Published : 10 May 2026, 01:39 AM
নয় মাস বয়সী নূর এপ্রিলের শুরু থেকে জ্বর, শ্বাস কষ্টে ভুগছিল। ৮ এপ্রিল চাঁদপুরের এই শিশুটিকে ভর্তি করা হয় ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিতে হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আইসিইউতে।
বর্তমানে শিশুটিকে নিয়ে তার মা সুমাইয়া হাসপাতালে রয়েছেন।
এই এক মাসে ওষুধ, আইসিইউসহ আনুষাঙ্গিক মিলে ৮০ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়েছে বলেছেন নূরের বাবা নুরুল্লাহ হাসান।

তার সঙ্গে শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়। নুরুল্লাহ বলছিলেন, তার একটি ওষুধের দোকান আছে। মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করেন। কিন্তু হঠাৎ করে বাচ্চার পিছনে এত টাকা খরচ, আবার হাসপাতালে সময় দিতে গিয়ে দোকানও বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমার প্রায় তিন মাসের আয়ের টাকা একবারেই খরচ হয়ে গেছে।”
নুরুল্লাহ বলেন, আর কয়েক দিন থাকলে এক লাখ টাকা খরচ হয়ে যাবে।
সুমাইয়া বলেন, হাসপাতালে আসার পর থেকেই প্রতিদিন অনেক খরচ হয়। এখান থেকে কিছুই পাওয়া যায় না। ডাক্তার, নার্স যখন যা নিয়ে আসতে বলেন, সব বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় পরীক্ষা আর ওষুধ কিনতে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়।
আইসিইউর খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে আইসিইউ শয্যার ভাড়া দৈনিক এক হাজার, অক্সিজেন ৫০০ টাকা, নেবুলাইজার ১০০ টাকা। আর বিভিন্ন ওষুধ কিনে নিয়ে আসতে হয়।
“আইসিইউতে রাখার সময় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ, বিভিন্ন ইঞ্জেকশন কিনতে বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে,” বলেন নূরের মা।
আরো কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় শিশু হাসপাতালে। তারা বলেন, চিকিৎসা ব্যয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তারা।
তারা বলেছেন, সন্তানের হামের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে মাকে তো থাকতেই হচ্ছে, তার সঙ্গে বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্য বা আত্মীয় স্বজনদেরও রাখতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন থাকতে হচ্ছে বলে আয়ের কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত ৬ হাজার ৯৭৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৬১ জন। সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬। তাদের মধ্যে মারা গেছে ২৯১ জন।

সেবা ছাড়া সবই কিনতে হচ্ছে
একাধিক শিশুর অভিভাবক ও স্বজনরা বলেছেন, সরকারি হাসপাতালে ইঞ্জেকশান, স্যালাইন, ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টসহ সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
তারা বলেছেন, বাচ্চার যত্নে মায়েরা রয়েছেন, আর বাইরে থেকে জিনিসপত্র নিয়ে আসার জন্য বাবা অথবা পরিবারের অন্য কাউকে থাকতে হচ্ছে। এটি পরিবারের আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বরিশাল থেকে শিশু আলিফকে নিয়ে এসেছেন জুয়েল-তন্বী দম্পতি। বরিশালে তিন দিন চিকিৎসা করার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তারা ঢাকায় আসেন।
জুয়েল বেপারী শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি পেশায় গাড়ি চালক। বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই আমার চাকরি নেই। এই অবস্থায় বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ হওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকায় নিয়ে আসলাম। আসার প্রথম দিন একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও বাচ্চাকে ভর্তি করাতে পরিনি। পরে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় বসেছিলাম, বেড ফাঁকা হওয়ার পর সেখানে ভর্তি করাতে পেরেছি।”
চাকরিতে ২৩ হাজার টাকা বেতন পেতেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন তো চাকরি নাই, তাই ধার-দেনা করে বাচ্চার চিকিৎসা করাচ্ছি।’’
শিশু হাসপাতালে ভর্তি করাতে ২ হাজার টাকা নেওয়ার কথা তুলে ধরে জুয়েল বলেন, তারপর থেকে সকল ওষুধপত্র বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
বেসরকারি একটি হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করার পর সেখান থেকে নিয়ে আসার কথাও বলেছেন আলিফের বাবা।
তিনি বলেন, “ঢাকায় এসে কোথাও বেড না পেয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক ঘণ্টা বাচ্চাকে রেখেছিলাম, সেখানে প্রায় ১৩ হাজার টাকা বিল আসে। পরে টাকা না থাকায় সেখান থেকে চলে আসি।”

