ৯০ শতাংশেরও বেশি পুরুষ। তবে আমি একজন ফিলিস্তিনি নারীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি ২০২৩-এর অক্টোবরে হামাসের হামলার পর যখন গ্রেপ্তার হন, তার বয়স সেসময় ২৩ বছর ছিল। তিনি বলেন, যেসব সেনারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তারা তাকে, তার মাকে এবং তার ভাইয়ের মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। মহিলা রক্ষীদের দ্বারা একটি নগ্ন তল্লাশির মাধ্যমে তার কারাবাসের দুর্ভোগ শুরু হয়। তিনি যুক্ত করেন, “কিন্তু এরপরেই এক পুরুষ সৈনিক ভেতরে আসে, আমি সেসময় পুরোপুরি নগ্ন ছিলাম।”
পরবর্তী দিনগুলোতে পুরুষ ও মহিলা উভয় কারারক্ষীর দলই তাকে বারবার নগ্ন করে, মারধর করে এবং তল্লাশি চালায়। ঘটনাপ্রবাহ সবসময় একইরকম ছিল। পুরুষ ও মহিলাসহ কয়েকজন রক্ষীর দল তার কক্ষে ঢুকত, জোর-জবরদস্তি করে নগ্ন করত, হাত পেছনে রেখে হাতকড়া পরাত এবং কোমর বাঁকা রেখে সামনে ঝুঁকে দিত। মাঝেমাঝে তার মাথা জোর করে টয়লেটের দিকে ঢুকিয়ে রাখত। এই অবস্থায় মারধর করা হতো এবং তার সারা শরীর হাতড়ানো হতো।
তিনি বলেন, “ওরা আমার সারা শরীরে হাত বুলাচ্ছিল। আমি আসলে ঠিকঠাক বলতে পারব না তারা আমাকে ধর্ষণ করছিল কি না।”কেননা মারধরের দরুন তিনি মাঝে মাঝে জ্ঞান হারান। তিনি মনে করেন নির্যাতনের উদ্দেশ্য ছিল দুই রকম: মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং ইসরায়েলি পুরুষদের বিনাদণ্ডে একজন নগ্ন ফিলিস্তিনি নারীকে লাঞ্ছিত করার সুযোগ দেওয়া। তিনি যুক্ত করেন, “প্রতিদিনই আমাকে কয়েকবার করে নগ্ন এবং মারধর করা হতো। যেন আমাকে বন্দিশালার গণিমতের মাল ভাবত। তাই প্রত্যেক শিফটের শুরুতে আমাকে নগ্ন করতে বিভিন্নকর্মী সঙ্গে নিয়ে আসত।”
তিনি দাবি করেন জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পূর্বে, ছয়জন কর্মকর্তার সঙ্গে তাকে একটি কক্ষে ডেকে নেয়। কঠোরভাবে সতর্ক করে যেন কোথাও কোনো সাক্ষাৎকার না দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “তারা হুমকি দেয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোথাও মুখ খুললে আমাকে ধর্ষণ ও হত্যা করবে এবং আমার বাবাকেও ছাড়বে না।” ফলে এটি কোনো অবাক করা বিষয় নয়, এ নিবন্ধে তিনি নাম প্রকাশে অসম্মতি জানাবেন।

গাজার বন্দিদের ওপর সম্ভবত বেশ কয়েকটি ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনা চালানো হয়। ২০২৪ সালে বন্দি হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়া গাজার একজন সাংবাদিক এই সংক্রান্ত বিবরণ দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, “যৌন নিপীড়ন থেকে কারও মুক্তি ছিল না। হয়তো সবাই ধর্ষিত হয়নি, তবে প্রত্যেকেই অবমাননাকর ও বীভৎস যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একবার কারারক্ষীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তার অণ্ডকোষ ও পুরুষাঙ্গ বেঁধে রেখে আঘাত করে। এই ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন যাবৎ তার প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হতো।
আবার কোনো একদিন হাত-পা চেপে ধরে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। সে সময় তিনি চোখে পট্টি বাঁধা ও হাতকড়া পরানো অবস্থায় ছিলেন। ওই অবস্থায় একটি কুকুর ডেকে আনা হয় এবং হিব্রু ভাষায় একজন প্রশিক্ষকের উৎসাহে কুকুরটি তার শরীরের ওপর সওয়ার হয়।
তিনি যুক্ত করেন, “তারা ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা রাখে এবং আমি তাদের হাসি-ঠাট্টার শব্দ শুনি।” কুকুরটিকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা তিনি জারি রাখেন, কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে কুকুরটি দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন।
অন্যান্য ফিলিস্তিনি বন্দি এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরাও বন্দিদের ধর্ষণের জন্য কুকুর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সেই সাংবাদিক জানান, মুক্তি পাওয়ার সময় এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা তাকে সতর্ক করেন: “বেঁচে থাকতে চাইলে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না।”
তিনি তাহলে কেন মুখ খুলতে রাজি হলেন?
