Published : 15 Jul 2026, 07:24 PM
বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং শিল্প স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত করার লক্ষ্যে প্রণীত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’।
বুধবার সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিলটি উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
সংসদে উত্থাপনের অনুমতি চাওয়া থেকে বিল পাস হতে সময় লাগে প্রায় ২৮ মিনিট।
বিলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ-বেজা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব-পিপিপি কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০, বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আইন ২০১৫, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৬ এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন ২০১৮ রহিত করা হয়েছে।
বিলটি উত্থাপন থেকে পাস পর্যন্ত বিরোধী দলের সদস্যরা তা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠান, যাচাই-বাছাইয়ের সময় দেওয়া এবং বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী আনার সুযোগের দাবি তোলেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিলটি নতুন কোনো আইনি ধারণার ভিত্তিতে করা হয়নি। একই ধরনের কাজ করা তিন কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে বিনিয়োগকারীদের এক জায়গা থেকে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিলের বিধান অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংক্রান্ত সব সেবা, অনুমোদন, লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও পারমিট দিতে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হবেন প্রধানমন্ত্রী বা তার মনোনীত ব্যক্তি। একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সার্বক্ষণিক সদস্য কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
এ দিন কার্যপ্রণালি বিধির ৭৫ বিধির উপবিধি (১) অনুযায়ী বিধি স্থগিত করে স্বল্প সময়ের নোটিশে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি চাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আহ্বান করেন স্পিকার।
বিল উত্থাপনের অনুমতি চাওয়া হলে আপত্তি তোলেন পাবনা-১ আসনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। তার দাবি, “৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় বিলটি অনুমোদিত হলেও সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নথি দেওয়া হয়নি। রহিত হতে যাওয়া চারটি আইনের সঙ্গে নতুন বিলের পার্থক্য দেখিয়ে কোনো তুলনামূলক বিবরণও দেওয়া হয়নি।”
৬৭ ধারার বিলটি একই দিনে উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে বিলটি পড়ে আগের আইনগুলোর সঙ্গে তুলনা করা, সংশোধনীর প্রস্তাব তৈরি কিংবা জনমত যাচাইয়ের দাবি তোলা সম্ভব নয়।”
বিলটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর দাবি তুলে নাজিবুর বলেন, “আইন প্রণেতা হিসেবে বিল যাচাই-বাছাই করা সংসদ সদস্যদের অধিকার ও দায়িত্বের অংশ। এটা কমিটিতে না দিয়ে সরাসরি পাস করার এত তাড়াহুড়া কী জন্য?”
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “প্রতিটি বিল স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো বাধ্যতামূলক নয়। সপ্তম সংসদ থেকে বিল স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর রীতি চালু হলেও কার্যপ্রণালি বিধিতে তা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এটা কোনো নতুন আইন নয়। বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাজের মধ্যে পুনরাবৃত্তি থাকায় বিনিয়োগকারীদের সেবা পেতে সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। সেই সমস্যা কাটাতে কর্তৃপক্ষগুলোকে একীভূত করা হচ্ছে।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রে কোন ধারায় কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তার তুলনামূলক বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল সংশোধনী বিল নয়; কয়েকটি আইন ও সংস্থার কার্যক্রম একত্র করে নতুন কাঠামো তৈরির বিল। সে কারণে এটি নিয়ে তুলনামূলক বিবরণ দেওয়া জরুরি বলে সরকার মনে করেনি বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “বিলটি প্রথমবার মন্ত্রিসভায় উঠলে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিমার্জনের পর ৯ জুলাই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। সংসদে উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশ পাওয়া যায় ১৪ জুলাই।”
অধিবেশনের শেষ দিনে বিল আনার ব্যাখ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সরকার আরও আগে বিলটি সংসদে আনতে পারলে খুশি হত। তবে সেদিনই অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা থাকায় বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কণ্ঠভোটে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি দেয় সংসদ। সালাহউদ্দিনের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে গৃহীত হলে বিলের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী দেওয়ার সুযোগ চান কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, বিলের ২১, ২৫, ২৮, ৩৩ ও ৩৫ ধারাসহ কয়েকটি ধারায় তাদের সংশোধনী রয়েছে। সেগুলো জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া জানাতে স্পিকারের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সময় স্বল্পতার কারণে লিখিত সংশোধনী বিতরণ ও উত্থাপনের সুযোগ না থাকলেও স্পিকার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সদস্যদের মৌখিকভাবে সংশোধনী উত্থাপনের অনুমতি দিতে পারেন। যৌক্তিক কোনো সংশোধনী এলে সরকার তা বিবেচনা করবে।”
হাসনাত বলেন, “কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী তারা লিখিত নোটিশ দিতে চান। কোন ধারায় কী সংশোধনী আনা হবে, তা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্পিকারের রয়েছে।”
তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য কার্যপ্রণালি বিধির সংশ্লিষ্ট শর্ত আগেই স্থগিত করা হয়েছে। ফলে তখন লিখিত সংশোধনী গ্রহণ, তা সদস্যদের মধ্যে বিতরণ এবং পরে সংসদে উত্থাপনের সময় নেই।”
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংশোধনী দেওয়া সংসদ সদস্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে বিলটি অবিলম্বে বিবেচনায় নেওয়ায় তখন লিখিত সংশোধনীর প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব নয়।”
সদস্যদের প্রস্তাব যৌক্তিক হলে পরে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না দেওয়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আইন প্রণয়ন শুধু সংসদ সদস্যদের অধিকার নয়, তাদের দায়িত্বও। কোনো বিল না পড়ে বা যাচাই না করে কেবল সরকারের ওপর বিশ্বাস রেখে পাস করলে আইন প্রণেতাদের দায়িত্বে অবহেলা হতে পারে।”
বিলটি একই দিনে উত্থাপন ও পাসের উদ্যোগকে সংসদের জন্য খারাপ নজির বর্ণনা করে তিনি বলেন, “আইন বোধহয় এভাবে প্রণয়ন হয় না। আইন তো বুঝে শুনে প্রণয়ন করতে হবে। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের আছে।”
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধীদলীয় নেতা যথার্থ বিষয় তুলে ধরেছেন। তবে বিলটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইনি কাঠামো নয়। একই উদ্দেশ্যে কাজ করা কয়েকটি আইনের বিধান ও কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম এক জায়গায় আনা হয়েছে।”
বিলটি পাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, “দেশি-বিদেশি অনেক বিনিয়োগকারী চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। চার-পাঁচ মাস পার হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগও পিছিয়ে যাচ্ছে। এই আইনের প্রতি যদি আগের সরকার অথবা অন্তর্বতী সরকার মনোযোগ দিত, তাহলে এই পাঁচ মাস আমরা বিনিয়োগে অনেক দূর এগিয়ে যেতাম।”