শিশু হাসপাতালে চার দিন হল আছে আলিফ। এখানে চিকিৎসার সব কিছু বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে তুলে ধরে জুয়েল বললেন, “বরিশাল ও ঢাকায় মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে ৫০ হাজারের বেশি খরচ হয়েছে। পরিচিত আত্মীয়-স্বজন সবার থেকে নিয়ে চলতেছি। কিন্তু এভাবে বেশি দিন চলতে পারবো না।
“টাহার চিন্তায় কি করবো বুঝতাছি না।”
শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন ভোলার খলিল মিয়া। চিকিৎসা ও ঢাকায় থাকতে সপ্তাহখানেকের মধ্যে তার প্রায় ৪০ হাজার টাকার খরচ হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানের সব কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এক বোতল পানি থেকে শুরু করে, স্যালাইন, ইঞ্জেকশন, ওষুধসহ সব কিছু কিনতেই বেশি খরচ হচ্ছে।”
মাছ ধরা ও কৃষি কাজের আয়ে সংসার চালানো খলিল বলেন, “আমরা গরীব মানুষ, চিকিৎসা করাতে এসে নিজের কাজকর্ম বন্ধ রয়েছে। সংসার চালানোর খরচেই টান পড়ছে।”
বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে কয়েকজন অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরামর্শ ছাড়া কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টও বাইরে থেকে নিতে হচ্ছে।
তাদের বলছেন, সরকারি হাসপাতালে জরুরি কিছু ওষুধ এবং অক্সিজেন বিনামূল্যে সরবরাহ করা উচিত।
শিশু হাসপাতালের ববি ইয়াসমিন নামের এক শিশুর মা বলেন, “এখানে ভর্তি হওয়ার পর কোনো কিছুই দেয়নি। বাচ্চার সব পরীক্ষা এবং ওষুধ বাইরে থেকে ওর বাবা কিনে নিয়ে আসতেছে। ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টটও বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
“দেশের যে পরিস্থিতি তাতে হামের রোগীদের ফ্রিতে জরুরি ওষুধ এবং অক্সিজেন দেয়া দরকার।”
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, “আমাদের হাসপাতালে যেসব ‘ফ্রি বেড’ রয়েছে সেগুলোর রোগীরা খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনামূল্যে পেয়ে থাকে। ‘পেয়িং বেডের’ ক্ষেত্রে বাইরে থেকে ওষুধপত্র নিয়ে আসতে হয়।”
হামের রোগীদের থেকে আইসিইউ শয্যার ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট সরকারিভাবে দেওয়ার কথা থাকলেও কেন সব রোগী পাচ্ছে না সেটির বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, “এটি সব রোগীদের পাওয়ার কথা। তবে কেন পাচ্ছে না সে ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখব এবং সব শিশুকে এটি দেওয়ার বিষয়ে কাজ করব।”
হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকার পর রাজশাহী বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ঢাকায় মারা গেছে ১৩৫ জন, আর রাজশাহী বিভাগে ৭৮ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশু শাকিলের বাবা বলেন, এক সপ্তাহের বেশি সময়েই তাদের ৩০ হাজারের মতো খরচ হয়েছে। সব সময় বাইরে থেকে ওষুধপত্র নিয়ে আসতে বলে।
এই অভিভাবক বলছিলেন, তাদের সন্তানকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করার মতো আর টাকা নেই, তাই বাড়ি চলে যাবেন।
একই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আরেক শিশুর বাবা বলেন, বাচ্চার অনেক জ্বর ও র্যাশ ছিল। এখানে নিয়ে আসার পর ডাক্তার ভর্তির পরামর্শ দেন। গত এক সপ্তাহেই প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কারণ এখানে থাকার জায়গা ছাড়া কোনো কিছুই টাকা ছাড়া মিলছে না।
তিনি বলেন, যেসব ওষুধ সব শিশুদের জন্য দরকার হচ্ছে, তার কিছু যদি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে দিত, তাহলে ভালো হতো।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, সব ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং ওষুধ রোগীদের বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে।
বেসরকারি হাসপাতালে খরচ কয়েকগুণ বেশি
একাধিক শিশুর অভিভাবক ও স্বজনরা বলছেন, তারা বিভিন্ন সময় সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে দুই-একদিন বা অল্প সময়ের জন্য বেসরকারি হাসপাতালে বাচ্চাদের ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় ২০ গুণ বেশি ব্যয় হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
বরিশালের জুয়েল বেপারি বলেন, “আমরা ঢাকার আসার পর কোনো জায়গায় বেড না পেয়ে শ্যামলীর হৃদয় মেডিকেলে বাচ্চাকে ভর্তি করছিলাম। দেড় ঘন্টায় ১৩ হাজার টাকা বিল হয়েছিল। পরে বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে নিয়ে এসে ভর্তির জন্য শিশু হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিলাম।”
রাজধানীর পদ্মা জেনারেল হাসপাতালের একজন প্রতিনিধি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখানে শুধু নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-এনআইসিইউর বেড ভাড়া দৈনিক ৬ হাজার টাকা। আর বাচ্চার শারীরিক অবস্থা অনুসারে ওষুধপত্র বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়।”
নাম প্রকাশ না করে শিশু হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, বেসরকারি যেকোনো হাসপাতলের আইসিইউতে বাচ্চাকে রাখলে একদিন ২৫ হাজারের বেশি বিল আসবে। এটি খুব কম মানুষ সামলাতে পারেন। তাই সবাই সরকারির হাসপাতালেই আসছেন।
তিনি বলেন, “দেশের কোনো বেসরকারি হাসপাতালে হাম ‘ডেডিকেটেড’ বেড নাই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ভালো কিছু বেসরকারি হাসপাতালের উচিত ছিল মানুষের সেবায় এগিয়ে আসা। কিন্তু তারা সেটি করেনি।”
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই যাচ্ছে ব্যক্তির পকেট থেকে। দরিদ্র্যদের ক্ষেত্রে মোট আয়ের ৩৫ শতাংশ যায় এ খাতে।