তার মতে, “এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন স্মৃতিচারণা অসহ্য লাগে। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাত্রই আমার মনে হলো, বুকটা বুঝি ছিঁড়ে যাবে। কিন্তু আমি মনেপ্রাণে মানি এখনও কিছু সৎ মানুষ আছে। এজন্য আমার মুখ খোলা অত্যন্ত জরুরি।”
একাধিক বিবরণ মতে, ফিলিস্তিনি শিশুরাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়। তাদের মূলত পাথর ছোঁড়ার জন্য কারারুদ্ধ করা হয়। সেরকম বন্দি তিনজন বালককে আমি খুঁজে বের করি এবং তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। তারা প্রত্যেকেই যৌন নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করে।
এদের মধ্যে হিলফিজার শার্ট পরিহিত বালকটি ভীষণ লাজুক। তার বয়স গ্রেপ্তারের সময় ১৫ বছর ছিল। সে ধর্ষণ স্বচক্ষে দেখছে কিনা তা বলতে রাজি নয়। তবে সে জানায় যে হুমকি দেওয়া ছিল রোজকার ব্যাপার: “তারা বলত, এটি কর, নইলে তোর পাছায় লাঠি ঢুকিয়ে দেব।”
অন্য বালকরাও মারধরের অংশ হিসেবে যৌন সহিংসতার প্রায় হুবহু বর্ণনা দেয়। তারা উল্লেখ করে যে, ধর্ষণের হুমকি শুধু তাদেরকেই নয়, তাদের মা এবং ভাইবোনদেরও দেওয়া হতো।
কারাগার ব্যবস্থার মতো ইসরায়েলি সেটলার রাষ্ট্রের দাপ্তরিক কোনো অংশ নয়। তবে ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীর ওপর হামলা কিংবা ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত করতে বাধ্য করার কৌশলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী সবসময় সেটলারদের স্বার্থ রক্ষা করে। ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়াম, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটি জোট। এ সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে যৌন সহিংসতা চালানো হয়।
ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে কনসোর্টিয়ামটি জানতে পেরেছে, বাস্তুচ্যুত ৭০ শতাংশের বেশি পরিবারই নারী ও শিশুদের ভয় দেখানো এবং সুনির্দিষ্টভাবে যৌন সহিংসতার হুমকিকে তাদের বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা অ্যালেগ্রা পাচেকো মন্তব্য করেন, "যৌন সহিংসতা হলো ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে বিতাড়িত করার একটি কৌশল।"

জর্ডান উপত্যকার এক প্রত্যন্ত বেদুইন কৃষক গ্রামে, সুহাইব আবু আল-কেবাশ নামের ২৯ বছর বয়সী এক কৃষকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি জানান, প্রায় ২০ জন সেটলারের একটি দল তার বাড়িঘরে তাণ্ডব চালিয়ে ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাইকে মারধর করে। হামলাকারীরা তাদের গয়না ও ৪০০টি ভেড়া চুরি করে নেয়। এরপর শিকার করার একটা ছুরি দিয়ে তার পরনের জামাকাপড় কেটে ফেলে এবং তার পুরুষাঙ্গটি শক্ত করে ফিতা দিয়ে বেঁধে টান দেয়। তিনি বলেন, “আমার ভয় হচ্ছিল তারা আমার পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলবে। আমি ভেবেছিলাম এটাই আমার শেষ।”
অনেকে হয়তো সন্দেহ করতে পারেন যে, ইসরায়েলের বদনাম করার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনিরা যৌন নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। তবে এ ধরনের সন্দেহ হবে সম্পূর্ণ অবাস্তব কল্পনা। কারণ আমি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাদের কেউ নিজে থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি এবং আমি আর কার কার কথা নিচ্ছি, সে বিষয়েও তারা জানতেন না। তারা এই বিষয়ে কথা বলতে একেবারেই অনিচ্ছুক ছিলেন। তবুও এমন প্রমাণ রয়েছে যে, ইসরায়েলি