হাসপাতালে শয্যা সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৪ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ছড়িয়েছে। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে।
কিন্তু হাম রোগের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে সে অনুযায়ী শয্যা বা আইসিইউ আছে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন অনুসারে দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫। যার মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ১ লাখের বেশি শয্যা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউর সংখ্যা ১৬শ’র বেশি।
তবে ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ: আ প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৬।
২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি প্রায় ৩০ লাখ। জনসংখ্যা বিবেচনায় দেশের ১ হাজারের বেশি মানুষের বিপরীতে একটি শয্যা (অর্থাৎ ০.০৯৯ শতাংশ) এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বিপরীতে একটি আইসিইউ (অর্থাৎ ০.০০১৬৫ শতাংশ) রয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী পরিমাণ আইসিইউ শয্যা, ভেন্টিলেটর মেশিন ও এ সংক্রান্ত জরুরি সেবা রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার।
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৬২০টির মতো আইসিইউ শয্যা রয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, এই হাসপাতালে ৪৬টি হাম ‘ডেডিকেটেড’ শয্যা ছিল। এখন সেটি ৭৪ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ জন রোগী ভর্তি আছে। এর বাইরে আর শয্যা বাড়ানো সম্ভব নয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড ও হাম ‘ডেডিকেটেড’ কর্নার মিলে মোট ৯০টি শয্যা রয়েছে। শনিবার পর্যন্ত ভর্তি রয়েছে ৯৯ জন।

ঢাকার মহাখালীর সাততলা বস্তির পাশে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যা মোট ১০০টি। সেখানেও শয্যার চেয়ে ভর্তি রোগী বেশি।
হাম রোগীদের চিকিৎসা দিতে গেল ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি জরুরি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, হামের রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানো যাবে না। প্রয়োজনে শয্যা বাড়িয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। তারপরও রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠানোর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
একাধিক হাসপাতালের পরিচালক বলেছেন, শয্যা বাড়াতে জায়গা দরকার, সে অনুযায়ী অক্সিজেনসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও লাগে। নতুন শয্যা বাড়ানো না গেলেও অন্য রোগের ‘ডেডিকেটেড’ শয্যা হামের রোগীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা রাজশাহী ও রাজধানীর শিশু হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য শয্যা বৃদ্ধি করেছি। সরকারিভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের সাপ্লাই স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কোনো জায়গায় স্বল্পতা থাকলে তারা যেনো রিকুইজিশন দিয়ে নিয়ে নেয়। এ ছাড়া আগামীতে আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করছি।”
হামের মৃত্যু থামছে না কেন
শনিবার সকাল ৮ট পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন অনুযায়ী, সারাদেশে ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত ৫৪ দিনে হাম আক্রান্ত হয়ে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ১৭৩ জন। রাজশাহীতে মৃত্যু হয়েছে ৮০ শিশুর। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৬ জনেরও বেশি শিশু মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, বর্তমানে দেশে হামের সন্দেজনক রোগীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৬৫৬ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৩ হাজার ৬৩১ জন।
শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩৫৩ জন, চট্টগ্রামে ১৬০ জন, বরিশালে ৫০ জন, খুলনায় ৬১, ময়মনসিংহে ৫০, রাজশাহীতে ৫৯ জন, সিলেটে ৩৫ এবং রংপুরে ১ জন।

হামে মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না কেন? জবাবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, “আসলে হাম এমন একটি ব্যাধি যার সরাসরি কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই। হামের কারণে শিশুর শরীরে আরো কিছু জটিলতা তৈরি হয় সেগুলা প্রতিরোধে আমরা বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করি। যাতে জটিল পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
“আর অনেক সময় শিশুদের এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে আসা হচ্ছে, তাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারছি না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামের এই অবস্থায় দেশে স্বাস্থ্যের বিষয়ে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা প্রয়োজন, যাতে সবাই সবার মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু সরকারের অনেকে মনে করেন, এটি করলে হয়তো কারো কারো ক্ষমতা কমে যাবে, তাই এটি না করে অলিখিত জরুরিভাবে সব কাজ করছে।
“মোটাদাগে আগুন লাগার পর নেভানোর কাজ যেভাবে হয়, সেভাবে হচ্ছে। তবে কোভিড পরবর্তী সময়েও আমরা মহামারীতে কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটি শিখলাম না।”