বাহিনীর যৌন নিপীড়ন এতটাই ব্যাপক রূপ নিয়েছে যে কারাগারের ভেতরের রীতিনীতিই বদলে যাচ্ছে। আর এই কারণেই ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীরা এখন নিজ থেকে মুখ খুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাতার বলেন, “ছয় মাস ধরে আমি এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে পারিনি, এমনকি নিজের পরিবারের কাছেও না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সেটলাররা তাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে মারধর করে এবং ধর্ষণের ভয় দেখিয়ে তার পাছায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এই হামলার সময়ই হামলাকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার চোখ বাঁধা এবং শুধু অন্তর্বাস পরা অবস্থায় একটি ছবি পোস্ট করেছিল।
মাতার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক অপবাদের দেয়াল ভাঙতে মুখ খোলেন। তাই সেটলারদের তোলা ওই ছবি প্রিন্ট করে অফিসের দেয়ালে লাগিয়ে দেন।
আমি যা খুঁজে পেয়েছি তা বোঝার চেষ্টা করতে, আমি এহুদ ওলমার্টকে ফোন করি। তিনি ২০০৬ হতে ২০০৯ পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ওলমার্ট আমাকে জানান, তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। কিন্তু আমি যে বিবরণগুলো শুনেছি, তাতে অবাক হননি।
তিনি বলেন, “আমি কি বিশ্বাস করি যে এরকম ঘটে? হ্যাঁ, অবশ্যই ঘটে। অধিকৃত অঞ্চলে প্রতিদিন যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়।”
সুতরাং আমরা এ প্রতিবেদনের একবারে শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের সমর্থকরা ঠিকই বলেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক, ধর্ষণের নিন্দা করা উচিত।
“ভাইবোনেরা, তোমরা এখন কোথায়?”—সে সময় নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই প্রশ্ন রেখেছিলেন এবং পরবর্তীতে দাবি তোলেন, যেহেতু ইসরায়েলি সরকার হামাসকে ধর্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, তাই বিশ্ববাসীর উচিত হামাস কর্তৃক সংঘটিত যৌন সহিংসতার তীব্র নিন্দা করা।
হামাস সত্যিই মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল। তবে এবার ইসরায়েলের নিজের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। গত বছর ইসরায়েলের যৌন সহিংসতার ওপর জাতিসংঘের একটি ৪৯ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের পরোক্ষ উসকানি ও উৎসাহের মাধ্যমেই ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর এই পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে।
বিষয়টি এভাবে ভাবা যেতে পারে—৭ অক্টোবর ইসরায়েলি নারীদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছিল, ফিলিস্তিনিরা এখন প্রতিদিন ঠিক একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু আমাদের নীরবতা ও উদাসীনতার কারণে এই পরিস্থিতির কোনো সমাধান হচ্ছে না। এমনকি নেতানিয়াহুর সেই ‘তোমরা কোথায়’ প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব দেওয়ার মতো আজ কেউ নেই।
লেখাটি ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক নিকোলাস ক্রিস্টফ দুবার পুলিৎজার জয়ী মার্কিন সাংবাদিক এবং ওই পত্রিকার কলাম লেখক। মানবাধিকার, দারিদ্র্য ও সামাজিক অবিচার নিয়ে বিশ্বজুড়ে সাহসী প্রতিবেদনের জন্য তিনি পরিচিত। ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ার বিক্ষোভ এবং ২০০৬ সালের দারফুর গণহত্যা নিয়ে প্রতিবেদনের জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘Chasing Hope’।